রিনি এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তবে একটা কথা সবাই জানে বাবা যতই গরীবই হোক,সন্তানকে সমস্তরকম স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে বড়ো করে। রিনির ক্ষেত্রেও এর অন্যথা কিছু হয়নি। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে মা কাকীমারা রান্না শেখার কথাও বলতো। তাই বিরক্ত হয়ে মাঝেমধ্যে পোড়া রুটি আর নুন ছাড়া তরকারি করতে হতো। তবে বাবা সেটা দারুণ হয়েছে বলে খেয়ে নিতো। হ্যাঁ তবে বাবা কোনোদিনই রিনিকে রান্না করতে বলেনি। শুধুমাত্র নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলতো।

এখন রিনি বিবাহিতা। এই প্রথম এঁচোড়ের তরকারি রেঁধেছে কিন্তু নুন-মিষ্টি ছাড়া বা হয়তো কম হয়েছিল তাই কেউ খেতে পারেনি। এমনকী বাবার সামান্য অমত সত্ত্বেও বাবাকে বুঝিয়ে যে ছেলেটাকে বিয়ে করেছিল সেও নয়। তার জন্য কেউ বকাবকী করেনি ঠিকই তবু যদি এখানে বাবা থাকতো তাহলে কী ঘটতো সেটা জেনেই ওর মনটা খারাপ। যাইহোক বাকী রান্নাগুলো ভালোই হয়েছে।

রিনি এখন সংসারটাকে মোটামুটি ভালোই গুছিয়েছে। তবে আগের মতো আর নেই সে। বড্ড শান্ত,বড্ড ব্যস্ত। নিজের জন্য বিন্দুমাত্র সময় নেই তার। মাঝেমধ্যে মনে হয় পড়াশোনা করে কী হলো? তবে বিয়েটা তো সেই করতে চেয়েছিল আর তারপর সংসারে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। ভেবেছিল বাবা-মাকে দেখবে। বাবা তো আর লোকের জমিতে কাজ করতে পারেনা। অনেকটা বয়স হয়েছে। কিন্তু কী করে? নিজে কিছু করেনা আর স্বামী যা করে তাতে সংসারটা চলে যায়। তাই স্বামীকে কিছু চাইতেও ওর মন চায় না। নিজেকে ওর ছোটো মনে হয়।

এতকিছুর মধ্যে বাবাকে ফোন করতেই ভুলে গেছে রিনি।
” হ্যালো বাবা “
” হ্যাঁ বল “
” কী ব্যাপার এখনও এতো কাশি হচ্ছে? সিরাপ খাওনি? “
” না মানে বুঝতেই তো পারিস বাজার করতে হবে, শুধু শুধু সিরাপ কিনে টাকাটা নষ্ট করবো। ও এমনি ভালো হয়ে যাবে। “
আর কিছু বলেনা রিনি, সাধারণ কিছু কথা বলে ফোন রেখে দেয়।

না এইভাবে চলবে কীকরে? কিছু একটা করতেই হবে। স্বামীকে বলে যে সে স্টেশনারী দোকান খুলতে চায়। স্বামী অনুমতি দেয় ঠিকই তবে সাহায্য করার ক্ষমতা খুবই কম।
রিনির শ্বাশুড়ী সবটা শুনে ব্যবসা শুরু করতে সায় দেয়।
রিনির শ্বশুরবাড়ির লোকজন প্রথম থেকেই ওকে ভালোবাসতো।
শ্বাশুড়ীর আর নিজের বিয়ের গয়না বিক্রি করে স্টেশনারী দোকান খোলে।
যেটা করতে অনেকটা সাহস জুগিয়েছে তার শ্বশুড়। যখন পাড়ার লোক বলতো শেষ অব্দি স্টেশনারী দোকান? রিনির শ্বশুড় উত্তর দিয়েছিল ” কোনো কাজই ছোটো নয় “
লোকে কী বলবে তারা ভাবেনি।


তবে সমাজ কখনো চুপ করে থাকে কী? আবার পাড়ার লোক বিশেষ করে?
অনেক নিয়ম তৈরী করে দিয়েছিল যেমন সন্ধ্যের পর দোকান খোলা রাখা যাবে না। কারণ হিসাবে দেখিয়েছিল সন্ধ্যায় পাড়ার ছেলেরা পাশের চায়ের দোকানে আড্ডা মারে। এখন জিনিস বিক্রি করবে না রিনি অন্যকিছু বিক্রি করবে তা কে জানে?

তবে রিনি এসব কথার মুখে কোনো উত্তর দেয়নি। আজ সে নিজের বাবা-মাকে দেখে, সংসারের সুবিধা-অসুবিধা ও সামলায়। এর মধ্যেই হয়তো উত্তর পেয়ে গেছে পাড়ার লোক।
তাই তারা এখন সামনে কিছু বলেনা। তবে পিছনে বলে ” কী করে এতকিছু করছে জানতে আর বাকী নেই ভাই “

 

 

হ্যাঁ এটাই সমাজ রিনি জানে। তাই কথাগুলো ওর গায়ে লাগেনা।

ও শুধু এটুকু বুঝেছে রিনির মতো মেয়েদের শুধু নয় প্রতিটি মেয়ের নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা কতটা জরুরী।

( দূর্গাপুরের এক স্টেশনারী দোকানে গিয়েছিলাম এক বান্ধবীর সঙ্গে। প্রচন্ড বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছিল তাই দোকানেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন দোকানে শ্বশুড় আর বউমা মানে গল্পের রিনি ছিল। তার কাছ থেকেই শোনা )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here