“আজ এ যন্ত্রণার কোপ তোকে পেতে হবে মা।

এ জীবনে আজও অনেক কালি মাখা বাকি আছে।

আজ এক সর্বনাশা হাওয়া তোকে ছোবে মা। 

চারিদিক শুধু ছাই আর কালি।

আস্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরবে তোকে।

এ যন্ত্রণার কোপ তোকে পেতে হবে মা।“

সেদিন রাত্রে চিৎকার করে লালনখ্যাপা কথাগুলো বলে যাচ্ছিল। রাত তখন এগারটার কাছে। যদিও এ গ্রামে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে সে সময়। তার উপর লালন একজন বয়স্ক ভবঘুরে। কে লালনের কথা শুনবে? তাও লালন বলে চলেছে। রাস্তার কুকুরগুলো লালনকে দেখে মাতামাতি শুরু করেছে। হঠাৎ লালন কান ধরে বসে পড়ল। “মা রে, তুই কাঁদিস, না? কেও আজ তোর হাহাকার শুনছে না। মা রে… মা।“ হঠাৎ লালন ক্ষ্যাপা চুপ করে গেল। কিছু একটা যেন শোনার ও বঝার চেষ্টা করছে। “মা রে, চলে গেলি মা? ওরা তোকে থাকতে দিল না মা? মা..

প্রায় দু মাস পর অবশেষে একটা তিন দিনের ছুটি পেয়েছে সুমিত। সাধারনত ছুটি পেলে বর্ধমানে বাড়িতেই ফিরে যায় সে। কিন্তু এবারে যে যাবে না, সেটা আগের থেকেই ঠিক ছিল। দুমাস সে দিল্লীতে অফিসের কাজে কাটিয়ে এসেছে। দুমাসে কোয়েলকে একদম সময় দিতে পারে নি। তাই কলকাতা ফিরেই প্ল্যানটা করেছিল সে। এখন তারা আছে বোলপুরের কাছে একটা গ্রাম , প্রান্তিকে। এখানে তার বন্ধু সুমনের একটা রিসোর্ট আছে। দুদিন ভালভাবে সময় কাটানো যাবে কোয়েলের সাথে। কোয়েলও আজ বেশ খুশি। সারারাস্তা সুমিতের হাত ছাড়েনি।  এই বছরই বিয়েটা হয়ে যেত, কিন্তু দিল্লী যাওয়াতে সব ভেস্তে গেল। এদিকে কোয়েল ডিসেম্বর ছাড়া বিয়ে করবেনা। গ্রামটা বেশ সুন্দর। চারিদিকে শুধু সবুজ। যদিও রিসোর্টটা একটু বাইরের দিকে। বোলপুর স্টেশন থেকেই একটা টোটো করে নিয়েছে ওরা। প্রান্তিকে একটা স্টেশন আছে, কিন্তু সেটায় শুধু প্যাসেঞ্জার ট্রেন ছাড়া কিছু দাড়ায় না। 

হঠাৎ রাস্তায় একটা ছেড়া পরোটার দোকান দেখে কোয়েল বায়না ধরল। সেই কবে নাকি পিসির বাড়ি গিয়ে খেয়েছিল। আর গ্রামের ছেড়া পোরোটা নাকি খেতেও ভালো হয়, সে খাবেই। সুমিত হেসে ফেলে। কত দিন এই ছেলেমানুষিগুলোর অভাব অনুভব করেছে সে দিল্লীতে। টোটো থামিয়ে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল ওরা। গ্রামের দোকান। দু একজন লোক আগের থেকেই বসে গল্প করছে। ওদেরকে দেখে নিজেদের মধ্যেই কিছু একটা বলাবলি করছে। গ্রামের লোকেরা, শহর থেকে লোক এলে আলচনা করে সেটা সুমিত ভালোই জানে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কোয়েলকে নিয়ে। মেয়েটা যেভাবে সুমিতের গলা জড়িয়ে আবদার করছে, সেটা এরা কেমন ভাবে নেবে কে জানে।

“আপনারা কী এই গাঁয়ে কারোর বাড়িতে এয়েচেন নাকি?” দোকানদার দু প্লেট পোরটা দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করল। 

“না না , বেড়াতে এসেছি।“ সুমিত উত্তর দিল। 

“আরে কাকা, চারুলতার লোক এনারা, বুঝতে পারছ না?” পাশে বসা লোকগুল বলল। সুমিত দেখল, এদের লোক বলা ভুল, সবাই ওর বয়সী ছেলে, সাতাশ- আঠাশের কাছে বয়স। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। দোকানদার আর কিছু না বলে ভিতরে চলে গেল। সুমিত টাকা মিটিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে টোটোতে উঠল। হঠাৎ কোয়েল আবার নেমে দোকানের দিকে গেল। সুমিত ঠিক কারনটা বুঝতে পারল না। কোয়েল পিছন দিকে ইশারা করল। সেখানে একটা পাগল বুড়ো মত লোক দাড়িয়ে। মিটমিট করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। 

“বেচারা মনে হয় অনেক্ষন কিছু খায় নি। ওকে কিছু খেতে দি।“ এই হয়েছে কোয়েলের আর এক জ্বালা। রাস্তার ভিখারি ছেলে থেকে বুড়ো সবার জন্য যেন শুধু ওকেই ভাবতে হবে। কলকাতাতেও এ জিনিস অনেক হয়েছে। একবার তো ‘ছ’টা বাচ্চাকে ডেকে  ফুচকা খাইয়েছিল। বিল হয়েছিল দুশ টাকার মতন। সুমিত হঠাৎ খেয়াল করল, ছেলেগুল এবার কোয়েলের দিকে তাকিয়ে আছে। হেসে নিজেদের মত কিছু কথা বলছে। এবং কথাগুলো যে খারাপ কিছু, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। সুমিত গিয়ে কোয়েলকে আড়াল করে। ইচ্ছা করছিল, ছেলেগুলকে দু চার কথা শোনাতে, কিন্তু এটা ওদের নিজেদের এলাকা, এখানে ঝামেলা করলে সুমিতই বিপদে পড়তে পারে। 

ক্ষ্যাপা বুড়োটা খাবার পেয়ে খুব খুশি। এমন করুণ চোখে কোয়েলের দিকে তাকিয়ে হাসল, যে সুমিতও যেন একটু আবেগপ্রবন হয়ে পড়ল। 

“চলো , এবার যাই।” সুমিত কোয়েলকে টোটোয় ওঠার জন্য ইশারা করে। কোয়েল ঘাড় নেড়ে উঠে পড়ে। টোটো ছাড়তে যাবে, ওমনি উল্টোদিক দিয়ে সাইকেলে করে একটা লোক, টোটো চালক কে কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করল। টোটো চালক উত্তর দিল, “চারুলতা”।  টোটো একটু গতি বাড়াল, হঠাৎ দেখল, পিছনের ক্ষ্যাপা লোকটা ওদের দিকে দৌড়ে আসছে। এর আবার কী মতলব? নিশ্চয় আরও টাকা লাগবে। “দেখ, তুমি খেতে দিলে , আর ও শুতে চাইছে। ”  

সুমিতের কথায় কোয়েলও পিছনে ঘোরে। 

“ওটা নিয়ে ভাববেন না আপনি। আমি তখন চারুলতা বললাম, তাই ও  দৌড়াচ্ছে। যে কেও চারুলতা যাই, তাদের দেখলেই লালনক্ষ্যাপা ওরকম করে।“ টোটো চালক সামনে থেকে বলল। 

“সে কি কেন? আর তুমি কি লোকাল ছেলে নাকি?”সুমিত জিজ্ঞাসা করে। 

“না লোকাল না, তবে এলাকা চিনি। আর ও বুড়ো ওমনই করে। কেন কে জানে। এমনিতেও চারুলতা নিয়ে গ্রামের লোক দু চার কথা বলে। এই যে আপনারা এসেছেন। তা আপনারা তো বিয়ে থা করেন নি। এরকম তো এখানে প্রায় ছেলে মেয়ে আসে। সে সব নিয়ে কথা হয় গ্রামে। সেখান থেকে ও কিছু শুনেছে হয়ত।“ টোটো চালক কথাগুলো বলে টোটোর গতি বাড়িয়ে দেয়। কথাগুলো সুমিত আর কোয়েলকে একটু অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এই টোটো চালকও হয়ত তাদের নিয়ে খারাপ কিছুই ভাবছে। 

অবশেষে মিনিট দশেক পরে তারা চারুলতার সামনে পৌছাল। টোটো চালকের নাম চিরন। সুমিত ওর মোবাইল নম্বরটা নিয়ে নিল। ফেরার সময় ওকে লাগতে পারে। কোয়েল ভিতরে ঢোকে। নামেই রিসোর্ট। একটা প্রকাণ্ড বাড়ি, তবে দেখতে বেশ সুন্দর। সামনে বড় বাগান। নানাধরনের ফুল ধরেছে তাতে। কোয়েল হাঁটতে হাঁটতে যেন শুনতে পেল কেও একটা কাঁদছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল সে। আসে পাশে কোথাও কেও নেই। হঠাৎ ডান দিকে ঘুরলে, সে একটা ছোট্ট মূর্তি দেখতে পায়। কয়েকটা জবা গাছের ঝোপের মধ্যে সিমেন্টের থামে দাড় করানো দু ফুটের একটা মূর্তি। একটা মেয়ে কলসি ধরে আছে। আওয়াজটা যেন সেদিক থেকেই আসছে। ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেল কোয়েল। কান্নার আওয়াজটা এবার কানে বেশি লাগছে। মূর্তির সামনে এসে দাড়াতেই কোথায় থেকে  যেন রক্ত ছিটে মুর্তিটাতে পড়ল। ভয়ে কোয়েল ছিটকে সরে গেল। 

“কি হল, পড়ে গেলে নাকি?” দুর থেকে সুমিত বলল।

“আরে এখানে এই মুর্তিটা…” কথা শেষ করার আগেই কোয়েল অবাক হয়ে দেখল মূর্তিটা পরিষ্কারই আছে। কোন রক্ত নেই। কান্নার আওয়াজটাও আর শোনা যাচ্ছে না। 

“কী হল, পড়ে গেলে কী ভাবে? লেগেছে নাকি?” সুমিত বলল। কোয়েল তাকিয়ে দেখে সুমিতের পাশে একজন বছর কুড়ির ছেলে এসে দাড়িয়েছে। তার হাতে সব ব্যাগ। ছেলেটা এই বাড়ির কেয়ারটেকার। নাম বিলে। 

“এই মূর্তিটা কিসের?” কোয়েল হাতের ঈশারায় বিলেকে জিজ্ঞাসা করল। 

“ওটা তো সুমনদা বানিয়েছিল, ফোয়ারা করবে বলে। ঐ যে কলসি দেখছেন, ওটা থেকে জল পরত। তারপর খারাপ হলে, দাদা আর সারায় নি।“ কথা বলতে বলতে বিলে ওদের বাড়ির মধ্যে নিয়ে এল। বাড়ির মাঝে বিশাল সাজানো ডাইনিঙ। দুটো আলাদা ঘর আছে। আর ডাইনিঙের পাশে সিঁড়ি, ছাদে যাওয়ার। ছাদে একটা ঘর আছে, সেখানে বিলে থাকে, রান্না করে। ডাইনিঙে বেশিরভাগই কাঁচের আসবাবপত্র। 

ঘরে ঢুকে সুমিত গেল বাথরুমে, স্নান করার জন্য। কোয়েল ব্যাগ থেকে নিজের চুড়িদার বার করছে। বিলে খাবার বানাচ্ছে, স্নান করেই খেয়ে নেবে ওরা। বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। 

“কে?” কোয়েল ভাবল বিলে হবে। কিন্তু কোন সাড়া পেল না। কোয়েল আবার জিজ্ঞাসা করল, “কে?” এবারেও কোন সাড়া নেই। কোয়েল ভাবল সুমিত কে ডাকবে। কিন্তু এই তুচ্ছ কারনে সুমিতকে বাথ্রুম থেকে বের করে আনার মানে হয় না। সে নিজেই দরজা খুলল। কিন্তু কেও নেই বাইরে। কোয়েল ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। ডাইনিঙটা বেশ অন্ধকার। এইতো ঢোকার আগেও কত আলো ছিল, কী হল? সে দুবার বিলেকে ডাকল, কোন সাড়া নেই। হঠাৎ কান্নার আওয়াজটা আবার শুনল। ধীরে ধীরে ডাইনিঙের মাঝে এল সে। কোথায় থেকে আসছে আওয়াজটা? এটা কি কোন মোবাইলের রিংটোন? বিলের? সে আবার বিলে কে ডাকল, কোন সাড়া পেল না। জোরে হাওয়া দিতে শুরু করেছে। পর্দার বাইরে জানলার পাল্লা গুলো খুলছে আর ধাক্কা খাচ্ছে। কোয়েল জানলার পাল্লাগুলো একটা করে লাগাচ্ছে, তো অন্যগুলো খুলে যাচ্ছে। কি যে হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। পাল্লা গুলো যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে। হঠাৎ বাইরে চোখ গেল কোয়েলের। এত ঘন কালো মেঘ কখন এল? পুরো জায়গাটায় ভর দুপুরে সন্ধ্যের মত আধার নেমে এসেছে। কান্নার আওয়াজটা এবার আরও জোরে জোরে আসছে। মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল কোয়েল। মূর্তিটার কলসি থেকে লাল রক্ত বেরচ্ছে। আর তার পাশে দাড়িয়ে আছে রাস্তার সেই পাগলটা। সে যেন কোয়েলকে কিছু বলতে চাইছে। কান্নার আয়াজটা এবার কান ফাটিয়ে দিচ্ছে। এ যেন কোন বিশাল যন্ত্রণার কান্না। মৃত্যুর আগে শেষ চিৎকার। কোয়েল থাকতে না পেরে পড়িমরি করে নিজের ঘরে গেল। ঘরে ঢুকেই সে দরজা লাগিয়ে দিল। তার এই  আচরনে সুমিত বেশ অবাক। সে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে জিজ্ঞাসা করল, “কী হল কোয়েল? হাফাচ্ছ কেন?

“বা বাইরে…”

“ কি হয়েছে বাইরে ?” সুমিত দরজা খুলে দেখার জন্য বাইরে বেরিয়ে গেল। “ কী হয়েছে, কিছুই তো নেই।“

কোয়েলও বাইরে বের হল। অবাক কান্ড। চারিদিকে কত আলো। ঝড়ও নেই।  সে ছুটে বাইরেটা দেখতে গেল। না, কোন মেঘ নেই। মূর্তিও স্বাভাবিক। 

“ কী হয়েছে বলত?” সুমিত কোয়েলের পাশে এসে জিজ্ঞাসা করল। কী হচ্ছে, সেটাই টো বুঝতে পারছে না কোয়েল। সে দুর রাস্তা অব্দি দেখল, পাগলটাও নেই। কোয়েল কোন কথা না বলে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। কোয়েলের এরকম আচরনে সুমিতও অবাক। 

দুপুরে খাওয়ার সময় কোন কথা বলেনি কোয়েল। এমনকি কোয়েলকে এতদিন পর কাছে পাবে ভেবে যেই একটু জড়িয়ে ধরতে গেল, কোয়েল ওর ঘুম পাচ্ছে বলে শুয়ে পড়ল। সুমিতের একটু খারাপ লাগলেও বাধা দিল না। বরঞ্চ সে কোয়েলের মাথাটা নিজের বুকের কাছে নিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। মেয়েটা বড্ড নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সুমিত কোয়েলের কপালে একবার ঠোঁট ছুইয়ে নিজেও ওর পাশে শুয়ে পড়ল। 

ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই কেমন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে কোয়েল। যেন দুপুরে যা দেখল সেটা স্বপ্ন ছিল। যদিও সন্ধ্যে থেকে তেমন কিছু হয় নি। হয়ত  পুরোটাই ক্লান্তি ছিল। তবুও পাগল বুড়োর মুখটা বার বার মনে আসছিল। প্রথমে টোটোর পিছনে , তারপর আজ দুপুরে। একবার ভাবল বেরিয়ে রাস্তায় বুড়োটাকে খুজবে, কিন্তু সুমিত বেরতে চাইল না। গ্রামের লোকেরা নাকি অন্য কিছু ভেবে দুটো কথা শোনাতে পারে। অগত্যা এই প্রশ্ন কোয়েলের মনে বিঁধেই রইল। 

রাত্রে খাবার আগে বাথরুমে একটু স্নান করতে ঢুকল কোয়েল। বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে  শরীরটা। যদিও পুরোটাই মানসিক বলে মনে হচ্ছে তার। সাড়া গায়ে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শ মনটা কেমন করে তুলল। হঠাৎ খেয়াল হল, সুমিতের কথা। আজ রাত্রে সুমিতও তাকে এভাবেই স্পর্শ করবে। শরীরের সব লোম খাড়া হয়ে উঠল কোয়েলের। নিঃশ্বাস গভির হয়ে আসছিল। শরীর বেয়ে নামা জলের ধারা তাকে অন্য খেয়ালে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ  দরজার পিছনের হুক থেকে তার জামা গুলো মাটিতে পড়ে গেল। কোয়েল সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে তুলে আবার রেখে দিল। যাক ভেজেনি জামাগুলো। কিন্তু আট নয় সেকেন্ড পর ওগুল আবার পড়ে গেল। কোয়েল আবার তুলে রাখল। এবার ভালো ভাবে রাখল, যাতে কোনভাবেই না পড়ে। কিন্তু আবার একই জিনিস হলে, কোয়েলের মনে আগের ভয়টা আবার ফিরে এল। হঠাৎ যেন চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। একটা চাপা শুন্যতা গ্রাস করছে। সে গা মুছে জামাটা পরে নিল। বেরনোর আগে বাথরুমের আয়নার একবার নিজেকে দেখবে বলে যেই তাকাল, আর সামলাতে পারলো না নিজেকে। চিৎকার করে বাইরে বেড়িয়ে আসে। তার চিৎকার শুনে সুমিতও ছুটে আসে। কোয়েল সুমিত কে দেখে ভয়ে আঁকড়ে ধরে। সুমিত কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে কোয়েল বাথরুমের দিকে ইশারা করে। সুমিত বাথরুমে গেলে কিছুই দেখতে পায় না। সব কিছুই স্বাভাবিক মনে হয়। কোয়েল জানায়, যে  সে বাথরুমের আয়নাতে রক্ত দেখেছে, অনেক রক্ত। সুমিত আবার যায় বাথরুমে, কিন্তু সেখানে কিছুই নেই, এমনকি কোয়েলকেও দেখায়। কিন্তু সেখানে সত্যি কিছুই নেই। এবার সুমিত বেশ রেগে যায়। এসে থেকে কোয়েল এরকম করছে। কোয়েলকে রীতিমত জোর করে খাবার টেবিলে নিয়ে যায় সে। খাবার ইচ্ছা একদম না থাকলেও, কোয়েল খেয়ে নেয়। যতটা পারে ব্যাপারগুলো সে মন থেকে দুরে সরাতে চায়। রাত্রে কোয়েল বিছানায় শুতে এলেই সুমিত ওকে কাছে টেনে নেয়। তারপর কোয়েলের গালটা ধরে, কোয়েলের ঠোঁটে নিজের ঠোট ছুয়ে দেয়। কিন্তু কোয়েলের আজ এতটুকু আদরে মন নেই। সুমিত সেটা বুঝতে পেরে শান্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করে, তার কী হয়েছে। কোয়েল সবটা বলে, দুপুর থেকে সে যা যা দেখেছে বা অনুভব করেছে। সব শুনে সুমিত কোয়েলের মাথায় ছোট্ট করে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে, “ তুমি নিশ্চয় এখানে আসার আগে ভুতের গল্প পড়েছ। আর জায়গাটা এমনি গ্রামের বাইরে, এখানে তোমার অবচেতন মনে সেই গল্পগুলো ঘুরছে । তাই এইসব ভাবছ। এখানে তো প্রায় লোকজন আসে। তারা কেও কিছু কোনদিন তো বলে নি। সেরকম কিছু হলে কি আমায় সুমন এখানে আসতে বলত?”

সুমিতের কোথায় কোয়েল একটু ভরসা পেল। আর তাছাড়া আজকের দিনের জন্য অনেক অপেক্ষা করেছে ওরা। কোয়েলও চায়না, তার জন্য সবটা নষ্ট হোক। সে সুমিতকে জড়িয়ে ধরে। দুজনে আদরের সমুদ্রে ভাসতে থাকে। ধীরে ধীরে সুমিত কোয়েলের মুখ থেকে গলাই নেমে আসে। কোয়েলের পা সুমিতের পা কে আস্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরে। কোয়েলের নিঃশ্বাস গভির হতে থাকে। কিন্তু সুমিত যেই কোয়েলের গলা থেকে আর একটু নিচে নামে, হঠাৎ কোয়েল সুমিতের গলা ধরে ওকে শূন্যে তুলে দেয়। সুমিত এই অকস্মাৎ আক্রমনে চমকে ওঠে। সুমিত গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বার করতে পারে না। সে লক্ষ করে কোয়েলের চোখে মুখে আক্রোশ। চুল এবড়ো খেবড়ো হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। চোখের চারিপাশে কালো দাগ। নাক বেয়ে রক্ত পড়ছে। 

“আবার তুই আর একজনের জীবন নষ্ট করতে এসেছিস? আবার তুই একটা মেয়েকে শেষ করে দিতে এসেছিস? দেব না… আজ তোকে আমি কিছুতেই বাচতে দেব না।“ সুমিত স্পষ্ট শুনল একটা কর্কশ গলায় কথাগুলো বলছে কোয়েল। সুমিত কোয়েলের হাত ছাড়াতে চাইছে কিন্তু পারছে না। এত শক্তি কিভাবে এল কোয়েলের শরীরে? সুমিত কোনরকম বিছানা অব্দি হাত নামিয়ে মোবাইলটা তুলল, আর সেটা ছুঁড়ে মারল কোয়েলের মাথায়। আর চিৎকার করে কাঁদতে লাগল কোয়েল। সুমিত কে সে ছুঁড়ে খাটের অপর প্রান্তে ফেলে দিল। যেন সুমিতের ওজন একটা বিস্কুটের মতন। সুমিত জোড়ে শ্বাস নিতে থাকল। কাশতে লাগল গলায় হাত দিয়ে। হঠাৎ সব শান্ত। সুমিত কোনরকম উঠে দাঁড়াল। কোমরে বেশ জোড়ে লেগেছে। দেখল বিছানায় মাথাটা ধরে বসে আছে কোয়েল। সুমিত ভয়ে ভয়ে কোয়েলের দিকে এগিয়ে গেল। যদিও মেয়েটা এখন স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। সুমিত আর একটু কাছে যেতেই, কোয়েল পুরো স্বাভাবিক গলায় বলল, “উফফ, মাথায় কিভাবে ঠোকা লাগল বলত? কি ব্যাথা করছে। “

সুমিত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কোয়েল মাথাটা ধরেই সুমিতের দিকে তাকায়। “কী হল, তুমি নিচে পড়ে গেলে কিভাবে? কী হয়েছে বলত?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে কোয়েল। সুমিত তখনও কোয়েলের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। গলা দিয়ে কোন স্বর বেরচ্ছে না। 

ভোর অব্দি ওরা আর কেও ঘুমাতে পারে নি। সুমিতের মুখ থেকে সব শুনে কোয়েল কেঁদেই চলেছে। সে আর একটু হলে সুমিতকে হয়ত মেরেই ফেলত। সুমিতও গুম মেরে বসে আছে। কয়েক ঘণ্টা আগে অব্দি সে কোয়েলকে অনেক জ্ঞ্যান দিচ্ছিল, কিন্তু আজ সে যা দেখল তার পর সন্দেহ নেই, কিছু একটা গোলমাল আছে এই বাড়িতে। কোয়েলের মানসিক সমস্যার কোন রেকর্ড নেই আগে। আর সুমিতের মত চেহারার লোককে কোয়েলের মত রোগা মেয়ের, তুলে খেলনার মত ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াটা রীতিমত অসম্ভব। 

সুমিত প্রথমেই ঠিক করেছিল সোজা ষ্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরবে, কিন্তু কোয়েল পাগলা বুড়োর সাথে দেখা না করে যাবেনা। কেন জানেনা এসবের সাথে ঐ বুড়োর কিছু না কিছু মিল সে পাচ্ছেই। সুমিত সকালে ফোন করে চিরনকে ডাকল। তারপর ব্যাগ বার করে , বিলেকে টাকা মিটিয়ে টোটোতে উঠে বসল। ওদের আজকের দিনটাও থাকার কথা ছিল,  তাই বিলে যাওয়ার কারন জিজ্ঞাসা করলে ওরা এড়িয়ে গেল। এই সব জিনিস সবাইকে বলা উচিত না। হাওয়ার থেকেও দ্রুত এলাকায় রটে যাবে। ওর বন্ধুর ব্যাবসার ক্ষতি হবে। পরে কলকাতা ফিরে সুমনকে ওর রিসোর্টের ব্যাপারে জানানো যাবে। 

টোটোতে উঠে সুমিত চিরনকে একমাত্র সবটা বলল, না বললে উপায় নেই। কারন ওর সাহায্য নিয়েই বুড়োটাকে খুঁজতে হবে। 

“কিন্তু দাদা, এর আগে তো কেও এরকম কথা বলে নি। কলকাতা, বর্ধমান থেকে কেও এলে সুমনদা আমাকেই বলত টোটোর জন্য। অবশ্য বেশির ভাগই তো  সকালে এসে বিকালে কাজ মিটিয়ে চলে যায়।” চিরনের কোথায় সুমিত ও কোয়েল একে অপরের দিকে তাকায়। কথাটা শুনতে বেশ কটু লাগল। “তবে হ্যা, মাস তিন আগে দুজন রাতে ছিল। পরদিন সকালে সেই দিদি খুব অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। আমি ভাবলাম হয়ত রাত্রে ঘুম টুম হয়নি। এখন মনে হচ্ছে আপনাদের মতই কিছু কেস হবে।“ চিরন কথা গুলো সত্যি শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, নাকি এমনি বলে ফ্যালে সেটা সুমিত দুদিনেও বুঝতে পারল না। তবে এদিকে রিসোর্টটা যে শুধু অবাবিবাহিত ছেলে মেয়েরাই ব্যাবহার করে সেটা বেশ বুঝতে পারল। হঠাৎ কিছু একটা দেখে কোয়েল চিৎকার করে প্রায় চলন্ত টোটো থেকেই লাফিয়ে নেমে পড়ল। একটা বন্ধ দোকানের সামনে বসে আছে পাগলা বুড়োটা। কোয়েল গিয়ে তার সামনে দাড়াতেই বুড়োটা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল, “আমি জানতাম তুই আসবি মা। আমি জানতাম তুই আসবি।“ 

কোয়েল ঠিক কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। সে সুমিতকে ইশারায় একটা বিস্কুট প্যাকেট দিতে বলল। সুমিতের ব্যাগে কয়েকটা বিস্কুটের প্যাকেট ছিল, তাই থেকে একটা দিল। প্যাকেটটা নিয়ে বুড়ো আবার বলে উঠল, “সেই মমতা… মায়ের সেই মমতা।” প্যাকেটটা নিয়েই উঠে দাঁড়াল বুড়ো। একই কথা বলতে বলতে হাঁটা লাগাল। বুড়ো চলে যাচ্ছে দেখে কোয়েল একবার ডাক দিল, “ আরে দাদু, শুনুন… আপনি কি কাল দুপুরে আমাদের ওখানে গিয়েছিলেন? দাদু শুনুন।“

লালন ক্ষ্যাপা দাড়িয়ে যায়। কোয়েলের দিকে ঘরে। চোখে চাপা আক্রোশ, মুখ দিয়ে লাল পড়ছে। “আজ রাতে তুই ভয় পাবিনা একদম মা। আজ অসুর বিনাশ হবেই। মা রে। আজ ভয় পাশ না” কথা গুলো বলেই হো হো করে হাসতে হাসতে চলে গেল। সুমিত ও কোয়েল কিছুই বুঝতে পারল না। তারা চিরনকে খুঁজছিল। পাশের গলি থেকে চিরন একটা বিড়ির প্যাকেট নিয়ে ফিরল। কিন্তু মুখে চিন্তা। বলল, “দাদা,  একটা কেস হয়েছে। বোলপুরে ট্রেনের মাথার উপরের তার ছিঁড়ে গেছে। বিকালের আগে ঠিক হবেনা। আপনারা আপাতত দুপুরে রিসোর্টে ফিরে খাওয়া দাওয়া করুন। বিকালে আমি এসে নিয়ে যাব । নাহলে দিদিকে নিয়ে আপনি কোথায় অপেক্ষা করবেন?”

সুমিত ও কোয়েল একে অপরের দিকে তাকায়। ঐ রিসোর্টে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা একদম নেই ওদের। আবার উপায়ও নেই। ওরা ফিরেই গেল। চিরন বলল, “লাইন ঠিক হওয়ার খবর পেলেই চলে আসব।“ চিরন ছেলেটাকে সুমিতের একটু শিক্ষিত মনে হল। এদিকে সমস্যা হল, রিসোর্ট ছেড়ে দেওয়াতে বিলে অন্য কাওকে রিসোর্ট বুক করে দিয়েছে। যদিও তাদের আসতে বিকাল হয়ে যাবে।

সুমিত খাবারের ব্যাপারে কথা বলে ঘর এসে দেখে কোয়েল খুব চিন্তিত।

“কী হল কোয়েল? কী ভাবছ?” সুমিত জিজ্ঞাসা করে। 

“আচ্ছা, ঐ বুড়ো দাদুটা আজ রাতের কথা বলল কেন? কি হবে আজ রাতে?”

“কিছু না, আমরা রাতে কলকাতা ফিরব। এর বেশি কিছুই হবেনা। এখন যাও, একটু ফ্রেশ হয়ে নাও। বিলে জলখাবার তৈরি করছে।” সুমিত রীতিমত জোর করে কোয়েলকে বাথরুমে পাঠাল। এরপর সারাদিনে নতুন করে আর কিছু হয়নি। শান্তিতেই সবটা কাটছিল। কিন্তু খাওয়ার পর বাগানে ঘোরার সময় কোয়েলের পা বাজে ভাবে মচকে গেল। কোয়েল তাকিয়ে দেখে তার জুতোর হিল ভেঙ্গে গেছে। যদিও রাস্তা একদম সমান। সুমিত কোয়েলকে ঘরে নিয়ে আসে। যন্ত্রনায় ছটফট করছে সে। এদিকে বিলে এসে খবর দেয় চিরন এসে গেছে। সুমিত ছুটে চিরনের কাছে গিয়ে বলে কোন স্প্রে বা ওসুধ আনতে। কোয়েলের এই অবস্থায় হেঁটে যাওয়া অসম্ভব। চিরন জানায় ওষুধের দোকান আছে সেই শান্তিনিকেতন ঢুকতে । এই গ্রামে নেই। সুমিত চিরনকে একটা পাঁচশ টাকার নোট দিয়ে অনুরোধ করল। ওষুধ না আনলে কোয়েলকে নিয়ে যাওয়া যাবেনা কোনভাবেই। এদিকে আজ রাতে সে কিছুতেই এখানে থাকতে পারবে না। 

সুমিত ঘরে এসে দেখল কোয়েল পা ধরে বসে আছে। সুমিত কোয়েলর পায়ে বরফ লাগাতে থাকে। কিন্তু তাতেও আরাম হয় না। 

“এ সব আমায় আটকানোর জন্য সুমিত। তুমি যত চেষ্টাই কর, আমার আজ যাওয়া হবে না” কোয়েল শান্ত গলায় বলে। সুমিত তাকায় কোয়েলের দিকে। চোখ ফুলে গেছে যন্ত্রণায়। কোয়েল আরও বলল, “নতুন জুতো, হিল ভাঙ্গার প্রশ্নই নেই। তাও ভাঙল। জানিনা আজ রাতে কী অপেক্ষা করছে আমার জন্য”, কোয়েলের চোখের কোন দিয়ে জলের রেখা নেমে আসে। সুমিত কোয়েলকে কাছে টেনে নেয়। প্রায় সন্ধ্যে নেমে গেছে। তাও চিরনের দেখা নেই। এদিকে বিলে বারবার অনুরোধ করছে তাদের ঘর ছেড়ে দেওয়ার জন্য। বাধ্য হয়ে সুমিত সুমনকে ফোন করে সব জানাল। তার সাথে বিলেকে বোঝানোর জন্য বলল। সুমন সব শুনে মনে হল না ব্যাপারটা তেমন পাত্তা দিল। শুধু জানাল, সে বিলে কে বলবে যাতে ওদের একটা ঘর ছেড়ে দেয়। কারন যারা আসবে, তারা সবাই লোকাল ছেলে, ছাদে জন্মদিন পালন করবে। 

ঘরে এসে সুমিত অনেকবার চিরনকে ফোন করেছে, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সুমিতের ফোন থেকে চিরনের ফোনে ফোনই যাচ্ছেনা। কোয়েলের ফোনেও তাই। সুমিত লক্ষ করেছে কোয়েল কেমন ‘থ’ মেরে গেছে। বিলে জানায় সে চা   ডাইনিঙ টেবিলে দিয়ে দিয়েছে। সুমিত আর কোয়েলকে যাওয়ার জন্য জোর করে না। সে নিজেই ওদের চা আনতে ডাইনিঙে যায়। তখনই দেখে মেন গেটে একটা বড় গাড়ির আলো। বিলে গাড়ি দেখে ছুটে যায়। সুমিত বুঝতে পারে এরাই আজকের গেস্ট। দলে চারটে ছেলে, সবার বয়সই ওদের মত। তারা সুমিত কে দেখে ইশারায় সম্বোধন করে। সুমিতও মুচকি হাসে। ছেলেগুল বেশ বড়লোক ঘরের ছেলে। সোজা ছাদে উঠে গেল। বোঝা গেল এরা এখানে প্রায় আসে। 

সুমিত ঘরে এসে কোয়েলকে চা দিল। কোয়েল একটাও কথা বলছে না। সুমিত কোয়েলকে ছেলেগুল আসার কথা জানালে, সাথে সাথে কোয়েলের মুখ কেমন একটা হয়ে গেল। 

“কী হল, তুমি চুপ মেরে গেলে কেন?” সুমিত জিজ্ঞাসা করে। 

“কিছু না” বলে কোয়েল চাদরটা গায়ে টেনে নেয়। যেন সে নিজেকে লোকাতে চাইছে। 

“কী হল কোয়েল , শরীর খারাপ করছে?” সুমিত কোয়েলের কাছে আসে। কিন্তু সুমিতকে ছুঁতে দেয় না কোয়েল। সুমিত লক্ষ করে কোয়েলের এলোমেলো চুলগুলো মুখটাকে প্রায় ঢেকে দিয়েছে। কী হল কোয়েলের। কেন যে ওরা এখানে আসতে গেল। সুমিত একবার উঠে ছাদে গেল। ওখানে মোবাইলে নেটওয়ার্ক এলে একবার চিরনকে ফোন করবে। কোয়েলকে এখানে ফেলে রাখা খুব সমস্যার। ওষুধ না পেলেও যেতেই হবে আজ। সেরকম হলে বোলপুরে কোথাও থেকে যাবে। ছাদে এসে সুমিত দেখল রীতিমত মদের আসর বসিয়েছে ছেলেগুলো। সুমিত সেদিকে না তাকিয়ে ফোনে চেষ্টা করল। কিন্তু পেল না। সে নিচে নেমে গেল। নিচে এসে দেখে কোয়েল ধীর পায়ে হাঁটছে। কোয়েলের মুখ ওর চুলে ঢাকা। 

“এ কি তুমি উঠে এলে কেন, কোয়েল?” সুমিত কোয়েলের কাছে যেতেই সিঁড়ি দিয়ে কারোর নামার শব্দ পাওয়া গেল। 

“হ্যা, গাড়ি থেকে বাকি বোতলগুলো আনছি দাড়া” বলে ছেলেটা নেমে এসে আবার হাসল সুমিতের দিকে। কিন্তু কোয়েল ওকে দেখেই ভয়ে ছিটকে সরে গেল। 

“ও কেন , ও কেন… ও মেরে ফেলবে আমায় সুমিত। খুব কষ্ট দেবে। খুব। ও কেন?“ , ছটফট করতে লাগল কোয়েল। এরকম আচরনে বেশ বিব্রত হয়ে উঠল সুমিত। সে কোয়েলকে জাপটে ধরে রেখেছে। ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ কোন সমস্যা ভাই?”

“না না কিছু না” সুমিত হেসে কথাটা বলে। ছেলেটা কোয়েলের আচরনে হয়ত ওকে পাগল ভাবল। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বেড়িয়ে গেল। ছেলেটা বেড়িয়ে গেলে কোয়েল ছুটে ঘরে ঢুকে গেল। এক কোণে পা গুটিয়ে জড়সড় হয়ে বসে পরে। সুমিত ছুটে যায় কোয়েলের কাছে। 

“কোয়েল, কেন করছ এরকম?” 

কোয়েল কাঁদতে শুরু করে। সুমিত কি করবে বুঝতে না পেরে যেই কোয়েলকে জড়িয়ে ধরতে যায়, ওমনি এক ধাক্কায় সে সুমিত কে দূরে ঠিলে ফেলে দেয়। সুমিত সোজা দরজায় ধাক্কা খায়। সে কোয়েলের দিকে ঘোরে যখন, সামনের দৃশ্য দেখে রীতিমত আতঁকে ওঠে। কোয়েল শূন্যে ভাসছে। তার দুই হাত দু দিকে মেলা। চুল চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। খুব কাঁদছে। সুমিত রীতিমত ভয় পেয়ে যায়। গোটা ঘরে আলো নিভে যায়। বাইরের আলোর সামান্য ছটা এসে পরছে ঘরে। ভাসমান কোয়েলের শরীরটা এক নিমেশে সুমিতের দিকে এগিয়ে আসে। তারপর সুমিতের গলা চেপে ধরে। “ওদের এখান থেকে চলে যেতে বল। ওরা জানোয়ার। ওরা পিশাচ। ওরা এখানে থাকবে না। ওদের এখান থেকে যেতে বল। ওদের এখান থেকে না তাড়ালে এই মেয়েকে আমি মেরে দেব। এই মেয়ে কাল সূর্যের আলো দেখবে না।“ কথাটা বলেই কোয়েলের শরীরটা আবার হাওয়াতে ভেসে উঠল। আর তার সাথে জোর কান্নার আওয়াজ। হঠাৎ কোয়েলের শরীরটা শুন্য থেকে এসে সুমিতের কোলে পড়ল। আর সাথে সাথে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল কোয়েল। সুমিত ওকে তুলে বিছানায় শুয়ে দিল। হাসফাস করছে কোয়েল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। এ কোন জ্বালায় পড়ল সুমিত। কী হচ্ছে তার সাথে? সব ফোন বন্ধ। কাওকে যোগাযোগও করা যাবে না আর।  কী করবে এখন সে? তবে কি ‘ও’ ছেলেগুলকে চলে যেতে বলবে? ওরা কি মেনে নেবে? কী ব্যাখ্যা দেবে ও ছেলেগুলোকে?

সুমিত ছাদে উঠে এল। পুরো ঘামে স্নান করে গেছে সে। ছেলেগুল তাকে দেখে  নিজেদের মধ্যে হাসছে। একটু আগের নিচের ঘটনাটা মনে হয় সবাই শুনেছে। 

“বলছি, দাদা , খুব অসুবিধা না হলে কি আপনারা আজ পার্টী না করে, কাল করবেন? মানে যদি আজ আপনারা চলে যান এখান থেকে তো ভালো হয়। “ সুমিত কথাটা বলেই বুঝল, জিনিসটা খুব খারাপ হতে চলেছে।

“মানে?” একজন বলল, “ আমরা চলে যাব কেন?”

“এমনি, মানে আপনারা নেশা করছেন, হইহুল্লর করছেন, একটু অসুবিধা হচ্ছে আরকি, টাকার ব্যাপারটা আমি দেখে নেব। “ 

“এই, ইয়ার্কি হচ্ছে, আমরা ছাদে নেশা করছি, আর তোমার নিচে অসুবিধা হচ্ছে? অন্য একজন বলল। 

সুমিত কি বলবে কিছু বুঝতে পারল না। 

“আসলে দাদার হানিমুনে কষ্ট হচ্ছে, লাগলে বল, আমরা টিপস দিয়ে দেব” কথাটা শুনে বাকি ছেলে গুলো হাসতে শুরু করল। 

সুমিত চুপ করে থাকে। প্রথমজন আবার বলে,”দাদা, আপনি ঠিক কি বললেন বুঝলাম না। আমরা কোথাও যাব না। এখানে আছি, সারারাত মস্তি করব, সকালে চলে যাব। আপনি নিজের ঘরে যান। বেকার এদের মাথা গরম করে দিচ্ছেন।“

সুমিত আর কোন উত্তর না দিয়ে নিচে আসে। সে তাকিয়ে দেখে ছাদের ঘর থেকে বিলে সব দেখছে। সুমিতকে দেখেই আবার ঘরে ঢুকে পরে। ছেলেগুলো রীতিমত হাসাহাসি করছে। সুমিত ধীরে ধীরে নেমে আসে নিচে। কী করবে ও এখন? নিচে এসে দেখে ডাইনিঙে কোয়েল আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে । সুমিত ওর কাছে যেতেই আবার সিঁড়িতে শব্দ শুনতে পেল। ছেলেগুল নিচে নামছে। একজন বিলে কে উল্লেখ করে বলল, “ খেতে দিবি আয়। অনেক্ষন শুধু জল টেনেছি। “

ছেলেগুল নেমে আসতেই কোয়েলের মুখের ভাব ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে সুমিতের পিছনে গিয়ে দাড়িয়ে পরল। ছেলেগুলো কোয়েলকে দেখে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা ইশারা করল। সুমিত কোয়েলকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে যেতে গেল, কিন্তু এক চুলও নড়াতে পারল না। কোয়েল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেগুলোর দিকে। ভয়ে কাঁপছে। ছেলেগুলো আড় চোখে কোয়েলকে দেখছে। সুমিত আর একবার কোয়েলকে টান মারতেই কোয়েল চিৎকার করে উঠল, “ওদের এখান থেকে যেতে বল সুমিত। ওরা খারাপ। ওরা জানোয়ার সবাই।”

সুমিত এই অবস্থায় কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। ছেলেগুল মনে হচ্ছে শেষ কথাটা বেশ গায়ে লাগিয়েছে । 

“কী করছ তুমি কোয়েল। ঘরে চল। “ 

“ না যাব না।“ আবার চিৎকার করে ওঠে কোয়েল। “ওরা জবাকে মেরেছে। ওরা জবাকে যন্ত্রণা দিয়ে মেরেছে সুমিত। ওদের কে এখান থেকে যেতে বল” 

ছেলেগুল কোয়েলের কথা শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠল। সুমিত ওদের দেখে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করতে লাগল, “ দাদা, কিছু মনে করবেন না। ওর শরীর অসুস্থ। তাই ভুলভাল বলছে। “

“ও জবার ব্যাপারে কিভাবে জানল? কে তোমরা?” প্রথম ছেলেটা এগিয়ে এল। 

কোয়েল আরও দু পা পিছিয়ে গেল। সে অঝোরে কাঁদছে, “সুমিত এই সে, যে জবাকে খুন করেছে। এরা সবাই খুন করেছে। এরা জবাকে একের পর এক সবাই ধর্ষণ করে খুন করেছে।“

“কি আজে বাজে বলছ তুমি কোয়েল। চুপ কর।“ সুমিত কোয়েল কে জাপটে ধরে। বাকি ছেলেগুলো এগিয়ে আসে। দুজন সুমিতকে ধরে কোয়েলের থেকে আলাদা করে। 

“আরে দাদা, কি করছেন আপনারা?” সুমিত ছটফট করতে থাকে। বিলেকেও ডাকতে থাকে। কিন্তু বিলে ভয়ে সিঁড়ি থেকে নামছে না। প্রথম লোকটা কোয়েলের কাছে এগিয়ে যায়। “এ জবার ব্যাপারে কি করে জানল?”

“দাদা ও ভুল বকছে, ও কোন জবাকে চেনে না। আমরা কালই এসেছি কলকাতা থেকে। চলে যাব এখুনি। প্লিস শুনুন” সুমিত মিনতি করে। 

“না না না , ব্যাপার অন্যকিছু।“ প্রথম লোকটি কোয়েলের আরও কাছে এগিয়ে গেলে কোয়েল এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে পরে। চিৎকার করতে থাকে, “সুমিত এ জবাকে মেরেছে। একে সরে যেতে বল। সুমিত সরে যেতে বল।“

“আরে হ্যা হ্যা, মেরেছি। আমরাই মেরেছি জবাকে” , লোকটা হুঙ্কার দিয়ে উঠল। “কিন্তু এ কী করে জানল ? এ কে হয় জবার?

“কেও না, কোথাও ভুল হচ্ছে দাদা” সুমিত বলতে থাকে।

“ভুল হচ্ছেনা। শালা এক বছরে কাক পক্ষীও ব্যাপারটা টের পায়নি। এ কী করে জানল। জবা এখানে বাগানে জল দিতে আসত। উফঃ যা চাবুক শরীর ছিল না। তার উপরে পুরো টাটকা। এখন জন্মদিনে কোন জিনিস আমি নেব বললে, সেটা না নিয়ে তো ছাড়ব না। আর জবার শরীর না পেলে সেদিন আমি ঘুমাতেই পারতাম না। তাই তুলে আনলাম ওকে। যে ঘরে তোরা আছিস, ঐ বিছানায় প্রথমে ওকে খেলাম। তারপর বাথরুমে ওকে জোর করে স্নান করিয়ে আবার খেলাম। বাথরুমের আয়নাতে সেই খাওয়ার ভিডিও করলাম। তারপর বাকিরা ধীরে ধীরে প্রসাদ পেল। গ্রামের মেয়ে। ছেড়ে তো দেওয়া যায় না। তাই মেরে ফেললাম মাথা থেতলে। খুব চিৎকার করছিল। খুব। বড্ড কষ্ট হয়েছিল মেয়েটার। কিন্তু ওর কষ্টটাই টো আমার পুরুষত্ব নাকি?” কথা গুলো বলেই হাসতে লাগল লোকটা। সাথে বাকি তিনজনও। সুমিত শুনে হতবাক। কী নৃশংস এরা। 

“কিন্তু এ এসব জানল কী করে? শালা, এতো লুকিয়ে রাখলাম ব্যাপারটা।“ প্রথম লোকটা কোয়েলের কাছে গিয়ে কথাটা বলে। পাশ থেকে আর আকজন বলে, “এইদুটো কেও একই ভাবে উড়িয়ে দে না ভাই। তাহলেই তো হল।“

“সে তো হবে, কিন্তু এই মেয়েটাও কম ডবকা না। এমনি এমনি মেরে দেব, নাকি তোরা প্রসাদ নিবি এর?” লোকটার এই কথাটা আর সুমিত সহ্য করতে পারল না। কোয়েল রীতিমত আতঙ্কে কাঁপছে। সুমিত ডানদিকের লোকটাকে হাতের ঝটকায় পাশে ঠিলে দিল। আর পা দিয়ে পিছনের লোকটার হাঁটুতে এক লাথি মারল। লোকটা হাঁটু ধরে ছটফট করতে লাগল। এরা কেও জানে না সুমিত ‘এন আই এ’ অফিসার। আত্মরক্ষার কায়দা তার বেশ জানা আছে। সে নিজের শরীরটাকে শূন্যে ফেলে প্রথম লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর কোয়েলকে নিয়ে দৌড় লাগাল। কিন্তু কোয়েলের পায়ে ব্যাথা। সে হাটতেই পারছে না। অগত্যা ছেলে গুলো এসে আবার ধরে ফেলল সুমিতকে। এক জন এসে সুমিতের মাথার পিছনে আঘাত করলে, সুমিতের হাত কোয়েলের হাত থেকে ছেড়ে যায়। সুমিত মাথা ধরে বসে পড়ে। আর আকজন কোয়েলকে ঠেলে বাগানে ফেলল। প্রথম লোকটা ধীরে ধীরে কোয়েলের দিকে এগিয়ে গেল। কোয়েল পিছিয়ে যেতে যেতে সেই মূর্তিতে ধাক্কা খেল। 

“আরে একদম সঠিক জায়গা। এখানেই তো জবাকে পুতে দিয়েছিলাম মেরে। কেও জানেনা। তোদেরও এখানেই পুতে দেব।“ কথাগুলো বলে যেই প্রথম লোকটা কোয়েলের গায়ে হাত দিতে যাবে, ওমনি কোয়েল হঠাৎ নিজের জড়তা কাটিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল। লোকটার গলা ধরে সে শূন্যে তুলে দিল। এরকম অবস্থা দেখে বাকিরা রীতিমত চমকে গেল। কর্কশ গলায় কোয়েল বলে উঠল, “কী ভাবিস তুই? পুরুষ? নিজেকে পুরুষ ভাবিস? অসহায় মেয়েদের শরীর খাবলে খাবলে তুলে, নিজেকে পুরুষ ভাবিস? দেখ, আজ তুই কোথায়। দেখ তুই কেমন ছটফট করছিস। দেখ।“

সুমিত নিজের চোখে যা দেখছে, বিশ্বাস করতে পারছেনা। কোয়েলের মুখ বড় ভয়ঙ্কর। শরীর যেন অমানুষের। উঠে দাড়িয়েছে সে। আর লোকটাকে গলা ধরে শূন্যে ভাসিয়ে রেখেছে। বাকিরা ব্যাপারটা দেখে হতবাক।  হঠাৎ গেটে আলো পড়তেই বাকি দুজন দৌড় লাগাল পাঁচিলের দিকে। সুমিত ঘোলাটে চোখে দেখল একটা টোটো ঢুকছে। কেও একজন ছুটে আসছে ওর দিকে। কে? চিরন?

পরদিন পুলিশ এসে ঐ মূর্তির নিচে থেকে  একটা কঙ্কাল খুঁজে পায়। ঠিক সময় এসে চিরন কোয়েলকে হুঁশে ফিরিয়ে আনে, তাই  প্রথম লোকটা মরতে মরতে বাঁচে। যদিও অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। আর একজনের পা ঘরের ভিতরেই সুমিত ভেঙ্গে দিয়েছিল, তাকেও পুলিশ গেফতার করে। সুমিত নিজের পরিচয় দিয়ে  পুলিশকে যতটা সম্ভব সাহায্য করে। বিলেকেও পুলিশ ছাদ থেকে পাকড়াও করে। কারন এক বছর আগের ঘটনা সে নিজের চোখে দেখে গোপন করে রেখেছিল। আশা করা যায় বাকি দুজনকেও পুলিশ ধরে ফেলবে। সুমন সকালে সব জেনেই কলকাতা থেকে এসে পড়েছে। 

চিরন এখন টোটো চালাচ্ছে। তার টোটোতে এখন স্টেশনের পথে সুমিত ও কোয়েল। দুজন দুজনের হাত ধরে বসে। 

সেদিন রাত্রে লালন ক্ষ্যাপা আপন মনেই কাকে যেন বলছিল,”শান্তি পেলি মা? শান্তি পেলি? জানিস, তুই যেমন আমায় রোজ সকালে পরোটা খেতে দিতিস, এই মেয়টাও আমায় খেতে দিয়েছিল। মা রে… তুই এখন ভালো থাক মা। আর এ দুনিয়াতে ফিরিস না মা। মা রে… এ যন্ত্রণার কোপ তোকে আর পেতে হবে না মা”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here