শেষের পরে

1
741

প্রতিদিনের ব্যস্ততার ঘেরাটোপে আমাদের মনের আবেগে যেন তালা পরে গেছে আজকাল। কেমন যেন আমরা এক একজন যন্ত্র মানবে পরিণত হয়েছি। এই অনলাইন যুগ আমাদের আবেগ নিংড়ে নিয়েছে আরো বেশি করে। সকালে আজকাল ঘুম ভাঙে ফোনের ওয়াটস্যাপ নোটিফিকেশনে। ঘুম ভাঙা চোখে লিঙ্ক এ আঙ্গুল ছোঁয়ালেই শুরু হয়ে যায় ক্লাস। ট্রাফিকের ঝক্কি পোহাতে হয় না আর। টিচারের আসার অপেক্ষায় দরজা মুখর হয়ে বসে থাকতেও হয় না। ক্লাসের মাঝে ব্যাগের আড়ালে মুখ লুকিয়ে টিফিন ও সাড়া আজ অতীত । জোর করে ঢুলু ঢুলু চোখে ব্ল্যাক বোর্ডের দিকে জোর বশত চেয়ে থাকতে ও হয় না। বেশ আরামেই দিন কাটছে। কিন্তু হয়তো ততটাও আরামের নয়। ওই যে আগেই বললাম। আবেগের দরজায় তালা পরে গেছে। ”

পরের লাইন শুরু করতে যাবে এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে বেশ খানিকটা বিরক্ত হয়েই দরজার দিকে এগিয়ে গেলো আর্শিতা। দরজার বাইরে রাতের খাবার নিয়ে দাড়িয়ে তার মা। বিরক্তির ছাপ চোখ দুটো থেকে নিমিষে মুছে গেল তার।

  • মা !

  • সন্ধ্যে থেকে কিছু খাসনি ! কটা বাজে খেয়াল আছে ?

ঘড়ির কাটায় চোখ রেখে সময়টা দেখতেই মায়ের সামনে কান ধরে আর্শিতা।

  • একটু দেরী হয়ে গেলো মা । আসলে!

  • হ্যাঁ জানি। ওই কলেজের ই ম্যাগাজিনের জন্যে লিখছিস তাই তো ?

  • হ্যাঁ। ওই আর কি। চেষ্টা করছি যদি কিছু একটা লেখা যায়।

 

পড়ার টেবিলের উপরে দলা পাকানো কাগজের পাহাড় দেখে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলেন সহেলী দেবী।

  • আরু! আর কতোদিন এইভাবে থাকবি তুই ?

  • ছাড়ো না মা। লেখাটা শেষ করতে হবে আজকেই।

  • পারবি তো ?

  • দেখি। আচ্ছা বাদ দাও না।

  • বেশ দিলাম তবে।

  • খাইয়ে দাও আমায়।

  • পাগলি মেয়ে একটা। আয় ওই চেয়ারটা নিয়ে বোস।

  • তুমি খেয়েছো?

  • তোকে ছাড়া কোনদিন খেয়েছি ?

  • না , তুমি এই নিয়মটা পাল্টাও এবার। আমি না থাকলে তখন কি করবে?

আর্শিতার কথা শুনে চোখ ভিজে ওঠে সহেলী দেবীর।

  • তুই কোথায় যাবি আমায় ছেড়ে?

খানিক চুপ থেকে মাথা নিচু করে আর্শিতা বলে,

  • এই চেনা শহরের ভিড়ে দমবন্ধ হয়ে আসছে। চেনা রাস্তা, চেনা মুখ গুলো হারানো সময় গুলো বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে। পারছি না আর।

আর্শিতার ভিজে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরতেই তার মা তাকে জড়িয়ে নেয় নিজের বুকে।

  • আমাকে ছেড়ে কিভাবে থাকবি ?

  • ও মা ! এরম বলো না। আমি তোমাকেও নিয়ে যাবো।

  • আর তোর বাবা?

  • জানি না। তুমি যাবে।

  • আচ্ছা ঠিকাছে দেখা যাবে। এবার খেয়ে নে মা। দেখ সাড়ে বারোটা বাজে।

উঠে বসে মায়ের আচলে চোখ মুছে মায়ের হাতে রাতের খাবার সেড়ে আবার পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে বসে সে। টেবিল ল্যাম্প এর হলুদ আলো জ্বালিয়ে আবার লেখায় মন দেয় আর্শিতা। আগের লেখাটা সরিয়ে রেখে নতুন ভাবে লিখতে শুরু করে।

” Online class:

New normal er যুগে online class এর দরুণ আমি মনে করি বেশ কিছু আবেগ যেন স্টুডেন্ট জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। যেমন এখন আর ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় কখন বেল্ট পড়বে সেই নিয়ে টানটান উত্তেজনা নেই। ফার্স্ট বেঞ্চে টিচারের আড়ালে ব্যাগে মুখ লুকিয়ে টিফিন খাওয়া নেই। বেলের শব্দে এখন আর ক্লাস শেষ হয় না। উনিফর্ম পরে ক্লাস করতে হয় না। ছুটির বেল পড়ার পাঁচ মিনিট আগে থেকেই ব্যাগ গোছানোর তাড়া নেই। একটা পিরিয়ড সেষ হলে করিডোরে ঘুরে বেড়ানো নেই। পড়া না পারলে অন্য ক্লাসের সামনে কান ধরে দাড়ানো নেই। অন্য ক্লাসে যদি ক্রাশ থাকে, ক্লাস শেষে সেই রুমে চুপি চুপি উঁকি দেওয়া নেই।



বেঞ্চ বাজিয়ে বেসুরো গলায় গান করা নেই। প্রিয় ম্যাডাম বা স্যার এর ক্লাসে লাস্ট বেঞ্চ থেকে উঠে ফার্স্ট বেঞ্চে এসে বসা নেই। বোর্ডে ডেকে পড়া ধরার পাঠ ও এই online যুগে হারিয়ে গেছে। হোম ওয়ার্ক এর খাতা নিয়ে স্যারের টেবিলের সামনে দাড়িয়ে গল্প করার সুযোগ নেই। প্রেয়ার লাইনে দাড়িয়ে প্রেয়ার করা, আর কেউ বদমাইশি করলে স্যার এর বকুনি টাও আজ আর নেই। অফ ক্লাসে বন্ধু দের সাথে আড্ডাটা ঠিক আগের মতো জমে না। মনিটরের পদে নিয়োগ হওয়া ছেলেটা বা মেয়েটা আজ কর্মহীন। লেট মার্ক আর ডায়েরির পাতায় দাগ কাটে না। টিফিন টাইমে আজ শূন্য খেলার মাঠ। ভীড় জমেছে অনলাইনে। নেই বার্থডে গার্ল বা বয়ের পকেট কেটে ট্রিট চাওয়া।

এই সব কিছুই যেন স্টুডেন্ট লাইফের আবেগ। আজ সেই আবেগ গুলো ভীষণ ভাবে জানান দিচ্ছে আমরা ঘরবন্দি। আবেগ গুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে এই সব মূহুর্তের গুরুত্ব।”

লেখা শেষ করে একবার চোখ বুলিয়ে আড়মোড়া ভেঙে টেবিলেই মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে পরে আর্শিতা। আজকাল তার ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুম আসে না। তবে আজ রাতে তার ঘুমের ওষুধের প্রয়োজন পরল না। নতুন কাগজ আর কালির সেই চেনা গন্ধ মেখে তাকে অনুভব করতে করতেই চোখে ঘুম নেমে এলো আর্শিতার। অনেক মাস পরে সে লিখতে বসেছিল আজ। একরকম জোর করেই আর্শিতা কে রাজি করানো হয়েছিল।

সকাল হতে লেখার কাগজ টা গুছিয়ে কোনো রকমে ব্রেকফাস্ট মুখে পুরে বসে পরে ল্যাপটপের সামনে।

কলেজের ই-মেইলে লেখা পাঠিয়ে বারান্দায় এসে বসে।

বারান্দায় এসে বসে খবরের কাগজে মন দিতেই ফোনের নোটিফিকেশনে একটু বিরক্ত হলো আর্শিতা। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখে তার বন্ধু ইশিকার মেসেজ। মেসেজ না দেখে রেখে দিতেই ফোন বেজে ওঠে তার। ইশিকারই ফোন।

একটু বিরক্তির সাথে ফোন রিসিভ করে আর্শিতা।

  • হ্যালো!

  • এই কি রে ? রিপ্লাই করলি না ?

  • মাথাটা একটু ধরেছে তাই।

  • ওহ ! কেনো ? ঠান্ডা লাগিয়েছিস ?

  • না। কেনো ফোন করেছিস বল!

  • আরে এইভাবে বলছিস কেন ! এমনি ফোন করা যায় না ?

  • আসলে ইচ্ছে করছে না কথা বলতে।

  • কোনদিন ইচ্ছে করে তোর?

  • তাহলে ফোন করেছিস কেনো? জানিস যখন।

বলে ফোন রেখে দেয় আর্শিতা।

ফোনের সুইচ অফ করে ঘর অন্ধকার করে খাটে গিয়ে শুয়ে পরে সে।  বন্ধুত্বহীনতার অন্ধকারে ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল সে। কোথাও যেন কাউকেই বেঁধে রাখতে আর সে চায় না। তাই আজ তার কোনো বন্ধু বৃত্ত নেই। মন খারাপেও কাউকে বলার আগে দশ বার তাকে ভাবতে হয় , বলতে পারে না আর সে কাউকেই। অথচ মনে তার জমে আছে পাহাড় সমান অভিমান। নানান প্রশ্নের ভিড়ে জড়জরিত হয়েও ” এই শোন ” বলে ডেকে কাউকে গড়গড় করে সব কথা বলার মতন মানুষের খুব অভাব। মনমরা, জেদি, একঘেয়েমি একটা মেয়ের সাথে কেউ কেনোই বা বন্ধুত্ব করবে ! বন্ধুত্বের উদাহরণ তো এখন ঠান্ডা ঘরের ডাইনিং টেবিলে কিংবা হাসি ঠাট্টাতেই বন্দি। পাশে থাকার মধ্যে আজকাল আর বন্ধুত্বের অনুভুতি নাকি পাওয়া যায় না।

ধীরে ধীরে চোখের কোণ ভিজে জল গড়িয়ে পরে তার। মাঝে মাঝে নিজেও যেন এই রকমই থাকতে পছন্দ করে আর্শিতা। কখন যেন ঘুমিয়ে পরে সে। বেলা তখন বেশ বেড়েছে। এমন সময় তাকে ঘুমোতে দেখে সহেলী দেবী বেশ অবাকই হলেন। তবে মেয়েকে অঘোরে ঘুমোতে দেখে আলতো হাতে চুলের মাঝে বিলি কেটে চলে গেলেন রান্না ঘরে।

মাস তিনেক ধরে অনলাইন ক্লাস হচ্ছে আর্শিতার। যা তার একেবারে অপছন্দের। এক রকম বাধ্য হয়েই দিনে দুপুরে তাকে ছয় ইঞ্চির রঙ্গিন স্ক্রিনে চোখ রাখতে হয়। নতুন বন্ধুও তার হয়েছে তবে হাতে গোনা কয়েকজন।

মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে আর্শিতার। ঘুম ভাঙা চোখেই স্নান সেড়ে দুপুরের খাবার টেবিলে এসে বসে সে। আর্শিতার চুলে জড়ানো টাওয়াল খুলে ভালো করে মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে সহেলী দেবী বলেন,

  • আজ এরকম অসময়ে ঘুমিয়ে পড়লি যে !

  • জানিনা। ভালোলাগছিল না তাই শুয়ে পড়েছিলাম। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি।

  • প্রেরণার সাথে কথা হয়েছে ?

  • না।

  • তুই বলিস নি ?

  • না।

  • হুম। চল খেয়ে নে এবার।

  • হুম।

মেয়েকে খাবার বেড়ে দিয়ে পাশে বসলেন সহেলী দেবী। চিন্তার ভাঁজ তার কপাল ছুঁল। গত কয়েক মাস ধরেই হাসি খুশি মেয়েটাকে মনমোড়া হয়ে থাকতে দেখেও বুকে জড়িয়ে নেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারছেন না তিনি। মেয়ের অস্থিরতা কমানোর কোনো হদিস খুঁজে না পেয়ে নিজেও বেশ অসহায় অনুভব করেন সহেলী দেবী।

দুপুরের খাবার সেড়ে ঘরে যেতেই কলিং বেল বেজে ওঠে। সহেলী দেবী দরজা খুলে দেখেন দরজার বাইরে দাড়িয়ে পল্লবী। আর্শিতা কে দেখা মাত্রই ছূটে গেল পল্লবী।


  • কি রে তোর ব্যাপারটা কি বলতো ?

  • কেনো?

  • ফোন টা দেখ। না হলেও পনেরো বার ফোন করেছি।

  • আরে খেতে বসেছিলাম।

  • না জানার ভান করিস না। আজ বলে নয়, লাস্ট 3 দিন ধরে তোকে ফোনে ট্রাই করছি।

  • হুম।

  • কি? কি হয়েছে তোর !

  • ঘরে আয়।

  • না কাকিমার সামনেই বল।

  • মা জানে। তুই আয়।

পল্লবীকে ঘরে নিয়ে গেলো আর্শিতা। খাটের পাশে রাখা পড়ার টেবিলের চেয়ার টেনে বসল পল্লবী। ছোট থেকেই এই বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত, তাই বাড়ির প্রতি কোণা তার খুবই পরিচিত।

সশব্দে চেয়ার টেনে বসে এক রাশ প্রশ্ন ছুড়ে দিল আর্শিতার দিকে।

  • কি হয়েছে তোর ? এখনো ওকে নিয়ে ভাবছিস? ও তো বলেছে তোকে সবটা। এখনো কিসের জন্য আকড়ে আছিস?

  • সন্ধ্যে বেলা একটু বেরোতে পারবি ?

  • মানে ?

  • ঘরের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছে।

  • ঠিকাছে। কিন্তূ আগে বল কি হয়েছে ?

  • বলবো। এখন না।

 

আর্শিতার কথা মতন দুজনে বেড়িয়ে পরে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সদ্য সে গাড়ি চালানো শিখেছে। এখনো হাত তার পাঁকেনি। কোথায় যাচ্ছে দুজনেই তা জানে না। ঘন্টা দুয়েক ড্রাইভ করার পরে, ঘড়ির কাটায় যখন প্রায় সন্ধ্যে পেড়িয়ে রাত নেমেছে। পল্লবী আর চুপ করে থাকতে পারলো না।

  • এই কোথায় যাচ্ছি বলতো? খেয়াল আছে কটা বাজে ? পৌনে নটা বাজে। বাড়ি ফিরতে হবে তো। আর তুই যে বলেছিলি যে সব বলবি! কই ? তুই তো কোনো উত্তরই দিচ্ছিস না আমার। কি রে?

পল্লবির কথা শেষ হতেই গাড়ি থামালো আর্শিতা। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে মাথা নিচু করে ধীর কন্ঠে উত্তর দিল।

  • এই জায়গাটা মনে আছে?

কাঁচ নামিয়ে বাইরের দিকে তাকায় পল্লবী। জনমানব শূন্য বেশ চওড়া তিন রাস্তার মোড় । রাধাচূড়া কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি যেন মাথা নত করে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। সময়টা ছিল বর্ষাকাল, ভিজে রাস্তাঘাট মাঝেসাঝে একটা দুটো গাড়ির হেডলাইটে চারিদিকটা কেমন যেন আলো-আঁধারি খেলছে।

পল্লবির চোখ ভিজে ওঠে, এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরতেই আর্শিতা আবার প্রশ্ন করে।

  • মনে পরলো ?

  • হ্যাঁ। কোনোদিন ও ভুলবো না।

  • এখানে এলি হটাৎ ?

গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো আর্শিতা। পল্লবীও আর্শিতার দেখা দেখি নেমে পরলো গাড়ি থেকে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল বেশ অনেক ক্ষণ ধরেই। এখন যেন বৃষ্টির তেজ খানিকটা বেড়েছে।

  • পল্লবী! মনে আছে এরকমই এক বৃষ্টির রাতে, ঠিক এই তিন রাস্তার মোড়টায়। আমরা মনে হয় পিকনিক থেকে ফিরছিলাম। আমাদের স্কুল বাস টা এখানেই খারাপ হয়েছিল আর আমরা টেনশণ না করে সবাই নেমে বৃষ্টির মধ্যে উল্লাসে মত্ত ছিলাম। সেদিন ই প্রথম দেখা রুহির সাথে । বৃষ্টিতে ও আটকে গেছিল। অটো পাচ্ছিল না। কিন্তু বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল। বৃষ্টির হাত থেকে কোনো রকমে মাথা বাঁচিয়ে রেখেছিল ছাতার আড়ালে। সেদিন নিয়মের বাইরে গিয়ে হেড স্যার কে রাজি করিয়ে ওকে নামিয়ে দিয়েছিলাম ওর বাড়িতে। সেই থেকেই বন্ধুত্ব আমাদের। আর কখন যে আমার অবাদ্ধ মন ওকে ভালোবেসে ফেলেছিল টের পাইনি। ভেবেছিলাম ও নিজেও আমাকে ভালোবেসেছিল।

বলতে বলতে হটাৎ থেমে গেল আর্শিতা। আর্শিতার চোখের কোনে জল দেখে এগিয়ে আসে পল্লবী।

  • প্লীজ কাঁদিস না

নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করে আর্শিতা।

  • আমার ভালবাসা কি ভুল ছিল বল ? যে বলেছিলো থেকে যাবে সবসময় কোনোদিন ও ছেড়ে যাবে না। সে যে আমার হাত ধরে কথা দিয়েছিলো। এক বিকেলে সিঁড়ি তে বসে যখন আমি ওকে হারানোর প্রচন্ড জন্ত্রণায় আমার চোখ

থেকে জল গড়িয়ে ছিল। সেদিন ও সেই ওই আমার চোখের জল মুছে ছিল। আমার আঙ্গুলের মাঝে আঙ্গুল রেখে বুঝিয়ে দিয়েছিল ওর আমার প্রতি ভালোবাসা। সবটাই কি তবে মিথ্যে ছিল? রোজ রাতে ওর সাথে কথা হতো জানিস! কথার শেষে ওকে বলতাম ওর বুকে মাথা রেখে ওর হৃদস্পন্দন শুনতে চাই। ও রাজি হতো। ওর কথায় ভালোবাসা অনুভব করতাম। তারপরে হটাৎ কি হলো ! ধীরে ধীরে মনে হতো আমার গুরুত্ব কমে আসছে। যেন আমি হারিয়ে যাচ্ছি প্রদীপের আলোর পিছনের অন্ধকারে। তখন খুব ভয় পেতাম, তাই একটু বেশিই আকড়ে রাখতে চাইতাম। চাইতে গিয়েই হয়তো ওর বিরক্তির কারণ হয়ে গেছিলাম। ও ঠিকই বলতো আমি দুঃখ বিলাসিতা করি। ঠিকই বলতো। কিন্তু যে কটা দিন ও ছিল ওর কারণে মন খারাপ হতো না। বরং পারিবারিক কারণেই কষ্ট পেতাম। সেই জন্ত্রণা লাঘব হতো ওর সাথে কথা বলে। কিন্তু একদিন ও বিরক্ত হতে শুরু করে। সেই ভুলটা আমার ছিল। অনেক অনেক কথা মনে পরছে জানিস। সেই সব আজ মিথ্যে। ও এতটা বদলে গেলো! তবে এক হাতে তালি বাজে না। ভুল আমার ও ছিলো অনেক। আমি ওর যোগ্য ছিলাম না। তাই ভগবান নিশ্চই আমার চেয়ে যোগ্য কাউকে ওর জীবনে পাঠাবেন। তাই আমাকে বেড় করে দিলেন। আফসোস হয় শুধু একটা কথা ভেবেই। যদি ওর যোগ্য হতে পারতাম। আসলে ওর জীবনে নিজের অস্তিত্ত্ব সৌভাগ্যের। কিন্তু আমার ভুল গুলো ও বুঝিয়ে আমাকে শুধরে নিতে পারত। আমি যে ওকে ছেড়ে থাকতে পারি না।

আর্শিতার কথা শেষ হতেই পল্লিবি এগিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে নেয় তাকে। অঝরে কেঁদে ফেলে আর্শিতা।

  • গাড়িতে বসবি চল, বৃষ্টি নেমেছে জ্বর আসবে।

  • ছার না আমাকে। সিমপ্যাথি দেখাতে আসিস না।

  • কি বলছিস তুই ? শোন তাকা আমার দিকে!

  • আমাকে একা ছেড়ে দে। চলে যা তুই। তুইও তো আমার নোস।

ইতিমধ্যে বৃষ্টি নেমেছে বেশ জোরে। দুজনেই কাক ভেজা হয়ে দাড়িয়ে রাস্তার ধারে। বৃষ্টির ফোঁটার সাথে কান্না মিশে ধুইয়ে দিচ্ছে জমানো অভিমান। আর দাড়াতে না পেরে রাস্তা তেই বসে পরে আর্শিতা। পল্লবীও তার পাশে বসে। আর্শিতা কে বুকে জড়িয়ে। আর্শিতাও অসহায় শিশুর মতন পল্লবীকে আকড়ে রেখেছে।

  • আর্শিতা ! চল এবার। বাড়ি চল। এইভাবে নিজেকে কষ্ট দিস না।

  • একজন চরিত্রহীন মানুষের ভালোথাকার অধিকার নেই রে পল্লবী।

  • আবার ভুল ভাল বলছিস? এবার মার খাবি তুই।

  • না ঠিক ই বলেছি।

  • কেন এসব বলছিস ?

  • কেনো ? ছাড় । চল

  • কোথায়?

  • বাড়ি ফিরতে হবে তো তোকে!

কথা শেষ করতেই কোনো রকমে উঠে দাড়ায় আর্শিতা। ছন্দহীন পায়ে এলোমেলো ভাবে গাড়ির দরজা খুলে বসতে যাবে এমন সময় পল্লবী আর্শিতা কে থামিয়ে বলে,

  • তুই না। আমি ড্রাইভ করছি। তুই পাশে বোস।

  • না আমিই ড্রাইভ করবো ।

বলে গাড়ির চাবি নিয়ে জোর করেই স্টেয়ারিং ধরে আর্শিতা।

রাত ও বেড়েছে বেশ। পল্লবী ঘড়ির কাটায় চোখ রেখে দেখে রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। ইতিমধ্যে আট থেকে দশ বার বাড়ি থেকে ফোন এসেছে দুজনের ফোনে। কেউই কথা বলার পরিস্থিতি তে নেই।

বৃষ্টির রাত তাই রাস্তা ঘাট ও বেশ শুনশান। স্পিড লিমিটের কাটা সত্তর- আশীর কাছা কাছি। আর্শিতার গাড়ি চালানোর হাত বেশ ভালোই তবে আজ যেন তার ছন্দ কেটে গেছে। কোনো রকমে ভিজে কাঁচ ভেদ করে অষ্পষ্ট চোখে আন্দাজ করে গড়িয়ে চলছে গাড়ির চাকা। রাস্তার ধারের ল্যাম্প পোস্টএর আলো গুলোও নেভানো।


হটাৎই চোখ ধাধানো আলোয় আর সশব্দে আর্শিতা র হাত স্টেয়ারিং থেকে সরে যেতেই সজোরে ধাক্কা দেয় সামনে থেকে আসা দশ চাকার মাল বোঝাই লড়ি তে। আর্শিতার দিকের দরজা লক না থাকায় ছিটকে বেরিয়ে পরে সে রাস্তায়। ড্যাস বোর্ডে শারীর  এলিয়ে পরে পল্লবির।

মিনিট খানেকের মধ্যেই রাস্তার লোক জড়ো হয়ে যায়। শুনশান রাস্তাটা কোলাহলে ভরে উঠলো। মিনিট দশেক পরে চোখ খুলে তাকায় আর্শিতা। কোনো রকমে উঠে দাড়িয়ে সে পল্লবি কে খুঁজতে থাকে এদিক ওদিক । এলো মেলো পায়ে এগিয়ে আসে সে গাড়ির দিকে। গাড়ির ড্যাস বোর্ড রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আর্শিতা এদিক ওদিক ছোটা ছুটি করে আশে পাশের লোক জন দের ডাকলেও কোনোরকম সাড়া পায় না সে। যেন তাকে কেউ দেখতেই পাচ্ছে না।

অসহায় ভাবে গাড়ির সামনে পল্লবির হাত শক্ত করে ধরে বসে পরে সে। অঝরে কেঁদে চলেছে। তবুও কেউ তার কান্নার শব্দ যেন শুনতে পারছে না।

হটাৎই একটা শীতল স্পর্শ সে অনুভব করে তার কাঁধের উপরে। আর্শিতা পেছনে ফিরে তাকাতেই তার কান্না থেমে যায়। এক নিমিষে তার চঞ্চল চোখ দুটো শান্ত হয়ে যায়। উঠে দাড়িয়ে কাঁপা ঠোঁটের মাঝ থেকে একটাই শব্দ বেরিয়ে আসে,

” পল্লবী! ”

  • হ্যাঁ ।

  • কিন্তু ? তুই !

পেছন ফিরে তাকাতেই সাড়া শরীরে শিহরণ বয়ে যায়।

স্নিগ্ধ হাসি ফুটে ওঠে পল্লবির ঠোঁটে। আর্শিতার হাত ধরে পল্লবী। পল্লবী কে অনুসরন করে এগিয়ে যায় আর্শিতা। কিছুটা এগিয়ে জেতে আঙ্গুলের ইশারায় তাকাতে বলে আর্শিতাকে।

পল্লবীর আঙ্গুলের ইশারা দেখিয়ে দেয়, রাস্তায় রক্তাক্ত শরীরে পরে রয়েছে আরেকটা নিথর দেহ। আর্শিতার শরীরে আবার শিহরণ বয়ে যায়। পল্লবির দিকে তাকিয়ে বলে,

  • আ-আ- আমি ?

  • হ্যাঁ।

বৃষ্টি রাস্তার উপরে দেহটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ,প্রাণহীন। চোখের কোনে লেগেথাকা জল টা তখনো জীবন্ত।

আবার পল্লবির দিকে তাকায় আর্শিতা। এবারে আর্শিতার ঠোঁটে অদ্ভুত শান্তির হাসি। পল্লবির চোখ ও স্থির।

আর্শিতার আঙ্গুলের ভাঁজে আঙ্গুল রাখে পল্লবী। বৃষ্টির তেজ তখন একটু কমেছে। দুজনে এগিয়ে চলেছে বৃষ্টি ভেজা পথ দিয়ে। পাশ দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চলে যেতে দুজনে পিছন ফিরে তাকায়। দুজনের রক্তাক্ত দেহ স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়। ভীড় ক্রমশ হাল্কা হয়।

আবারও শূন্য রাস্তা। আলো নেভানো অন্ধকারে দুজনে হেটে চলেছে।

  • আমার চরিত্রহীন মন তোকে ভালোবেসেছিল।

  • আমার আজ আর কোনো পিছুটান নেই ।

আর্শিতার আঙ্গুলের ভাঁজে যেন পল্লবির আঙ্গুল আরো শক্ত হলো। বৃষ্টি ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ওরাও হেটে চলেছে একসাথে। ওদের পথ চলা হয়তো সবে শুরু।

লেখাসুস্মিতা সাহা

 

1 COMMENT

  1. 💗💗💗💗💗 … খুবই সুন্দর লেখাটি …

    নর্মাল লাইফটা যে কবে ফিরে পাবো সেটাই বড়ো mystery 🙂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here