‘সম্পর্ক’ জিনিসটা অনেকটা সবুজের মত। অনেক জল পেলে সবুজও শ্যাওলা হয়ে যায়, আবার জল না পেলে শুকিয়ে হলুদ হয়ে যায়। সম্পর্কের নিজস্ব একটা বেড়া আছে। বেড়া টপকালেই হয় সেটা তিক্ত হয়, নয়তো প্রাণ হারায়। রমা আর প্রীতমের সবুজ দম্পত্যে আজ শুধুই শুকনো পাতা পড়ে। স্মৃতির উপর দিয়ে হাঁটাচলা করলে কোন সুবাস পাওয়া যায় না, শুধুই মচমচ শব্দ। অথচ তারা বেড়াটা পেরল কিভাবে? কেই বা বেড়া টানলো? আজ বিয়ের তিন বছর পর সব কোলাহলই থেমে গেছে। দু কামরা ফ্ল্যাটটার দুই ঘরে শুধু দুটো নিঃশ্বাস ছাড়া সব চুপ। ওরা একে অপরের সাথে কোন কথা বলে না। শুধু বাড়ির থেকে ফোন এলে ভালো থাকার নাটক করতে যতটা বলতে হয়, ওইটুকুই। প্রীতম তাও দু একবার চেষ্টা করেছিল। খাবার টেবিলে একসাথে বসবে বলে সে সময় ম্যানেজ করত। কিন্তু রমা ‘হু’ ‘হা’ ছাড়া কোন উত্তর দিত না।

তাই আজ দুজনেই একে অপরের উপর ব্যার্থ হয়ে শুধু অভিনয়টা চালিয়ে যায়। শেষবার যখন ঝগড়া হয়েছিল, তখন রমা বলেছিল, “আমাদের ভালবাসায় আর প্রান নেই প্রীতম”। আফসোস, কেও আর প্রান খোঁজার চেষ্টাটা করল না। প্রথম এক বছর ভাল কাটলেও, ধীরে ধীরে ক্ষয় ধরা শুরু হয়। আচ্ছা, বেড়াটা কবে টপকেছে ওরা? যেদিন প্রীতম মদ খেয়ে বাড়ি এসে প্রোমোশন না পাওয়ার ব্যার্থতা বউয়ের উপর দেখিয়েছিল সেদিন ? না যেদিন রমা প্রীতমের সাথে আলোচনা না করেই নাইট শিফট শুরু করল সেদিন? নাকি যেদিন প্রীতম তার টিম লিডার প্রেরনার ফোনগুলো আড়ালে ধরতে শুরু করল সেদিন? প্রশ্নের উত্তর ওরা কেও খোঁজে না। কারন প্রানহীন খোলস হয়ে অভিনয় করাটাও একটা নেশা।
কিন্তু গ্রীষ্মের পরও একদিন তো বর্ষা আসে।




হঠাৎ ঝড়ের মত আবার শুকনো পাতাও সবুজ ফিরে পায়। তেমনই হয়ত ওঁদের সম্পর্কটা। কাজের চাপ এসে যাওয়ায় প্রীতমকে সেই সকালে বেড়িয়ে মাঝ রাতে বাড়ি ঢুকতে হচ্ছে কয়দিন। নিজের সাধের গাছটার আর পরিচর্যা করা হয়ে উঠছে না। এমনকি রবিবারেও সে ছুটেছে অফিসে। রমা চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে ডালিয়া গাছের সামনে দাড়ায়। শুকিয়ে মরতে বসেছে ওটা। পাশে রাখা বোতল থেকে টবে কিছুটা জল ঢেলে আবার চায়ে মন দেয়। পরের দিনও একই রুটিন। আর তারপরের দিনও। শুকিয়ে পরা গাছটা হঠাৎ লাবণ্য ফিরে পেতে থাকে। এক সপ্তাহ পর রমা খেয়াল করে একটা ছোট্ট ফুলের কুঁড়ি। আচ্ছা, এই গাছে কি রঙের ফুল হয়? সে তো কখনো খেয়াল করে নি। অথচ এই গাছ এখানে এক বছর ধরে আছে, আর তাতে ফুলও হয়েছে আগে।

সে কি তাহলে আশেপাশের সব কিছুর কাছেই নির্লিপ্ত ছিল? এই গাছ তো কোন দোষ করেনি, তাহলে কেন এটাকেও মন থেকে দুরে রেখেছিল? ঐ দরজা খোলার আওয়াজ আসেছে। পিছন ফিরে দেখার আগেই বুঝল প্রীতম ফিরেছে। সে এখনও কিভাবে প্রীতমের উপস্থিতি বুঝতে পারে? তবে কি এখনও সব ডাল শুকিয়ে যায় নি? রমা দেখে প্রীতম জুতো খুলেই ফ্রিজ থেকে খাবার নিয়ে বসেছে। ছেলেটা সেই ঠান্ডা খাবার খাবে। রমা গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতাগুলো তুলে ডাস্টবিনে ফেলে। আজ তার ইচ্ছা করছে প্রীতমকে গরম কফি বানিয়ে দিতে। আর হ্যাঁ, ওকে বলতে হবে গাছটার জন্য নতুন টব আনতে। ওতে নতুন প্রান আসছে যে।

– রজত সাহা©

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here