ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এতটা শীত আগেরবার ছিল না। এবারে ঠান্ডাটা একটু বেশি যেন। তবে একদিকে ভালো। প্রতাপের ঠাণ্ডা ভালো লাগে। ছোটবেলায় ফরিদাবাদ শহরটা ঠান্ডায় বেশ সুন্দরী হয়ে উঠত। কুয়াশা ঘেরা সকালে সাইকেল চড়ে স্কুলে যেত সে। মায়ের পড়িয়ে দেওয়া হনুমান টুপিটা বাড়ির বাইরে এসেই খুলে দিত। তারপর চাদরটা জড়িয়ে কুয়াশা কে চিড়ে হন হন করে সাইকেলটা টেনে নিয়ে যেত। আহা:, তখন ঠাণ্ডা বাতাস যেভাবে শরীরটাকে জড়িয়ে ধরত, কেও আর সেভাবে প্রতাপকে আপন করে নিল না। কথাটা ভেবেই হেসে বাসের জানালাটা খোলে প্রতাপ।

কেও ধরেনি বললে ভুল হবে। নাজমা ধরতে চায়। খুব শক্ত করেই জড়িয়ে ধরতে চায় প্ৰতাপকে। কিন্তু উপায় নেই। দূর থেকেই মেয়েটাকে দেখে মন ভুলিয়ে নিতে হয়। ল কলেজের পাশে একটা ঝুপড়ি তে থাকে ওরা। সেবার ২০ দিনের জন্য ল কলেজের পাশেই আস্তানা গেড়েছিল প্রতাপরা। তখনই নাজমা কে প্রথম দেখা। মেয়েটা প্রতিদিন সকালে ফুল বিক্রি করতে যেত বাজারে। যাওয়ার পথে ওর চোখ খুঁজে বেড়াত প্রতাপকে। একদম শেষ দিনে ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে একটা চিঠি লিখে নাজমা ওর মনের কথা প্রতাপ কে জানিয়েছিল। একটা বাচ্চা ছেলে ভয়ে ভয়ে সেদিন এগিয়ে এসেছিল প্রতাপের দিকে। প্রতাপ চিঠির পিছনে লিখে দিয়েছিল, ” ফিরবো আমি ১৪ তারিখ, ২ মাস পর। তোমার শহরের উপর দিয়েই যাব। অপেক্ষা করো। সেদিন তোমায় বড় করে একটা চিঠিও লিখে দেব”। কথাটা ভেবেই বুক পকেটে একবার হাত দেয় প্রতাপ। চিঠিটা রাখা আছে। আজ কি নাজমা থাকবে , নাকি সেই বাচ্চা ছেলেটা এসেই চিঠিটা নিয়ে যাবে? কি ছিল নাজমার চিঠিতে? ভাঙ্গা ভাঙ্গা নিজের মনের কথার পর, একটা ইচ্ছে। সে চায় প্রতাপ কে নিকাহ করতে। তার বাড়ির লোক, সমাজ মানবে না। কিন্তু সে সব ছেড়ে যেতে পারে। যদি প্রতাপ মন থেকে তাকে গ্রহণ করে তো।
নাজমার কোন ছবি নেই প্রতাপের কাছে। জানেনা নাজমার গলার স্বর কেমন। শুধু জানে নাজমা অনেকটা ওই ঠাণ্ডা বাতাস গুলোর মতন। যাদের কাছে প্রতাপ নিজেকে মেলে ধরতে পারত। যাদের অধিকার ছিল, প্রতাপ কে জড়িয়ে ধরার।

শহরে বাস টা এতক্ষণে হয়ত ঢুকে গেছে। সে খোঁজ পেয়েছে। নাজমা আজ ভাইকে না নিয়ে একাই এসে দাঁড়িয়েছে “লেথপরা মেডিকেল স্টোরের” সামনে। সামনের রাস্তাটা ফাঁকা। খুব একটা গাড়ি চলছেনা আজ। প্রতাপ আজ তার জন্য যখন বাস থেকে নেমে আসবে, সে কি লজ্জা পাবে? আচ্ছা প্রতাপ নেমে এসে কি বলবে তাকে? নাজমা কি প্রথমদিন প্রতাপ কে ছুয়ে দেখবে? আচ্ছা প্রতাপ যদি, আজই তাকে নিয়ে চলে যেতে চাই? কারন প্রতাপ যতই তার মনে বাসা বাধুক, এই দেশ প্রতাপকে মনে নেবে না। সে ভিনদেশী, ভিনজাতের। যাই হোক, প্রতাপের জন্য সে লড়বে। সব কিছুর সাথে লড়বে। একটা গোলাপের ঝাঁকা এনেছে নাজমা। আসিফাদের বাড়িতে সিনেমাতে দেখেছে , এই ১৪ই ফেব্রুয়ারি নাকি যারা প্রেম করে, তারা একে অপরকে গোলাপ দেয়। আগেরবার তো নাজমার তোলা সব গোলাপ শ্রীনগরে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এবারে সে সব গোলাপ বাগান থেকে তুলে নিয়ে এসেছে প্রতাপের জন্য। ওই যে বাসটা দূরে দেখা যাচ্ছে। নাজমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, খুশিতে, আর লজ্জায়।

কাছাকাছি এসে গেছে বুঝেই শিট ছেড়ে ওঠে প্রতাপ। নাজমা কোথাও একটা দাড়িয়ে আছে। ওকে দেখলেই বাসটা থামাবে প্রতাপ। সে ড্রাইভারের পাশে এসে চারিদিকে দেখতে থাকে। ওই দূরে একটা মেয়ে গোলাপ হতে দাড়িয়ে। ওটাই কি নাজমা? ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে প্রতাপের।

হঠাৎ একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে। খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে বাসটা র দিকে। কোনরকম এদিক ওদিক না করে সজোরে ধাক্কা মারল বাস টাকে। তীব্র বিস্ফোরণের আওয়াজ। আর দাউ দাউ আগুন। হঠাৎ ঠাণ্ডা হওয়াটা বেশ গরম হয়ে উঠলো। জ্বলছে, সব পুড়ছে।

কিছু সময় পর –

চারিদিকে লাশ ছড়িয়ে আছে। আর তারসাথে আগুন। আর্মিরা ঘিরে দিয়েছে জায়গাটা। প্রতিটা লাশের গায়ে মিলিটারি পোশাক। ঘটনাস্থলের একটু দূরে রাস্তায় পরে কিছু গোলাপ। যেগুলোকে মাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে সবাই অনবরত। অনেক দূরে দাড়িয়ে নাজমা। তার চোখ খুঁজছে প্রতাপ কে। কাছে যাওয়ার অধিকার তার নেই। একে বিস্ফোরণ , তার উপর সে কাশ্মীরি। আর্মিরা অনেকদূরে সরিয়ে দিয়েছে তাকে। একটার পর একটা লাশ তুলছে, আর নাজমা ভাবছে এইটা বোধহয় প্রতাপ। কিন্তু না। বুঝতে পারছে না। কি ভাবে বুঝবে সে? সবাই যে পুড়ে ঝলসে গেছে।

প্রতাপের লাশটা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ইউনিফর্ম থেকে নেমপ্লেট টা খসে পড়ে। প্রতাপচন্দ্র সিং। নামটা পড়ে রইল মাটিতে। গোলাপের সাথে, হয়তো ওটাকেও কেও মাড়িয়ে দিয়ে যাবে একটু পর।

 

( প্রথমবার ফেসবুকে কিছু একটা লিখলাম,যেটাকে গল্প বলা চলে। ভালো লাগলে জানবেন। না ভালো লাগলেও। শুধু শেয়ার করার সময় নামটা দেবেন। আর ছবিটা সংগৃহীত। )

🙂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here