রাত পোহালেই ভোরের ফ্লাইটে কলকাতার জন্য রওনা দিতে হবে নিখিলেশ বাবুকে। কর্ম সুত্রে জীবনের প্রায় বছর পচিশেক কেটেছে শিকাগোয়। প্রথমটায় ভিন দেশে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হলেও ব্যস্ততার জাঁতা কলে চাপা পড়ায় নিজেকে সময় দেওয়ার সুযোগটাও হয়ে ওঠেনি তার। যদিও কর্ম জীবনের এই ব্যস্ততা নিয়ে তার কোনো কালেই কোনো অভিযোগ ছিল না। অপরিচিত জায়গা, অপরিচিত মুখ , নতুন ব্যস্ততা সবকিছু কে নিয়ে তার জীবনের একটা বড়ো অধ্যায়ের আজ সমাপ্তি। বয়স প্রায় পঞ্চান্নর কাছাকাছি ঠেকেছে তার। প্রায় পচিশ বছর পরে সে ফিরবে পরিচিতদের ভিড়ে। 

একদিকে পরিচিতদের ভিড়ে না থাকাই ভালো, কারণ পরিচিত মুখ, পরিচিত স্থান মাঝে মাঝে এমন কিছু পরিচিত মুহুর্ত মনে করিয়ে দেয় যা এক সময় খুব প্রিয় হলেও সময়ের বিশ্বাসঘাতকতায় আজ ভীষণই অপ্রিয়। সেই অপ্রিয়তা কে না ব্যস্ততায় মোড়া যায় আর না ভুলে যাওয়া যায়। অপরিচিত দের ভিড়ে থাকলেও যে মনে পড়ে না তা নয়। মনে পরে তবে সেটা দিনের আলোয় না, রাতের অন্ধকারে  নিসঙ্গ নিস্তব্ধতায়। 

রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি, স্যুটকেস গুছিয়ে ড্রয়িং রুমের আলো নিভিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসেছেন নিখিলেশ বাবু। পঁচিশটা বছর শিকাগোয় যে ফ্ল্যাটে মাথা গুঁজে ছিলেন, সেই ফ্ল্যাটের প্রতি কোনায় আরো একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি। কলকাতার মতন সেখানে রাতে নিস্তব্ধতা নামে না, জীবনের এতো গুলো বছর ব্যস্ততার যান্ত্রিকতায় থাকার পর আজ আর তার বাইরের ব্যাস্ততার কোলাহল ভালো লাগছিলো না। সোফা থেকে উঠে রাস্তার দিকের ব্যালকনির কাঁচ বন্ধ করে পর্দা টেনে আবার এসে বসেন নিখিলেশ বাবু। বেশ অনেক বছর পর আজ সে পুরোনো নিস্তব্ধতা অনুভব করছে। প্রতি রাতেই অনেক দেরী করে ফ্ল্যাটে ফেরেন তিনি। ঘুমের ওষুধে ঘুমিয়েও পড়েন। তাই এই রকম নিস্তব্ধতা তিনি অনেক কালই অনুভব করেননি। হয়তো নিজে থেকেই করতে চাননি। আজ তিনি ঘুমের ওষুধ খাননি। ঘড়ির কাটা ছুটেই চলেছে, দেড়টা বাজতে মিনিট খানেক বাকি। বেশ কিছুক্ষণ পুরোনো নিস্তব্ধতা অনুভব করার পর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। পঁচিশ বছর আগে এই নিস্তব্ধতার থেকেই তো পালিয়ে এসেছিলেন তিনি এই অজানা শহরে, অচেনা দের ভিড়ে। টিভির নিচে টেবিলে রাখা ফোটো ফ্রেম তুলে নিলেন নিখিলেশ বাবু। ব্যালকনির কাঁচ খুলে , মেঝেতে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন তিনি। বুকে আকড়ে রেখেছেন সেই ফোটোফ্রেমটা। অচেনা শহরে, অচেনাদের ভিড়ে কেবল তিনি আর এই ফটোফ্রেমটা খুব চেনা। ফোটোফ্রেমে বন্দি একটা মুহূর্তের স্মৃতি আজও তার চোখে স্পষ্ট। এতটুকু ধুলো জমেনি তাতে। কলেজের শারদীয়া অনুস্ঠানের রিহার্সালে অনুরাধার গানে মগ্ন হয়ে থাকার দৃশ্য তিনি লুকিয়ে ফ্রেম বন্দি করেছিলেন। সেই ছবিই আজ নিখিলেশ বাবুর চোখের কোণ ভিজিয়ে দিচ্ছে। খুব প্রিয় কিছু হারিয়ে যাওয়ার পর ,মনে পরলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সেই ছবি বুকে আগলে রেখে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন নিখিলেশ বাবু। চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে তার। এতো বছর যেন চোখের জল শুকিয়ে গেছিলো তার। শরীরের বয়সটা প্রায় পঞ্চান্ন হলেও মনের বয়সটা তার এখনো তিরিশেই আটকে। ভিজে চোখেই কখন যেন ঘন্টা খানেকের জন্যেই ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি। ফোনের অল্যার্মে ঘুম ভাঙতে তড়িঘড়ি উঠে ফটো ফ্রেমে ঘুম ঘুম চোখে হাত বুলিয়ে,স্নান সেড়ে রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়ল এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশে। 

পঁচিশ বছরের ব্যস্ততার যান্ত্রিকতা অধ্যায়ের ইতি টেনে শিকাগোর আকাশের বুকে তুলোর মতো সাজানো মেঘেদের বিদায় জানিয়ে উড়ে গেলো প্লেন। জানলা দিয়ে নিচে তাকিয়ে  শহরটাকে শেষ বারের মতন দেখে নিলেন তিনি। এইভাবেই একদিন কলকাতার আকাশের বুক চিড়ে ভাঙা মন নিয়ে চলে এসেছিলেন এই শহরে। কম করে কুড়ি ঘণ্টার জার্নি শেষে আবার কলকাতার বুকে পা রাখলেন। বছর পঁচিশ পরে কলকাতার বাতাসে শ্বাস নিলেন নিখিলেশ বাবু। এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে ক্যাব বুক করেলেন তিনি। এতো বছর পরে কলকাতার দৃশ্যে বেশ খানিকটা বদল লখ্য করলেন। ম্লান হাসি এঁকে পকেট থেকে সিগারেট বেড় করে ঠোঁটে রাখতেই ক্যাব এসে হাজির। অগত্যা সিগারেটে আগুন দেওয়ার আগেই পুনরায় প্যাকেটে পুরে নিতে হলো। ক্যাবে উঠে রওনা দিলেন। আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতেই উঠবেন তিনি।প্রায় পঁচিশ বছর পরে আজ সে আবার কলকাতার রাস্তায়। টিনের বাক্স ছুটে চলেছে অনবরত। গড়িয়া হাটের বাসস্ট্যান্ড চোখে পরতেই ফ্ল্যাশব্যাকে চলে গেলেন তিনি। কিছু পুরোনো মুহূর্তের ঝলক তার চোখের সামনে স্পষ্ট হলো। কলেজে পড়ার সময় তার আর অনুরাধার বেশির ভাগ সময়টাই কেটেছে এই গড়িয়া হাট চত্বরে। ভালোলাগার স্মৃতি গুলো আজ কেবল চোখের কোণে লেগে থাকা জলবিন্দু মাত্র। সময় পেড়িয়েছে অনেকটা। হারানো মুহুর্ত ফিরে পাওয়া আর কখনই সম্ভব না। সিগারেটে খুব মন টানলেও এসী ক্যাবে তা মানা। তাই সিগারেটটা এবার ও পকেটেই জায়গা পেলো। অবশেষে নিখিলেশ বাবু নিজের বাড়িতে পা রাখলেন। ক্যাব থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির গেট খুলতেই মাঝ বয়সি একটা ছেলে ছুটে এসে তাঁকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন। তিনিও সউত্সাহে হাসতে হাসতে ভিতরে ঢুকলেন। এতো বছর পরে তিনি ফিরেছেন নিজের বাড়িতে। পরিচিত দের ভিড়ে। এই বাড়ির গন্ধ ভীষণ প্রিয় তার। এই গন্ধ তিনি পঁচিশ বছর পাননি। বাড়ির প্রতিটা দেওয়াল তিনি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিলেন। এই সময় কেউ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে,

– বাপী! 

– অনু ! 

– কখন এলে তুমি ? 

– এই তো রে। এক্ষুনি এলাম। 

বাবা কে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরল অনু। 

– কেমন আছো বাপী?

– ভালোই। শুধু পুরোনো স্মৃতি একটু মনে করছিলাম আর কি। 

– তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও বাপী। তারপর ছাদে গল্প করবো।

– বেশ বেশ। 

– আমি তোমার পঞ্জাবি আর পায়জামা খাটে রেখে এসেছি। 

– এতো বড়ো কবে হলি রে ? 

অনু হেসে বাবাকে টাওয়াল হাতে ধরিয়ে ফ্রেশ হতে পাঠিয়ে দিল। সকাল পেড়িয়ে দুপুর গড়িয়েছে। অনু আর বাড়ির রধুনী দুজনে রান্নাঘরে রান্নায় ব্যস্ত। এতদিন পরে তার বাবা বাড়ি ফিরেছে তাই আজ সে নিজের হাতেই রান্না করবে বাপীর জন্য। 

দুপুরের খাবার টেবিলে নিখিলেশ বাবু আর অনু দুজনে বেশ জমিয়ে গল্প করলেন। নিখিলেশবাবু যে এবার থেকে কলকাতাতেই থাকবেন সেই খবরে খুব খুশি হয়েছে অনু। দুপুরের খাওয়া সেড়ে ঘন্টা খানেকের জন্য বিশ্রাম করবে বলে ঘরে গেলেন নিখিলেশ বাবু। বই এর তাকে তার জমানো বইয়ের সম্ভার থেকে একটা বই বেড় করে খাটে বসে পড়তে পড়তে পুরোনো কিছু মুহুর্ত মনে পরে যেতে বই পাশে রেখে, চোখ থেকে চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন। রেডিয়ো তে গান চালিয়ে ,ঘরের থেকে বাইরের লম্বা বারান্দায় বেড়িয়ে এসে ,পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বেড় করে ঠোঁটে রেখে আগুন ধরাতে যাবেন তখনই পাশ থেকে খুব চেনা একটা শব্দে হাত কেঁপে উঠলো নিখিলেশ বাবুর। 

” কথায় কথায় সিগারেটের অভ্যেসটা এখনো ছাড়তে পারলে না? ” 

পাশ ফিরে তার দিকে তাকাতেই দৃষ্টি একেবারে স্থির হয়ে গেল নিখিলেশ বাবুর। সম্বিতের মতো তাকিয়ে দুজন দুজনের চোখে।নিখিলেশ বাবুর ঠোঁট কেঁপে উঠলো একটা খুব পরিচিত নামে। 

” অনুরাধা! ” 

নিখিলেশ বাবু এখনো নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছেন না। দুজন এগিয়ে এলেন দুজনের দিকে। সিগারেটটা এবার ও প্যাকেটে পুরে নিলেন তিনি। অনুরাধা দেবীর চোখ থেকে চোখ সরাতে পারলেন না নিখিলেশ বাবু, অনুরাধা দেবীও ম্লান হাসি ঠোঁটে এঁকে তাকিয়ে এক ভাবে। বছর পঁচিশ পরে খুব প্রিয়, খুব চেনা মানুষ আজ আবার তার সামনে। কলকাতা ছাড়ার কারণ আজ আবার তার সামনে এসে দাড়িয়েছে। নিখিলেশ বাবু বুঝতে পারলেন অনুরাধার মুখে তারই মতন বয়সের ছাপ পড়েছে। চেহারার ও একটু পরিবর্তন হয়েছে। টানা টানা চোখ দুটো, যেই চোখের প্রেমেই পরেছিলেন তিনি, সেই চোখ আজ কাঁচের আড়ালে। আরো একটা জিনিস লখ্য করলেন তিনি, অনুরাধা দেবীর মুখে একরকম বিষণ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। 

নিখিলেশ বাবুর সময় জ্ঞান হওয়ায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। নিখিলেশ বাবুর চোখের চঞ্চলতা দেখে অনুরাধা দেবীও নিজের আবেগ বশে আনলেন। 

– অনু ! 

– চিনতে পারলে ? 

– হ্যাঁ। ওই চোখ দুটো আজও যে একই। 

– কেমন আছো?

( একটু হাসলেন নিখিলেশ বাবু )

– বললে না ! 

মাথা নিচু করেন নিখিলেশ বাবু। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ার আগেই সামলে নেন নিজেকে। মাথা তুলে আবার তাকিয়ে থাকে পঁচিশ বছর আগের ভালোবাসার মানুষটির দিকে। জোর করে ঠোঁটে হাসির রেখা এঁকে বলেন,

– আড়ালে থেকে নিজেকে লুকিয়ে যেভাবে থাকা যায়। 

– হেয়ালি করা আজ ও কমাওনি। 

– আমার সব হেয়ালির উত্তর তুমিই কেবল বুঝতে। আজও বুঝে নাও।

– চোখ লুকিয়ে ঠোঁটে হাসি এঁকে হেয়ালির উত্তর টা বদলাতে পারবে না নিখিল। 

– নিজের কাছেই নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি পঁচিশটা বছর। 

– না রাখলেই পারতে। 

– তোমারও চোখে চশমা হয়েছে দেখছি। 

– হ্যাঁ। স্টুডেন্ট দের খাতা দেখতে দেখতে এটাই স্বাভাবিক। 

নিখিলেশ বাবুর ঠোঁটে হটাৎ হাসি দেখে অনুরাধা দেবী প্রশ্ন করলেন,

– হটাৎ হাসলে ? 

– যেই কারণে পালিয়ে গেছিলাম, আজ এতো বছর পর ফিরে এসে একই কারণে থেকে যেতে ইচ্ছে করছে। 

– আবার চলে যেতে?

– না। তবে যাওয়ার কথা থাকলেও হয়তো, আর পারতাম না পালিয়ে যেতে। 

– হুম। 

– আমার যাওয়ার খবর তুমি পেয়েছিলে?

– হ্যাঁ। 

– কেমন আছো অনু? 

– ভেঙে যাওয়া বাঁশি সুর তুলতে চাইলে যেমনটা হয়। 

– তোমার জীবনের সুর ফেরাতেই তো সেদিন। 

– থাক। 

– আমাদের প্রথম দেখা মনে আছে তোমার? 

– হুম। 

তুমি তখন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার। আর অমি ফার্স্ট ইয়ারে। 

অনুরাধা দেবীর কথা শুনতে শুনতে নিখিলেশ বাবু হারিয়ে গেলেন বছর তিরিশ আগের এক বিকেলে। 

পুজো পুজো গন্ধ বাতাসে। কলেজেও তার আমেজ বেশ জোরালো। দলে দলে সবাই শারদীয়ার উত্সবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ফোর্থ ক্লাস শেষ হতেই নিখিলেশ আর তার পাঁচ বন্ধু এসে হাজির ফার্স্ট ইয়ারের রুমে গানের জন্য স্টুডেন্ট খুঁজতে। সবাই প্রায় ঝপিয়ে পড়েছে লিস্টে নাম লেখানোর জন্য। এমন সময় ভীড় থেকে একজনের স্বর ভেসে আসতেই থমকে গেলো নিখিলেশ। সবাই কে থামাতে মেয়েটি টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো। নিখিলেশের চোখ আটকে গেল তার চোখে।

– আমিও গান করবো। 

অনির্বান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, নিখিলেশ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

– হ্যাঁ! তোমার নামটা বলো। 

– অনুরাধা। 

– আচ্ছা। 

নাম লেখার পর মেয়েটির দিকে তাকাতেই সে আবার ভিড়ে হারিয়ে গেল। নাম লেখার ভার অনির্বান কে দিয়ে সে আবার ওই দুটো চোখের খোঁজে ভীড় ঠেলে বেড়িয়ে এলো। কিন্তু সেদিন আর খুঁজে পেল না তাকে। সেদিনের তিন দিন পরে রিহার্সালের দিন। 

সকালে কলেজ এসেই সবাই রিহার্সাল রুমে হাজির। নিখিলেশ ও দরজার দিকে তাকিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তার অপেক্ষার অবসান হলো। খোলা চুল, হাল্কা কাজল চোখে এঁকে চওড়া হাসি ঠোঁটে এঁকে সে রুমে ঢুকল। অনুরাধার বেঞ্চের ঠিক পাশের বেঞ্চে জায়গা করে নিল নিখিলেশ। সেদিন তার অন্য কারোর কোনো কথা কানে পৌছাচ্ছিল না। অনুরাধার সব কথাতেই যেন তার ভালো লাগছিল। নিখিলেশের ভাগ্য ও ছিল সেদিন ভালো। ডুয়েট গানে সিলেক্ট করা হলো নিখিলেশ আর অনুরাধা কে। সেদিন থেকেই দুজনের বন্ধুত্বের শুরু। 

একসাথে স্টেজে গান করার কথা মনে পড়ায় নিখিলেশ বাবুর চোখে মুখে একটা ভালোলাগার ছাপ লক্ষ করলো অনুরাধা দেবী। 

– কোণ গান টা যেন ছিল? 

(নিখিলেশ বাবু আনমনে হয়ে উত্তর দিলেন, )

– তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা। 

(গানটার নাম বলতেই নিখিলেশ বাবু চমকে উঠলেন, )

– তুমি জানলে কি করে ? 

– তোমায় আমায় মিলে এমনই বহে ধারা। 

– মানে ? 

– কিছু না। 

– অনু? 

– বলো! 

– আজ এতো দিন পরে কথা বলছো। অচেনা মনে হচ্ছে না আমায় ? 

– এতদিন পরে তো না। আমি তো রোজই 

( কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন অনুরাধা দেবী।)

– কি? 

– কিছু না। 

– কল্পনায় আমার সাথে কথা বলা আর আজ এতো বছর পরে এই ভাবে দেখা হওয়া! এক অনুভুতি? 

– অনুভুতির প্রসঙ্গ না হয় থাক। তবে হ্যাঁ একটু আলাদা কারণ যা কল্পনার তুমি কে বলা যায় তা বাস্তবের তুমি কে বলা যায় না। 

– কেন ? 

– কারণ! অনেক দেরী হয়ে গেছে। ভাঙা গড়া অধ্যয় ও শেষের পথে। এখন আর নতুন করে নতুন অধ্যয় শুরু করা সম্ভব না। আর। 

– আর? 

– তুমিও তো তোমার নতুন জীবনে ভালো আছো। 

– আজ ও বুঝলে না। 

– কি? 

– কিছু না। 

( মনে মনে নিখিলেশ বাবু বলেন,” তোমায় ছাড়া আমি খুব অসহায় অনু।”) 

– তোমায় ছাড়া আমি যে খুব অসহায় নিখিল। 

( নিখিলেশ বাবু এক ভাবে তাকিয়ে থাকে অনুরাধা দেবীর দিকে ।) 

– তাহলে সেদিন চলে গেলে কেনো ? 

– কি করতাম ? বাবার কথা না করতে পারিনি। 

– আর আমি? একবার ও ভাবলে না। 

– ভুল করেছি নিখিল। 

– থাক। পুরোনো কথা মনে না করাই ভালো।

– হুম। 

– বিয়ে করোনি? 

– না। মন তো আজ ও তিরিশ বছর আগের সেই নিখিলের কাছে বন্দি। 

– আবার দেখা হবে, ভবিনি। 

– আমিও। কিন্তু আমি তোমায় এখানে দেখে সত্যি বেশ অবাক হয়েছি। 

অনুরাধা দেবীর কথার উত্তর দিতে যাবেন নিখিলেশ বাবু এমন সময় নিখিলেশ বাবুর মেয়ে এসে হাজির। অনুরাধা দেবীকে ম্যাম বলে সম্বোধন করতে বেশ অবাক হয়েছিলেন নিখিলেশ বাবু। 

– বাপী!   আমার কলেজের ম্যাম। আসলে আমি আসতে বলেছিলাম তুমি আসবে বলে। তোমার লেখা পড়ে ম্যাম তোমার সাথে দেখা করবেণ বলেছিলেন। 

নিখিলেশ বাবুকে বাপী বলে ডাকায় অনুরাধা দেবীর চোখ ভিজে উঠলো হটাৎ। নিখিলেশ বাবু বুঝতে পেরে,

– অনু ! সব হারিয়ে আবার নতুন কিছু গড়ার মতো সামর্থ্য ছিল না সেদিন। কিন্তু একাকিত্ব ও সহ্য হচ্ছিল না তাই ওকে অ্যাডাপ্ট করলাম। আমার সাথে শিকাগোতেই ছিল বছর খানেক হলো কলকাতায় এসেছে। 

অনু বেশ অবাক হলো এটা জেনে যে তার কলেজের ম্যাম আর তার বাবা পুর্ব পরিচিত। 

– অনু! তুই একটু চা করে আন তো। 

– আচ্ছা বাপী। 

নিখিলেশ বাবুর মেয়ে চলে যাওয়ার পর অনুরাধা দেবীর হাতের উপর আলতো স্পর্শে হাত রাখেন নিখিলেশ বাবু। চেনা স্পর্শে এতো বছরের জমানো আবেগ যেন একসাথে মিলিত হয়ে চোখের কোনে জমছে। 

– অনুরাধার কাছে লেখাগুলো পড়ে কেন জানিনা শুধু  তোমার কথাই মনে পরেছে

– আমাদের সম্পর্ক টা ভেঙে যাওয়ার পরে বাড়িতে চাপ আসে বিয়ে করার আমি রাজি হই নি। বছর খানেক পর অনুরাধা কে অ্যাডাপ্ট করি। তারপর চেনা শহর ছেড়ে অচেনা শহরে ঠিকানা খুজি। কিন্তু মনের ঠিকানা তোমার নামেই করে রেখেছি আজ ও। 

– অনুরাধা ? 

– ভীষণ প্রিয় নাম আমার। 

– তুমি অচেনাদের ভিড়ে মিশে গেলেও আমি এই চেনা শহরের বুকেই তোমায় খুঁজেছি রোজ। 

– আজ তোমাকে দেওয়ার মতো কিছু নেই আমার। শুধু! 

– শুধু এই হাতটা ছেড়ো না আর অনু। 

দুজন দুজনের চোখে স্থির। আবেগ ছড়িয়েছে চোখের কোণে। ভালোবাসার ভাষাহীন প্রতিজ্ঞায় আবার নতুন আধ্যায়ের শুরু।

By : Sushmita Saha

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here