গড়িয়াহাট ব্রীজের নীচেই চলে বিকাশ ও তাঁর পরিবারের জীবন সংগ্রাম। বেঁচে থাকার তাগিদে কিশোর বয়সেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে রোজগারের ভার। গড়িয়াহাট ব্রীজ চত্ত্বরে ধূপকাঠি বিক্রি করেই দিন কাটে বিকাশ ও তাঁর বোনের। এসবের পাশাপাশিই চলে পড়াশোনাও। সমাজে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন ওরাও দেখে, সেই স্বপ্নের জোরেই সমস্ত বাঁধা বিপত্তি সত্বেও গড়িয়াহাট সংহতি স্কুলে চলে পড়াশোনার চেষ্টা, বেড়ে ওঠার চেষ্টা। কিন্তু এর মধ্যেই শ্রেণীবৈষম্যের করাঘাত নেমে এল বিকাশের জীবনে। কিশোর বয়েসেই হতে হলো হেনস্তার শিকার।

গত ১১ই জানুয়ারি রোজকার মতোই গড়িয়াহাট মোড়ে দূপকাঠি বিক্রি করছিল বছর বারোর বিকাশ সাহা ও তাঁর সাত বছরের বোন লাভলী সাহা। বিকাশের বোন একটি গাড়ির কাঁচে টোকা মেরে ধূপকাঠি কেনার আবেদন করে। উত্তরে গাড়ির ভেতর থেকে এক মহিলা লাভলীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। এখানেই শেষ নয়, বিকাশের সঙ্গেও ওই মহিলা বচসায় জড়িয়ে পড়েন। বিকাশের বয়ান থেকে জানা গেছে তার বোন গাড়িতে টোকা মেরে ধূপকাঠি কেনার অনুরোধ করলে ওই মহিলা ভেতর থেকে বলেন, “টোকা মারছিস কোন সাহসে, জুতোর বারি খেয়েছিস কোনোদিন?” এমতাবস্থায় লাভলী তার দাদকে ডেকে আলনে ওই মহিলা বিকাশের সাথেও দুর্ব্যবহার করেন। বচসা বাড়তে থাকলে হঠাৎ সেই মহিলা গাড়ি থেকে নেমে নিজের জুতো খুলে বিকাশের দুই গালে ও হাতে সজোরে মারতে থাকেন। বিকাশ বলেছে “আমি আমার বোন কে একটা খারাপ কথা বলে ফেলেছিলাম কিন্তু ওই দিদি ভাবে আমি ওনাকে খারাপ কথা বলেছি, তাই কিছু না শুনেই আমায় জুতো দিয়ে মারতে থাকে। আমি বারবার বলছিলাম দিদি আমি তো তোমাকে কিছু বলিনি তুমি আমাকে মারছো কেন? কিন্তু দিদি কোনো কথা না শুনে আমাকে জুতো দিয়ে মারতে থাকে।”

প্রকাশ্যে কিশোরের এহেন হেনস্তার প্রতিবাদে মহিলার ওপর চড়াও হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা। একজন নাবালকের ওপর প্রকাশ্যে এহেন অত্যাচারের জবাব পেতে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই মহিলাকে ও বিকাশকে নিয়ে গড়িয়াহাট থানায় যায়। পুলিশ পারস্পরিক ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যপারটির মিমাংশা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকাশ্য রাস্তায় একজন নাবালক কে জুতো দিয়ে মারার অপরাধের শাস্তি শুধু ক্ষমা চাওয়া হতে পারে না বলে দাবি করেন জনগণ। ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে নেটিজেনদের মধ্যে নিন্দের ঝড় বয়ে যেতে থাকে। নেটিজেনদের মতে বর্তমানে মানুষের মানবিক বোধের চূড়ান্ত অবনতিই এইধরনের ঘটনার কারন।

বিকাশ ও তার বোন লাভলী দুজনেই গড়িয়াহাট সংহতি স্কুলের পড়ুয়া। সংহতি স্কুলের তরফ থেকে জানা গেছে বিকাশ ও লাভলী দুজনেই মেধাবী। বিকাশের সাথে হওয়া এই অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়ে সংহতি স্কুলের তরফ থেকে। সংহতি স্কুলের শিক্ষিকা শালিনী মাজী জানিয়েছেন তারা ইতিমধ্যে W.B.C.P.C.R (ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর প্রটেকশন অফ চাইল্ড রাইট) তে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। আমরা এর শেষ দেখে তবেই ছাড়ব। এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত মানুষ এগিয়ে এসেছেন বিকাশের সহযোগিতায়।

ঈশানী ধর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here