কৃষ্ণচূড়ার গাছ টাকে ছেড়ে বাড়ির দিকে এগোতে থাকে প্রেরণা। অজানা চিন্তাতে ওর পা গুলো যেনো অসার হয়ে যাচ্ছে। শুধু ভাবছে যে মা- বাবা তোমরা এটা করতে পারোনা আমি জানি।তবুও মন টা যেনো ছট্ফট্ করছে।কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না ও। বাড়িতে পৌঁছাতেই দেখে অনিমা গেটের সামনে দাড়িয়ে আছে; আয় আয় প্রেরণা। অনিমা:কিরে তোকে না বললাম যে আজকে তাড়াতাড়ি ফিরতে;এত দেরি করলি কেনো আজ?তোর কাজ হলো?প্রজেক্ট সাবমিট করেছিস ? প্রশ্ন গুলো একটার পর একটা প্রেরণার কানে আসে। কিন্তু ও ওই সব শব্দ গুলোর গুরুত্ব দেয় না কারণ মায়ের কন্ঠস্বর টা আজকে যেনো ওর বড্ড অপরিচিত বলে মনে হচ্ছে ।

প্রেরণা উল্টো প্রশ্ন করে- মা তোমরা কি লুকাচ্ছ বল তো?সকাল থেকে দেখছি বাড়িতে এত লোকজন,হইচই। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না মা। মন টা বড়ো অস্থির করছে বল না; আজকে বাড়িটাকে অত সাজানোর মানে কি? অনিমা একটা মেকি হাঁসি দিয়ে বলে ওঠে – আমরা তোমার জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রেরণা: কি সিদ্ধান্ত মা? অনিমা: তোমার জন্য আমরা পাত্র দেখে এসেছি।ছেলে সরকারি চাকুরে।পাকা কথা হয়ে গেছে।আজকে তোমার আশির্বাদ। ফাইনাল এক্সাম হতেই একটা শুভ দিন দেখে তোমার বিয়ে ঠিক করা হবে। কথাটা শুনতেই প্রেরণার কাছে এক ধাক্কায় গোটা পৃথিবী টা যেনো অচেনা-অজানা হয়ে পরে। মনে হলো এক গভীর অন্ধকার কুয়োতে ওর বাব-মা ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। যেখানে মুক্ত ভাবে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখে- ও সেইখানে কিনা বাবা ওকে এক বন্দী জীবন উপহার দেওয়ার জন্য তৎপর।

মায়ের কথা গুলো শুনতেই যেনো মনে হলো ওর কানে কেউ এক কলসি হলাহল ঢেলে দিল। প্রেরণা – তারস্বরে চেঁচিয়ে কি বলছ কি মা তুমি? তোমরা আমকে একটি বার জানানোর প্রয়োজন মনে করলেনা। অনিমাকে জরিয়া ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে প্রেরণা। মায়ের নরম হৃদয় গলে যায়। কিন্তু বেচারি অনিমা কি বা করবেন । তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর তো সংসার করেনি শুধু কোনো এক কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রেরণার বাবা বেড়িয়ে এসে বলে ওঠে,যাও গিয়ে তৈরি হয়ে নাও। এই কথাটা শোনার পর ও এক ছুটে ওপরে নিজের ঘরে চলে যায়। কিন্তু একি নিজের ঘর কেই আজকে যেনো অজানা মনে হচ্ছে। কারা যেনো এসে ভিড় করেছে ;প্রেরণা জিজ্ঞেস করতেই বলে ওকে নাকি সাজাতে এসেছে। প্রেরণা – এক্ষুনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাও।

আমকে একা থাকেতে দাও। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর অনিমা আসে ওকে নীচে নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রেরণা শুধু শাড়ী পরে বিছানাতে শুয়ে আছে। চোখমুখ যেনো একবারে শুকিয়ে গেছে। হালকা মেকআপ করা। অনিমা এসে প্রেরণা কে বলে, আমকে পারলে ক্ষমা করে দিশ মা।তোর কোনো ইচ্ছেই আমি কোনোদিনও পূরণ করতে পারিনি।কিন্তু দেখবি তোর ভবিষ্যত খুব সুখের হবে বলে হাউ হাউ করে কেঁদে দেয় অনিমা। কিন্তু প্রেরণা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে গেছে যেনো কোনোএক প্রাণহীন শরীর । নিচে কত রকম আলোচনা, ছোট্ট প্রেরণা আজ কত বড়ো হয়ে গেলো ,এই ওই কত গল্প সবার। সে কত আয়োজন; কত কি! চারদিকে লোকজন ,ফুল দিয়ে সম্পূর্ণ ঘর যেনো সুসজ্জিত। পাত্রপক্ষ এখনও আসেনি, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো আসবে।কিন্তু এইসবের মাঝে একটা ব্যাপার বড়োই অদ্ভুত ! প্রেরণা কে দেখলে মনে হচ্ছে; সোফার ওপর সেজেগুজে যেনো কোনো একটা জীবন্ত লাশ বসে আছে। বা কোনো একটা কাঠের পুতুল!

এর মধ্যেই পাত্রপক্ষ এসে উপস্থিত হলো। সঙ্গে পাত্র এসেছে। নাম সুকুমার।নামের সঙ্গে চরিত্রের মিল ঠিক কতটা আছে তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। সবাই হৈ চৈ করছে। পাত্রপক্ষ কে সবাই স্বাগত জানাচ্ছে । কিছুক্ষণের মধ্যেই আশীর্বাদ পর্ব শুরু হলো। প্রেরণা আস্তে আস্তে সোফা থেকে উঠে মেঝেতে বিছানো একটা আসনের ওপর বসলো। প্রেরণা কে ঘিরে আছে সকল আত্মীয়-স্বজন।পিসির মেয়ে কবিতা এসে প্রেরণাকে ধাক্কা দিয়ে বললো দেখরে কি দারুন দেখতে তোর বরকে।

প্রেরণা মাথা নীচু করে বসে আছে।প্রত্যেকটা নিয়ম,আচার-অনুষ্ঠান ওর যেন দম বন্ধ করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে আশীর্বাদ পর্ব শুরু হলো।বাড়ির গুরুজনেরা এসে, তারপর অন্যান্য আত্মীয়রা এসে প্রেরণা কে আশীর্বাদ করল।সুকুমারের বাবা এসে প্রেরণের মাথায় হাত রেখে বলল,আমার ছেলে কে তোমার পছন্দ হয়েছে তো? প্রেরণার ভাবতেই অদ্ভুত লাগে। কী আশ্চর্য তাইনা এই সমাজটা! যাকে কিনা বিয়ে ঠিক করার আগে তার নিজের মা-বাবা একবারও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করেনি তাকে কি না আশীর্বাদ এর পরে শশুর মশাই এসে জিজ্ঞেস করছেন যে তার ছেলেকে ওর পছন্দ হয়েছে কিনা!
আশীর্বাদের অনুষ্ঠান শেষ হলো আবার সোফায় গিয়ে বসল প্রেরণা। অনিমা এসে বলল-প্রেরণা তোর সঙ্গে সুকুমার একটু কথা বলতে চায়। তোরা একটু নিজের মতন করে কথা বল।

সোফাটার উপর চুপচাপ বসে আছে প্রেরণা। এইসব অসহ্য লাগছে ওর।কি করে কোন মেয়ের অমতে গিয়ে তার বাড়ির লোক তার বিয়ে ঠিক করে দেয়। ওর মনের ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে স্বপ্নগুলোকে। অচেনা-অজানা একটা মানুষের সঙ্গে কি করে থাকবে সে? প্রেরণা একটিবারের জন্য চোখ তুলে দেখেনি সুকুমারের দিকে।
সুকুমার বলে ওঠে-তুমি জিওগ্রাফি নিয়ে পড়ছো তো? তা এই পড়াশোনা করে করবেটা কি?
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে প্রেরণা সুকুমারের দিকে তাকায়। রাগে, ক্ষোভে,ঘেন্নায় ফেটে পড়ে প্রেরণা। কেমনতর মানুষ? কার সঙ্গে বিয়ে হতে চলেছে তার? প্রেরণা মৌন থাকে। এক মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে যেন সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়।

এমন করে তাকিয়ে আছ কেন? সুকুমার বলে। আমি সরকারি চাকরি করি। মাস গেলে মোটা টাকার মাইনে পাই। তোমাকে ওই চাকরি টাকরি কিছু করতে হবে না।কথাটা শেষ হওয়ার আগেই দৌড়ে ও নিজের ঘরের দিকে যায়। ঘরে ঢুকে ও সশব্দে দরজা বন্ধ করে দেয়। দরজার আঘাতে হাতে পরা কাচের চুড়ি গুলো ভেঙেচুরে মাটিতে গড়িয়ে যায়।চুরির আঘাতে ওর হাতের অনেক টা প্রায় কেটে যায়। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ক্ষরণ হতে থাকে । কিন্তু এই রক্তক্ষরণ তো শারীরিক , তার মনের মধ্যে যে গভীর দগদগে ক্ষত রয়েছে কেউ দেখতে পারছেনা সেটা । সেখান থেকে তো অবিরত রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here