সকাল হতেই সবাই ডাকাডাকি শুরু করলো। আজকে বৌ-ভাত।অস্মিতা প্রেরণা-কে ডেকে বলে বৌদি উঠে পরো সকাল ৭ টা বাজে ।দেখো আমি তোমার জন্য চা নিয়ে এসেছি। প্রেরণা বলে মিঠু দি তুমি এত সকাল-সকাল ডাকাডাকি করোনা তো।আমি আর একটু ঘুমাতে চাই। অস্মিতা প্রেরণার কাছে গিয়ে বলেন আমি অস্মিতা। প্রেরণা চোখ মেলে চেয়ে দেখে সত্যিই তো সামনে অস্মিতা দাঁড়িয়ে আছে। প্রেরণার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল যে ও আজ একটা অন্য বাড়িতে আছে অন্য পরিবেশে আছে। প্রেরণা উঠে পরে আর অস্মিতার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে বলে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’… বৌদি তুমি চা-টা খেয়ে তাড়াতাড়ি নিচে এসো সবাই তোমাকে ডাকছে। প্রেরণা- আমি যদি একটু পরে যাই কোন অসুবিধা হবে? না না,বৌদি কোন অসুবিধা হবে না;

আমি জানি তুমি কাল ঠিক করে ঘুমাতে পারোনি রাতে; তুমি একটু রেস্ট করে নীচে নামো নো প্রবলেম। প্রেরণা যখন নীচে নামে দেখে এরই মধ্যে বাড়িতে লোক সমাগম হতে শুরু করেছে। সুকুমার হঠাৎ কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে গুড মর্নিং। সুকুমারের মা এসে জানায় আজ তোমাকে সবার জন্য রান্না করতে হবে, রান্নার মাসি তোমাকে সাহায্য করে দেবে। আমার ছেলে যা যা খেতে ভালোবাসে আজ সে সব কিছু তুমি রান্না করবে, তবেই তো বুঝবো তুমি আমার ছেলের উপযুক্ত কিনা…কোনো কথা না বলে শুধু একবার ওর শাশুড়িমার দিকে তাকিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। বাড়িতে থাকতে কখনো কোনো কাজ করতে হয়নি তাকে, মা কোনোদিনও তাকে আগুনের কাছে যেতে দেয়নি।

অথচ আজ এখানে আস্তে না আস্তেই পরের ছেলের পছন্দের রান্নার লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দিল। আজ মা-র কথা বরো মনে পড়েছে প্রেরণার। প্রেরণার শাশুড়ি বলেছিল যে রান্নার মাসি নাকি ওকে সাহায্য করবে কিন্তু কই তিনি আজকের আসেননি। অগত্যা প্রেরণাকে সব রান্না একা হাতে সামলাতে হয়। ইউটিউব টা দেখে কিছু কিছু রান্না করার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই ও একা হাতে সবটা সামলে উঠতে পারছিল না। কোন ভাবে রান্না-বান্না সেরে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে। ভাত-কাপড়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়;সুকুমার ওর হাতে শাড়ি আর খাওয়ার থালা দিয়ে বলে তোমার সারাজীবনে ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম। কোনভাবে খাওয়ার থালা টা প্রেরণা হাতে তুলে দিয়ে সুকুমার সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। প্রেরণার গলা দিয়ে খাওয়ার নামছিল না তা কোনোভাবে খাওয়ার টা খেলো। দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর।

একটার পর একটা নিয়ম যেন ওর অসহ্য বলে মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সব ছেড়েছুড়ে একছুটে কোথাও অন্য জায়গায় চলে যেতে। যেখানে কেউ ওকে বুঝবে কেউ ওর অনুভূতিগুলোর দাম দেবে। দিনশেষে ওর ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা গুলোর কথা মাথায় রাখবে, সবশেষে ওর মনের মূল্যায়ন করবে। প্রেরণা খাবারগুলো সবার পাতে দেয়। খাওয়ার টা একবার মুখে তুলে সবাই একে অপরের দিকে তাকায়। শাশুড়ি বলে ওঠে রান্না করার ইচ্ছে ছিলো না যখন বলতে পারতে আজকের দিনে আমাদের খাওয়া টা নষ্ট না করলেই পারতে। সুকুমার বলে ওঠে তুমি রান্না করেছো না ছাই করেছো,, রান্না এতো নুন কে দেয়? প্রেরণার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সুকুমারের বাবা ভদ্র মানুষ সে বলে ওঠে সুকুমার থামবে তুমি। মা প্রেরণা ঠিক আছে কোন অসুবিধা নেই তুমি পরের বার থেকে একটু নজর রেখো।

বিকেল গড়াতে না গড়াতেই সং এর মত সেজে নীচের হল রুমটায় এসে বসতে হয় ওকে জলসাঘরে আজ সবাই মেতে উঠেছে। প্রেরণার মনের খবর কেউ রাখে না কেউ রাখেনি কোনদিনও। বৌ-ভাতের অনুষ্ঠানের সমাপ্ত হয়। এই সব ঝক্কি- ঝামেলা শেষ হয়ে যাওয়া তেও শান্তি নেই ওর। বাড়ির সবাই আজ এই বাড়িতে এলেও কারোর চোখে আমায় ছেড়ে থাকার কষ্ট ছিলনা শুধু মা বাদে। কিন্তু প্রেরণার বরো কষ্ট হচ্ছে বাড়ির সবাইকে ছেড়ে থাকতে, কেউ বুঝতে চায়না সেটা, সবাই বলছিল এ বাড়িতে এসে নতুন লোক পেয়ে আমাদের নিশ্চয়ই ভুলে গেছিস। বউভাতের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতেও প্রেরণার শান্তি মিললো না। আস্মিতা প্রেরণাকে ফুলের সজ্জায় বসিয়ে দিয়ে বলল, আমি আসি, আর একটু অপেক্ষা করো দাদাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যে সুকুমার ঘরে এসে প্রেরণার কাছে এসে বসতেই সুকুমারের মুখ থেকে একটা দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসে। প্রেরণার বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি যে আজকের দিনেও ছাইপাশ মদ খেয়েছে । এইরকম একটা লোককে নিজের স্বামী বলে মানতে প্রেরণার ঘেন্না হয় সেখানে কি করে এরকম লোকের সঙ্গে সংসার করবে? মদের নেশায় ভুলভাল কথা বলতে থাকে সুকুমার। প্রেরণা সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ে আর নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করতে থাকে। ঘুম,সে তো যেন কবেই চির বিদায় নিয়েছে তার চোখ দুটি থেকে.. রাত কেটে ভোর হতেই বাইরে চেঁচামেচির শব্দে প্রেরণার ঘুম ভাঙে। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে দেখে নটা পাঁচ, তাড়াতাড়ি করে ফ্রেস হয়ে বাইরে আসে…।

নীচে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে।প্রেরণা নীচে নামতেই শাশুড়ি-মা চিল্লিয়ে বললেন মহারানির ঘুমভাঙার সময় হলো তবে..আমি তো ভাবলাম জন্মের ঘুম ঘুমোচ্ছিলে। তা বাড়ির রান্নবান্না কে করবে শুনি? তা তোমাকে কি বিনেপয়সায় এ বাড়িতে খাওয়াব পরাব? তোমার বাবা-মা কী শিখিয়ে বিয়ে দিল গো…. এত কথার উওর প্রেরণার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয়নি… প্রেরণা বলল বলো আমায় কী কী করতে হবে? আমি সব করে দেবো। শাশুড়ি-মা বললেন যাও আগে রান্নাটা সারো। এত কথার মাঝে প্রেরণা কিছু খেল কিনা সে সব দেখার কেউ ছিলনা। অথচ বাড়িতে সকালে উঠে না খেলে মা কতো বকা দিতো…

হাত পুড়িয়ে রান্না করে দুপুরে সবাইকে খেতে দিয়েও কোনো প্রশংসা জোটেনি ভাগ্যে, বরং শুনতে হয়েছে এই রান্নার ছিরি, তোমার মা তো দেখছি কিছুই শেখায়নি। সারাদিনের কাজ সেরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে প্রেরণা ঘরে গিয়ে দক্ষিণদিকের জানলাটা খোলে। বাড়ির দক্ষিণের জানলাটা খুললে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করতো সে। কিন্তু এখানে যে তার সেই প্রিয় কৃষ্ণচূড়া গাছটা নেই…নেই তার চিরকালের বন্ধু সেই নীলকন্ঠ পাখিটি.. যাকে তার সব দুঃখ খুলে বলে সে একটু হালকা হবে.. বরং রয়েছে এক পচা ডোবা, যেখান থেকে প্রতিনিয়ত বাতাসে নিস্বিত হচ্ছে এক বিকট দুরগন্ধ। আস্তে আস্তে সবই সয়ে যায় প্রেরণার।

এভাবেই বেশ একটা বছর পাড় হয়ে যায়… একদিনের ঘটনা তখন প্রায় রাত দেড়টা,, সুকুমার তখনও ঘরে ফেরেনি।প্রেরণার সঙ্গে সুকুমারের মানসিকভাবে কোন স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও সমাজের চিরাচরিত রীতি মেনে আর বাকি পাঁচটা মেয়েদের মতন রাতে সুকুমারকে না খাইয়ে কখনো খাইনি প্রেরণা।সুকুমার এর জন্য অপেক্ষা করতে করতে টেবিলের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। সজোরে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে প্রেরণার। ও হন্তদন্ত হয়ে দরজা খোলে। সুকুমার ঘরে এসে চিল্লামিল্লি করতে শুরু করে, প্রেরণার বুঝতে কোন অসুবিধা হয়নি যে সুকুমার আজও আবার সেই ছাইপাশ গিলে এসেছে। মদ খাওয়ার খুব বাজে একটা স্বভাব আছে সুকুমারের কিন্তু আজ বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি হয়েছে। নেশা করে প্রেরণাকে মাঝেমধ্যেই গালাগালি করে সুকুমার কিন্তু সবটাই প্রেরণার গা সওয়া হয়ে গেছে ।চুপচাপ টেবিলের সামনে গিয়ে খাওয়ার-টা বাড়তে শুরু করে। খাবারটা বেড়ে কোন প্রকার সুকুমারের হাতটা ধরে টানতে টানতে নিয়ে এসে টেবিলে বসায় ওকে। খাওয়ার টা মুখে তুলেই প্রেরণার দিকে কি বীভৎস ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকায় সুকুমার।

সুকুমারের চোখ থেকে যেন ওর প্রতি আগুন বেরোচ্ছে। এইরূপ দৃষ্টির কোনো কারণ খুঁজে পায়না প্রেরণা,, ও সুকুমারের দিকে তাকিয়ে বলে কি হয়েছে তুমি এমন করে দেখছো কেন?কথাটা বলতে না বলতেই প্রত্যুত্তরে প্রেরণার কোমল গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেয় সুকুমার। প্রায় ওর গলা টিপে ধরে সুকুমার আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে ওকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়…… তোর যখন সংসারে মন নেই তো কী করতে বিয়ে করেছিলিস, তুই মেয়ে তো কোন কাজেরই না; এই বলতে বলতে প্রেরণার বুকে পা তুলে দেয় সুকুমার। রান্না করার ইচ্ছে নেই ! ইচ্ছে করে আমার রান্নায় বেশি করে নুন দিয়েছিস,, যাতে আমি না খেয়ে মরে যাই তারপর অন্য পুরুষের সঙ্গে ফুর্তি করতে পারিস। প্রেরণা শ্বাস পর্যন্ত নিতে পারছিল না তার বুকের ওপর ক্রমাগত লাথি মেরে যাচ্ছিল সুকুমার।

প্রেরণা নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে সুকুমারকে সরিয়ে দেয়। ছুটে নিজ ঘরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে খাটের উপর প্রায় অচৈতন্য হয়ে শুয়ে পড়ে প্রেরণা। প্রায় বেশকিছু ঘন্টা পরে প্রেরণার চেতনা ফেরে ধীরে ধীরে চোখ খোলার চেষ্টা করে প্রেরণা। সারা শরীর যেন যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে ওর। চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে আসবে ঠিক করে দেখতে অব্দি পারছে না ও,, ওর কোমড় যেন একেবারে ভেঙে পড়ে গেছে দাঁড়ানোর ক্ষমতা পর্যন্ত নেই ওর মধ্যে এখন। তাও শরীরে যেটুকু শক্তি ছিল সেটুকু দিয়েই কোন প্রকার পাশের একটা ড্রেসিং টেবিলের অপর ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল প্রেরণা।

অন্তিম পর্ব আগামী কাল আসছে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here