দেখতে দেখতে প্রায় তিন মাস কেটে যায়। হ্যাঁ;আজ প্রেরণার বিয়ে। সারারাত দু-চোখের পাতা এক করেনি ও। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন; স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন ;নিজের জীবনটাকে একটু অন্যরকম করে বাঁচার স্বপ্ন ; দু-চোখ ভরে পুরো পৃথিবী দেখার স্বপ্ন সেটা পূরণ নাই বা হলো, কিন্তু যে মানুষটার সঙ্গে তার বিয়ে হতে চলেছে সে তাকে ভালবাসবে তার স্বপ্নের দাম দেবে তাকে যত্ন করবে এইটুকু ভেবে নিজের মনটাকে কোনোরকম সামলে রেখেছিল সে।কিন্তু সুকুমার তার মনের মতন মানুষ নয়।সে যাই হোক সুকুমার যেমন ঠিক তেমন করেই ওকে মানিয়া নিতে হবে এটা জানে প্রেরণা। ভোর হলো,পাড়ার কাকী জেঠি-রা এসে হইচই শুরু করলো।
প্রেরণা কোনদিনও চায়নি যে এমন একটা ভোর তার জীবনে আসুক।

কবিতা এসে প্রেরণাকে ঘুম থেকে তুলে নীচে নিয়ে গেল। ঘর ভর্তি লোকজোন। দধিমঙ্গল শুরু করতে হবে, পাড়ার কাকি, জেঠিরা তাড়া দিচ্ছে, সূর্য উঠে গেলে জল সইতে যেতে পারবে না, তাতে মেয়ের কপাল পুরবে।
এক বাটি দই চিড়ে মুখের সামনে বসানো… পিসি বললো,খেয়ে নে আজ আর কিছু খেতে পারবি না। প্রেরণার গলা দিয়ে খাবার নামলো না, গলায় যেন কাঁটা বিধে আছে।
কয়েক চামচ মুখে দিয়ে প্রেরণা উঠে চলে গেল।
সবাই জল সইতে চলে গেল…
কয়েক ঘন্টার মধ্যেই গায়ে হলুদ পর্ব শুরু হলো।
এভাবে নানা আচার – আনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বিয়ের গোধূলি লগ্ন চলে এলো।

টুকটুকে লাল একটা বেনারসি পরে মণ্ডপে এলো প্রেরণা।পান পাতা টা সরিয়ে সুকুমারের দিকে তাকালো ও । হুম; শুভ দৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু সুকুমারের দৃষ্টি কি আদবেও শুভ?
শুভ না অশুভ সেই ভাবনা় পরেই হোক কিন্তু সেই দৃষ্টিতে প্রেরণের জন্য বিন্দুমাত্র প্রেম ছিল না সেটা বুঝতে ওরে একটুও অসুবিধা হয়নি।
শুভ দৃষ্টি সম্পন্ন হলো। সম্পূর্ণ হল মালাবদল পর্ব।
বিবাহ যোগ্য হচ্ছে;সামনে বসে আছে ওর বাবা।
উনি কন্যা দানের জন্য বড়োই উদগ্রীব ।

প্রেরণা যেনো ওর বাবার দুচোখে আজ এক অদ্ভুত ধরনের শান্তি দেখতে পাচ্ছে। পাবে নাই বা কেনো?
কাঁধের থেকে যে এক পাহাড় সমান বোঝা নেমে যেতে চলেছে।প্রেরণা আর চোখে সুকুমারের দিকে তাকায়,পাশে বসে থাকা মানুষটার জন্য কোনরূপ অনুভূতি জাগে না ওর।হঠাৎ করে সুকুমার ওর কানের কাছে এসে বলতে থাকে – মুখ তাকে এমন বেজার করে রেখেছ কেনো? যেনো তোমার বিয়ে নয় শ্রাদ্ধ হচ্ছে। মনে মনে যেনো একটা বিকট হাঁসি হাসছে সুকুমার;স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে ও।একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে প্রেরণা।সাত পাক হলো।সিঁদুর দান সম্পূর্ণ হলো;বিয়ে শেষ হলো।
প্রেরণা মণ্ডপে উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, সবার মুখে যেনো কেমন একটা মেকি হাঁসি-র মুখোশ পড়ানো ।

ভেবেছিল, বিয়ে সম্পন্ন; এবার অন্তত এসব থেকে বেরোতে পারবে, নিজের সাথে একটু সময় কাটাতে পারবে। কিন্তু তার এই ভ্রম কিছুক্ষণের মধ্যেই দূর হলো।
এবার সবাই বাসর রাত জাগার জন্য নাছোড়বান্দা।ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও ভাই-বোন দের কথা না ফেলতে পেরে বাসর ঘরে ঢুকলো।
নাচ-গান, হুল্লোড়- আল্লাদে সবাই মাতোয়ারা কিন্তু,প্রেরণার মনে এখন শুধু কষ্ট না সঙ্গে ভয়েরও সঞ্চার হয়েছে। সে কি পারবে এই ছেলের সাথে সংসারজীবন কাটাতে, কেমন ভাবে মানিয়ে নেবে সে শশুর বাড়িতে? এমন নানান চিন্তা প্রেরণার মনকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সুকুমারের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না যেখানে,সেখানে কিনা ওর সঙ্গে সংসার করতে হবে ভেবেই অজানা একটা ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে ও।

মধ্যরাতে অবশেষে বাসরঘর সম্পন্ন হলো; সবাই যে যার মতো ঘরে চলে গেল। পরদিন ভোর হতেই সবাই কনে বিদায় করতে ব‍্যস্ত হয়ে উঠলো।কিন্তু,প্রেরণার চোখে জল নেই। কেননা সত‍্যি বলতে আজকে সাধারণত মেয়েদের বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে বলে বাবা-মায়ের জন্য কষ্টে বুক ফেটে যায়। কিন্তু না প্রেরণার ক্ষেত্রে সেটা হলো না। হবেই বা কি করে ওর বুকের মধ্যে আগুনের তেজ চোখের সব জল কেড়ে নিয়েছে!
প্রেরণার মা প্রেরণা কে আলিঙ্গন করতে আসতেই ও দূরে সরে যায় । কারণ সামনের মানুষ টাকে মা বলে ভাবতে আজকে ওর বিন্দু মাত্রও ইচ্ছে করছে না। রীতি- নিয়ম পালোন করে প্রেরণা রওনা দিলো শশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে…

ঘন্টা তিনেক গাড়িতে যাত্রা করার পর শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছালে প্রেরণা। গাড়ি চলাকালীন মুখ থেকে টু শব্দটিও কেউ করেনি সুকুমার।প্রেরণার মনের অবস্থা ওর অজানা ছিলনা কিন্তু তাও একটু সান্ত্বনা তো দুরের কথা; একটা কথাও পর্যন্ত বলেনি-ও প্রেরণার সঙ্গে।গাড়িটা থামতেই গাড়ির গেটটা হুট করে খুলে তাড়াতাড়ি নেমে যায় সুকুমার ; গাঁটছড়ায় টান পড়ে ফলে প্রেরণা কেও আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নামতে হয়।কিন্তু,সবাই না একটা বড়োই অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলো যে নতুন বউয়ের চোখে জল নেই।

সে যাই হোক চোখের সামনে বিরাজমান হলো এক সুবিশাল বাড়ি। এই এইখানেই গড়ে তুলতে হবে ওকে ওর আগামীকাল।ছোটরা হইচই করে প্রেরণাকে ঘিরে ধরে।অস্মিতা প্রেরণের ছোট ননদ।
অস্মিতা-বৌদি ও বৌদি! তাড়াতাড়ি এস বলে রীতিমতো টানতে টানতে প্রেরণাকে ঘরের দিকে নিয়ে যায় অস্মিতা।
পাথরের একটা পাত্রে দুধে-আলতা জল গোলানো দুয়ারের সামনে রাখা রয়েছে তার থেকে বিছানো রয়েছে সাদা একটা চাদর যার ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে প্রেরণা গৃহপ্রবেশ করবে।
প্রেরণার গৃহপ্রবেশের পর তাকে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো রান্নাঘরে, সেখানে নাকি কি একটা নিয়ম পালন করতে হবে।
প্রেরণার সামনে এক বাটি দুধ বসিয়ে গ‍্যাস জ্বেলে দেওয়া হলো…. দুধ উথলিয়ে পড়লে তবেইতো এই মেয়ে লক্ষী।

কিন্তু এমনটা ঘটল না উল্টে দুধ কেটে গেল। কোনো এক মাসি শাশুড়ি ছুটে গিয়ে বাইরে বেড়িয়ে চিল্লিয়ে বলতে লাগলেন, কি সর্বনাশ, এবার আমাদের ছেলেটার কী হবে? এ কোন অলক্ষীকে ঘরের বউ করে আনলে গা….।
প্রেরণা দুধের বাটির কাছে গিয়ে গন্ধ শুঁকে বোঝে ভিষণ বাজে গন্ধ দিচ্ছে, বেশ কিছুদিনের বাসি এটা।
রান্নাঘর থেকে বেরোতেই দেখে সবার দৃষ্টিই যেন পাল্টে গেছে। কেমনভাবে যেন সব ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রেরণাকে তার মা, মাসি সবাই বলে পাঠিয়েছে সে যেন শশুর বাড়িতে মানিয়ে গুছিয়ে নেয়। কেউ যেন তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে না পারে। সে যেন শশুর বাড়ির সবাইকে যত্ন করে।প্রেরণা বুঝতেই পারছিল তার আর নিজেকে দেওয়ার মতো সময় নেই।সব স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে শুধু সংসারের কল‍্যানে নিজেকে সপে দিতে হবে। নিজের মনকে বুঝিয়ে খানিকটা প্রস্তুতিও নিয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা আশঙ্কা তাকে বারবার গ্রাস করতে চাইছিল। অস্মিতা এসে বলল-বৌদি বৌদি চলো চলো আমাদের কিছু বেশ মজার খেলা হবে। এটাতে দেখবে খুব মজা হবে।
প্রেরণা-হ্যাঁ তুমি যাও আমি আসছি।
বড় একটা পাথরের পাত্রে দুধ রয়েছে তাতে মনে হয় কয়েক ফোঁটা আলতা দেওয়া আর গোলাপের পাপড়িগুলো উপরে ছড়ানো। দুটো আংটি দুধের মধ্যে রয়েছে।

সুকুমার এর পাশে গিয়ে বসল প্রেরণ। ওরা আংটি খুঁজে একে অপরের হাতে আংটি পরিয়ে দিল ।মুখ টাকে গম্ভীর করে যেনো মাঝে মধ্যেই আর চোখে তাকায় ও প্রেরণার দিকে। সদ্য বিয়ে করা স্ত্রীর প্রতি কোন্ রূপ প্রেম ধরা পড়ে না সুকুমারের চোখে। সুকুমার যদি একটু ভালো আচরণ করতো, যদি একটু ভালোবেসে প্রেরণার সঙ্গে কথা বলত, যদি একটু ওকে বোঝার চেষ্টা করতো তাহলে হয়তো সেটা প্রেরণার ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়া স্বপ্নের উপর কিছুটা প্রলেপের কাজ করতো। কিন্তু মানুষটা বড্ড রুক্ষ স্বভাবের;তারপর আরো বেশকিছু ধরনের খেলা হয়েছে কিন্তু সবকটা খেলা খুব নিরস প্রকৃতির। প্রেরণার এসব বড্ড বিরক্ত লাগছে।
আজ কালরাত্রি।প্রেরণা অস্মিতার সঙ্গে ওর ঘরে শোবে। প্রেরণা ফ্রেশ হয়ে স্যুটকেস থেকে একটা শাড়ি বের করে পড়ে ।অস্মিতা এসে বলল-বৌদি আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ো ।আজকে তোমার সঙ্গে গল্প করব না। আমি বুঝতেই পারছি আজকে তুমি খুব টায়ার্ড।আজ একটু রেস্ট নাও শুয়ে পড়ো কাল না হয় আমরা অনেক গল্প করব।

এই বাড়িটার মধ্যে একমাত্র প্রাণবন্ত খুব সুন্দর একটা চরিত্র বললে তোর চোখের সামনে অস্মিতার মুখটা ভেসে ওঠে। প্রেরণা একটা হাসি দিয়ে বলল আচ্ছা কালকে আমরা গল্প করব।
আজকে তুমিও শুয়ে পড়ো।
বিছানায় শুয়ে তার আগামী জীবনের কল্পনা করতে থাকে কিন্তু দু- চোখের পাতা এক করতে পারে না।ছোটবেলা থেকে দু-চোখ ভরে পৃথিবী দেখার যে স্বপ্নের মায়াজাল বুনেছিল ও আজকে থেকে সেটাকে গুটিয়ে হয়ত’বা হৃদয়ের কোন এক বন্দী মনিকঠোরে তুলে রাখতে হবে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here