মেঘা একছুটে রান্নাঘরে এসে রিতাকে বললো মা বাইরে কে যেন এসেছে ।রিতা বিরক্তির স্বরে বলে তুই গিয়ে বলে দে যে এখন মাফ করতে, হাতে আমার বড্ড কাজ ।এইসব ভিখারীগুলোর কোন সময় জ্ঞান নেই । মেঘা আবার বাইরে গিয়ে মিনিট খানেকের একটা বার্তালাপ সেরে একছুটে এসে বললো – ও মা , একটি বার কি দেখা করা যায় না? প্লিজ যাও না একটিবার । আচ্ছা আমি হাতের কাজ- টা সেরে নিয়ে যাচ্ছি ।

মিনিট দুয়েক পরে রিতা বাইরে গিয়ে দেখে বছর তিরিশ-বত্রিশের একজন মহিলা আর সঙ্গে ছোট্ট একটা মেয়ে। পোষাক-আসাক দেখে কিন্তু দিক থেকেই ওদের ভিখারী বলে মনে হয়নি । কী চাই বলে ওঠে রিতা।…..আমি মৌজা । বড় অসহায় আমরা । একটা কাজের খুব দরকার গো দিদি । কিন্তু আমাদের তো কোন কাজের লোক লাগবে না ।আমরা বাড়িতে তিনজন মানুষ ।সেই টুকু আমি সামলে নি । মৌজা বলে ওঠে – আমার স্বামী একটা শয়তান, বজ্জাত ।রাতবেরাতে মদ খেয়ে এসে আমাদের মারধর করে ।তাই ওই নরকে আর থাকা যাচ্ছে না দিদি ।ঘরের কাজ টুকটাক সবটাই পারি।দিদি একটু সাহায্য না করলে এই মেয়েটাকে নিয়ে কোথায় উঠি ।

এসব আমাকে শুনিয়ে কোন লাভ নেই ।তাছাড়া ওনার আহামরি এমন কিছু ইনকাম নেই যে আমি বিলাসিতা করে ঘরে কাজের লোক খাটাবো। আপনার এই দুটি পায়ে পরি গো দিদি ।ফিরিয়ে দেবেন না বলে রিতার পায়ের কাছে পরে কাকুতি-মিনতি করতে থাকে মৌজা । কারোর অসহায়তা এতো কাছ থেকে দেখেনি কখনও রিতা। হঠাৎই ওর চোখ পরে ঝিনুকের দিকে ।ঝিনুক হল মৌজার মেয়ে । বয়সে হয়তো বা মেঘারই পিঠাপিঠি । ওই ছোট্ট প্রাণটির নিষ্পাপ দুটি চোখ কখনো মিথ্যা বলতে পারে না । রিতার মাতৃহৃদয় ওদের ফেরাতে পারল না ।
আমাদের ভাড়ার ঘরটা আপাতত ফাঁকা পরে আছে ।তোমরা ওখানেই থেকো আর তোমাদের খাওয়া পরার ব্যাবস্থা হয়ে যাবে ।কিন্তু মাইনেকড়ি কিছু তেমন দিতে পারব না। লাগবে না গো দিদি ।এই বিপদের দিনে আপনি যা সাহায্য করলেন, ,,আপনার কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব ।

রিতা ঝিনুক কে কাছে টেনে বলে তোমার নাম টা জানা হলো না ।নাম কি তোমার ? ও শুধু ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে । মৌজা – দিদি ও ঝিনুক । আমার মেয়েটা কথা বলতে পারে না , জন্ম থেকেই নির্বাক।



কথা টা শোনা মাত্রই বুকটা কেমন যেন ধরাস করে ওঠে রিতার । ও ঝিনুক কে বুকে জড়িয়ে ধরে ।
দিন কেটে যায় ইতিমধ্যে ঝিনুক আর মেঘার বন্ধুত্ব ক্রমশ মাথা চারা দিয়ে ওঠে । ভাষাহীনা মেয়েটা হয়ে উঠেছে মেঘার সবচেয়ে কাছের বন্ধু । সব সময়ই ওরা একেওঅপরের সঙ্গে সঙ্গেই থাকে । মেঘা যেন ঝিনুকের কন্ঠ ।এমন নয় যে কোনো স্পেশাল স্কুলে ভরতি করেনি  রিতা, বরং নিজ অনিহায় পড়াশোনা টা হয়নি ওর ।

কিন্তু কী ছবি আঁকতে পারে ঝিনুক ।ওদের দুজনের সুন্দর মুহূর্তের দৃশ্য গুলো কে রঙ দিয়ে সাদা কাগজে বদ্ধ করার নিরোলস প্রয়াস করে ঝিনুক ।আর ওই প্রয়াসকে উৎসাহ দিয়ে যেন কী আনন্দ পায় মেঘা।এদিকে রিতা আর মৌজা ও গল্প করে দিনের অর্ধেক টা সময় কাটিয়ে দেয় । সত্যি বলতে রক্তের সম্পর্ক ছাড়া আত্মার সম্পর্কও যে কতোটা আন্তরিক হতে পারে তা এদের কে না দেখলে বোঝা দুষ্কর ।
দেখতে দেখতে দশটা বছর কেটে যায়।ঝিনুক মেঘা আর আগের মত সেই ছোট্ট টি আর নেই ।ওরা এখন বছর একুশের সদ্যযৌবন প্রাপ্ত তরুণী । শোনা গেছে মৌজার ওই মাতাল স্বামী ও নাকি মারা গেছে । সবটা মিলেমিশে একপ্রকার ভালোই সময় কাটছিল ।

হঠাৎই একদিন ঝিনুকের শরীর টা খারাপ করে ।ও নিজের ঘরে চুপচাপ শুয়ে থাকে । কলেজ থেকে ফিরেই ঝিনুক কে খোঁজে মেঘা কিন্তু ঘরময় ওকে খুঁজে না পেয়ে শেষে ভাঁড়ার ঘরে ওর সাথে দেখা হয়।আধ ভাঙা ঘুমে ঝিনুক ইশারায় ওকে বলে যে ও নাকি ঠিক আছে কিন্তু মেঘা দেখে যে ঝিনুকের গা জ্বরে পুরে যাচ্ছে । মেঘা তরিহরি করে ডাক্তার ভাকে ।এদিকে মৌজা আর রিতা দুজনেই টেনশনে পরে যায়। ভাক্তার কিছু ওষুধ দিয়ে চলে যায়।ওদিকে কতোদিন কেটে যায়, কতো ডাক্তার আসে। কারিকারি টাকা বেরিয়ে যায় কোন হিসাব থাকে না । মেঘা রাতের পর রাত জেগে থাকে যদি ওর রাতে কিছু দরকার হয়।এদিকে ঝিনুক নিজের কষ্টের কথা বলতেও পারে না ।ওর অবস্থার কোন উন্নতি হয় না দিন দিন ওর শরীর টা যেন আরও খারাপ হতে থাকে । শহরের কোনো ডাক্তার অজানা জ্বরের কোন কারন খুঁজে পায়না ।

একদিন মাঝরাতে নিঃশব্দে সবাই কে ছেড়ে চলে যায় ঝিনুক ।সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় রোজ একটু একটু করে শেষ হয়ে যায় মৌজা । আর মেঘা, ,সে তো যেন একটা জীবন্ত লাশ।
দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল । কিন্তু মেঘার মনে ঝিনুকের স্মৃতি এখনও জীবন্ত । দিনদিন ওর চোখ টা যেন কেমন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে ।মেঘা এখন আর ঝিনুকের মতোই কোন কথা বলে না। ভাষা তো ওর জীবন থেকে ঝিনুকের সঙ্গেই বিদায় নিয়েছে ।ঝিনুকের আঁকা ছবি গুলো বুকে আগলে ধরে ঘরের অন্ধকার কোণে নিথর নিরব হয়ে বসে থাকে মেঘা। রিতা আর মৌজা শুধু নির্বাক দর্শকের মত থেকে যায়।আর দুটি পরাজিত মাতৃহৃদয়ের হাহাকার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here