অপেক্ষা

0
585
বাড়ি ফিরেই ছাদের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল রাহি। বেশ কয়েক মাস ধরেই কেমন যেন অসহ্য হয়ে উঠেছে নিজের কাছেই।
মেঝেতে খাটের পায়ার ধারে হেলান দিয়ে বসে শিলিং ফ্যান এর দিকে তাকিয়ে। আজ তার কিছু ভালো লাগছে না। চিৎকার করতে চাইলেও সে পারবে না। ভীষণ রকম নিস্তব্ধতা। নিস্তব্ধতার মধ্যেই কান ফাটানো চিৎকার, কিন্তু চারিদিকে কেউ নেই। মাথা ঘুরছিল তার। মাইগ্রেনের যন্ত্রণা টাও বেড়েছে রাহির। শুধু একটাই কথা বার বার তার কানে ভেসে আসছে ” রাহি! আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।” প্রতিধ্বনি র মতন যেন চারিদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলেছে। সে কেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ! দমবন্ধ হয়ে আসছে , গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে চোখের জলে। ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে মেঝেতে। রাত তখন আড়াইটা। কিভাবে যেন ঘড়ির কাটায় ঘন্টা দুয়েক পেড়িয়ে গেছে। জানলার দিকে এক ঠায়ে তাকিয়ে সে। কি যেন ভেবে চলেছে। চোখের পাতাও তার স্থির।
সেই রাতের শেষে কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর।
ডায়েরীর পাতা উল্টে দেখতে গিয়ে একটা পাতায় থমকে যায় সে। কিছুটা আবছা হয়েচে লেখায়।
“কিছুদিনের মধ্যেই ফ্লাইটের টিকিট বুক করি। একদিন যে এই ঝড়টা ওঠার কথা ছিলোই। প্রস্তুতি নিয়েওছিলাম সেই কারণেই পালিয়ে গেছিলাম পালিয়েই যাচ্ছি বটে আজও। সব যোগাযোগ বন্ধ করে, ঠিকানা অজানা রেখে নতুন ঠিকানায়। সেখানেও তুইই থাকবি তবে শুধু রাতের একাকিত্বে , ফোনের স্ক্র্রিনে কিংবা ফটো ফ্রেমে। থাকবে তোর আমার কিছু কল রেকর্ডিং , কিছু মুহূর্তের ডায়েরি বন্দি প্রতিচ্ছবি আর আমি। আগে থেকে যদিও কিছুই বলতে পারছি না, তবে বেশ কিছু দিন আমার আঙুলের ভাঁজে আর কাউকে মেনে নিতে পারবো না। Love is actually unpredictable . আজই হয়তো শেষ দেখা ছিল, “
বাকি লেখাটা একেবারে আবছা। পড়তে পারলো না আর সে। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো হটাৎ ” তাকে বলাও হলো না ” । দীর্ঘশ্বাসে যেন জীবন্ত হয়ে উঠল ফিকে কিছু মুহূর্তের ছবি। ধুলো জমেছে ফটো ফ্রেমে। ধুলো ঝেড়ে কিছুক্ষন ছবিটার দিকে একভাবে তাকিয়ে রইল রাহি।
এবারে আবার কলকাতা ফেরার পালা। ফিরতে চাই না কিন্তু,
” মা ! ও মা ! ” সকাল হতে না হতেই পাড়া মাথায় তুলে মায়ের খোঁজ পড়েছে মুখার্জি বাড়িতে।
রাতের ফ্লাইটে কলকাতা ফিরেছে রাহি। গত চার বছর তার পুজো কেটেছে বাড়ির বাইরে। কলকাতা র পুজো থেকে বঞ্চিত হয়ে মুখ গোমড়া করে শুধু ভিডিও কলেই দিন কেটেছে তার। পঞ্চমীর সকাল হতে না হতেই তার ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে কলকাতার বুকে। পুজোর মরশুমে ভোরের কলকাতার একটা তরতাজা মিষ্টি গন্ধ আর পুব আকাশে আলোর খেলা শুরুর ঠিক আগের মুহূর্ত গুলো থেকে বঞ্চিত ছিল সে এত বছর।
বাড়ির মূল ফটকের পাশেই তার নিজেরই পোতা শিউলী গাছটা আজ তার থেকে ফুট চারেকের বেশি লম্বা। ঘাড় উঁচিয়ে একবার দেখে নিতেই ভোরের ঠান্ডা বাতাসে শিউলীর গন্ধ মিশে তার নাকে এলো। ওদেশের ইট বালি সিমেন্টের গন্ধ মেখে যেন তার ঘ্রান শক্তি ই দুর্বল হয়ে গেছে।
মেয়ের ডাকে তড়িঘড়ি দোতলা থেকে সাড়া দিয়ে নীচে নেমে আসেন রঞ্জিনী দেবী। মায়ের চোখ আবেগে ভিজে। এক পলক দেখতেই জড়িয়ে ধরে রাহি কে। কিন্তু এদিকে মেয়ের দুহাতে লাগেজের ভারে কাঁধ ব্যাথা হয়ে গেল সেদিকে খেয়াল নেই। মেয়ের গলার আওয়াজ পেয়ে সিদ্ধার্থ বাবু অর্থাৎ রাহির বাবা ও এসে হাজির।
” আরে মেয়েটা এসেছে আগে ওকে আসতে দাও ভিতরে, দে ব্যাগ গুলো আমায়।” বলে  মেয়ের হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে ভিতরে রাখলেন তিনি।
বাঙালি পরিবারে মেয়ে আর বাবার রসায়ন টা বরাবরই একটু আলাদা। আর মায়ের পরিচিত ডায়ালগ ” খাওয়া দাওয়া করিস না ঠিক করে। বাড়িতে তাও জোর করে খাওয়াতে পারি, মুখ শুকিয়ে গেছে একেবারে ”  বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই যেন বাড়িটা আবার মেতে উঠলো, যেন প্রাণ ফিরে পেল। মা মেয়ের গল্প শেষ হচ্ছে না দেখে সিদ্ধার্থ বাবু বলে ওঠে ” আচ্ছা এবার ওকে ফ্রেশ হতে দাও, একটু বিশ্রাম নিয়ে নিক ।”
প্রায় বছর চারেক পরে নিজের ঘরে এলো রাহি। তার আসার খবর শুনে আগে থেকেই ঘর গুছিয়ে রেখেছে তার মা।
সকাল নামেনি তখনও ঠিক করে, উত্তরের জানলার বাইরে পুজোর জন্য লাইট গুলো তখনও জ্বলছে , তবে তেজ নেই রাতের মতন। কিছুটা যেন তারই গল্প। তার ও তো অভিমান রাগ মন খারাপের মেঘ রাত্রি নামলেই আসে। জানলার সার্শি ধরে দাঁড়িয়ে রইল সে কিছুক্ষণ। পাশের মাঠেই পুজোর প্যান্ডেল। রাস্তাঘাট তখনও বেশ শুন্য। কিন্তু মাইকে তখনও গান বাজছে , গানের লাইন গুলো বেশ কানে আসছিল তার
” ভুবন ভ্রমিয়া শেষে
আমি এসেছি নূতন দেশে,
আমি অতিথি তোমারি দ্বারে
ওগো বিদেশিনী॥
আমি চিনি গো চিনি তোমারে
ওগো বিদেশিনী।”
চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল রাহির। গাল ভিজল আবারও। ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে একটা নামে ” পল্লবী ” । অনুভূতি হিনের মতন একভাবে চেয়ে থাকে শুন্য রাস্তার দিকে। তার চেয়েও শুন্য আজ সে। কিছুক্ষণ পরে মায়ের ডাক শুনে চোখ মুছে সাড়া দিয়ে স্নানে যায় রাহি।
স্নান সেরে ঘন্টা খানেক ঘুমিয়ে নেয় সে। অল্যার্মে সকাল নটা বাজতে হাত মুখ ধুয়ে পুজোর জামা পরে রাহি। তার খাটের পাশে সকালেই মা রেখে গেছে।
মায়ের কাছে তার আবদার বরাবরের। তবে এবারে মেঘ না চাইতেই জল। চুল আচড়াতে তার ঘর লুচী ভাঁজা আর আলু ফুলকপির তরকারি র গন্ধে মম করে উঠতেই এক ছুটে রান্না ঘরে গিয়ে হাজির। বয়স তার উন্ত্রিশের গোড়ায় কড়া নাড়লেও মায়ের কাছে আবদার তার বছর তিনের মতনই। চুপি চুপি মায়ের পেছনে গিয়ে ফুলকো লুচি নিয়ে ছুট ছাদের ঘরে। পাশের ঘর থেকে তার বাবা সবটাই দেখছিল। মেয়ের পেছন পেছন সিদ্ধার্থ বাবুও যায় ছাদের ঘরে।
– কি রে রাহি !
– বাবা তুমি আজকেও ধরে ফেললে !
ঘরের পাশে রাখা একটা বেঞ্চে বসে দুজনে।
– হুম তা বটে। কিন্তু এখানে আসার কারণ কি শুধুই লুকিয়ে লুচি খাওয়া নাকি মন খারাপ ?
বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে রাহি।
– তুমি সবই বুঝতে তাই না বাবা ?
– তোর মনে আছে ! যখন তুই ক্লাস সেভেনে তোর পছন্দের রং পেন্সিল কিনে দিই নি বলে তুই এখানে এসে বসে ছিলি। তারপর যখন তোর জ্বরের জন্য রেজাল্ট খারাপ হলো। সেবার যখন দিঘা যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল হলো ! পল্লবীর বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ও তুই
– বাবা !
– বুঝতাম রে। কিন্তু তুই একাই যে এত কিছু সহ্য করতে পারিস জানতাম না। বরাবরই নিজের মধ্যে রাখিস সব কিছু। হয়তো আমরাই।
– না বাবা।
– তোকে কোনোদিন একা তোর মামাবাড়িতেও রেখে আসিনি। তোকে ছাড়া থাকা যায় না। কিন্তু কেন এত দূরে, আমাদের থেকে ছাড়লাম জানিস ? বুঝেছিলাম সেদিন যদি তোকে না ছাড়তাম এখানে অতীত আকড়ে হয়তো ভালো থাকতে পারতিস না। এখনো অতীত ঘাঁটিস জানি। তবুও নিজের একটা পৃথিবীতে আজ তুই। কিন্তু আর একা থাকিস না রাহি।
বাবার কথা শেষ হতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে রাহি। সিদ্ধার্থ বাবু মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,
– পুজোর সময় মন খারাপ করলে মা দুগ্গার ও মন খারাপ হবে , তাই না ? এত দিন পর ফিরলি। মন খারাপ করলে আমরা ভালো থাকবো কি করে বল !
বাবার কথায় চোখ মুছে উঠে বসে সে। ঠোঁটে মলিন হাসি। ইতিমধ্যে মায়ের ডাক এসে গেছে নীচ থেকে।
” সকালের খাবার রেডি। চলে এসো তোমরা। “
– চল, খেয়ে নিয়ে পাড়ায় বেরোবো।
ব্রেকফাস্ট সেরে উঠতেই অনুষ্কার ফোন। কলেজের সবথেকে কাছের বন্ধু অনুষ্কা। ওঠা বসা সব একসাথেই।
– হ্যাঁ রে বল !
– বল মানে ! তুই কলকাতায় এলি, আমরা জানলাম না ? কাকু না বললে তো জানতাম ই না।
– খেয়াল ছিল না রে।
– সে কেন থাকবে।
– আরে তা নয়।
– আচ্ছা শোন, অষ্টমী তে আমরা বেরোচ্ছি। আমরা মানে তুই ও।
– আমাকে প্লিজ
– দেখ তোর পেরমিশন নিচ্ছি না। সব ঠিক করা হয়ে গেছে। তুই আসছিস। আমি নিয়ে আসবো তোকে।
রাহি কে কথা বলতে না দিয়েই ফোন রেখে দেয় অনুষ্কা। পাশ থেকে বাবা এসে কাঁধে হাত রেখে বলে “ঘুরে আয় ভালো লাগবে। এখন চল বেরোবো।”
পুজোর সময় গুলো যেন বড্ডো তাড়াতাড়ি কেটে যায়। দেখতে দেখতে রাত নামলো। রাত পেরোলেই ষষ্ঠী। ডিনার সেরে ঘরে এসে ব্যাগের জামাকাপড় গুলো গোছানোর জন্য আলমারি খুলল রাহি। প্রথম তাকেই রাখা একটা ডায়েরি। একটু ধুলো জমেছে তাতে।
কলেজ জীবনে তার ডায়েরি লেখার অভ্যেস ছিল। বিশেষ মুহূর্ত গুলো যে পৃষ্ঠায় লিখে রাখতো সেখানে বুক মার্ক জুড়ে দিত। বুকমার্ক গুলো ও অর্ধেক ছিঁড়ে গেছে। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বুকমার্ক জোড়া। সেই সময়টা তেই তার আলাপ হয়েছিল পল্লবীর সাথে। সেম ব্যাচ। আচমকা আলাপেই ঝড়টা উঠেছিল বৃষ্টি ও নেমেছিল বেশ কয়েকবার। কিন্তু শেষ বেলায় শুধুই স্মৃতির মেঘ জমে পাল্লা ভারী করছে। বৃষ্টি নামার গল্প নেই। হাত দিয়ে ধুলো ঝেড়ে ডায়েরিটা নিয়ে বসে খাটে। পৃষ্ঠা উল্টে দেখতে গিয়ে কয়েকটা কবিতা আর তার কিছু লেখা চোখে পড়ে। হেসে ফেলে সে। একটা পৃষ্ঠায় দুটো কাগজ জোড়া, ভুরু কুঁচকে পড়তে বসে সে , সেখানে লেখা
“ব্যস্ততার অজুহাতে সম্পর্ক পুরোনো হয়। কথা ফুরিয়ে আসে, ধীরে ধীরে তার সবটা জানা হয়ে যায়। পরে থাকে ” কি করছো ” টুকু। সারাদিনের রোজ নামচা তেই সীমাবদ্ধ । যেন রুটিনে বাধা সময় টুকু তার জন্য। অভ্যাস থেকে সরে এসে দায় বদ্ধতায় থামে। কিন্তু অপর জন যদি তবুও তার প্রিয় উপন্যাসের পাতা জুড়ে নতুনের গন্ধটা আবার মাখতে চায়। নাটকের তকমা জুড়ে বসে অবশেষে। সেও ক্লান্ত, স্রোত হীন নদীতে নৌকা বইতে , আবার যদি হাল্কা স্রোত প্রতিকূলে হয় ! একার চেষ্টায় আর কতদুর। মাঝপথেই হার মেনে নিতে হয়। না চাইতেও অনেক কিছু ছেড়ে আসতে হয়। একা হয়ে যেতে হয়। নিজের কাছে তো পুরোনো র তকমা জুটবে না অন্তত।   সন্ধ্যে নামলেই জানলার ধার টা কেমন যেন টানে। বিষণ্নতা মাখানো আবার একটা সন্ধে নামে। রাত কাটে। ঘুম আসে কখন যেন !”
হয়তো প্রেমে পড়লে আর তাতে বিচ্ছেদ আসলে সত্যিই কবি কবি ভাব আসে।
ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি লেগে থাকলেও চোখের কোন তার ভিজে। যাকে ঘিরে এত স্বপ্ন ছিল, যাকে ঘিরে আবেগ সেই মানুষটা তখনও তার ছিল না আজ ও তার নেই। মানুষটা বরাবরই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে শুধুই কল্পনায়। ডায়েরিটা বন্ধ করে টেবিলের উপরে রেখে সেদিনের মতন ঘুমিয়ে পড়ল রাহি। সারাদিনের পর বেশ ক্লান্ত সে।
দেখতে দেখতে অষ্টমীর বিকেল। অনুষ্কার জেদ বসত রাহি রাজি হয়েছে।  একে একে সবাই আসছে। ঘড়ির কাটায় বার বার চোখ তার কিন্তু কারোর অপেক্ষায় নেই সে।
হটাৎ ই ভীড়ের মাঝে চেনা দুটো চোখ দেখতে পায় রাহি। মনের ভুল ভেবে এড়িয়ে গেলেও, শেষমেষ বুঝতে পারে সেটা তার মনের ভুল না। পল্লবী ! বয়সএর ছাপ খুব একটা পড়েনি। তবে চোখে মুখে হালকা ক্লান্তির ছাপ। রোগা হয়েছে অনেকটাই। চঞ্চলতা টাও যেন খুঁজে পেল না রাহি। চোখ দুটো ভীষণই শান্ত। খোলা চুল আর শাড়িতে বেসামাল অবস্থা আজও। রাহি কে দেখতে পেয়ে পল্লবী ও কিছুটা থমকে গেল।
একে একে সবাই এলে বাসে উঠে রওনা দেয় ওরা।
– না বসবো না ।
– রাহি ! বাসে ভিড় এতক্ষন সিট রাখতে পারবো না।
– রাখতে বলিনি তোকে।
– রাহি !
পল্লবীর জোর করায় তার পাশের সিটে বসে রাহি। পুরোনো অভিমান যেন তাকে আরো দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল সেদিন। এতদিন পরে যে তাদের আবার দেখা হবে , সেই প্রস্তুতি দুজনের কারোরই ছিল না। অনুষ্কার কথাতেই আসতে রাজি হয়েছল রাহি। কিন্তু এসে পল্লবীকে দেখে বেশ অস্বস্তিতে পড়েছিল সে। বন্ধু মহলে কেউই জানতো না তাদের বিষয়ে।
– কলকাতায় কবে এলি ?
– পঞ্চমী ।
– জানালি না একবারও।
– মনে হয়নি।
– হুম। কেমন আছিস ?
– ভালো।
– সত্যি !
– হুম।
– চলে গেলি কেন কলকাতা ছেড়ে ?
– বাইরে ভালো জব অফার ছিল।
– নাকি আমি ?
– মানে !
– চলে যাওয়ার কারণ কি আমি ?
– তুই নিজেকে এত গুরুত্ব কেন দিচ্ছিস বলতো ! তোর জন্য আমি থেমে থাকবো ?
এক গাল হেসে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে পল্লবী। চোখে মুখে নিস্তব্ধতা। কথা গুলো হারিয়ে যাচ্ছে যেন। অন্ধকার নেমে এসেছে হটাত করেই। অভিমান গুলো ভিজে আসছে রাহির।
– Sorry
বলে ওঠে রাহি।
অবাক হয়ে তাকায় পল্লবী।
– ধুর । অভিমান হওয়া স্বাভাবিক। Sorry তো আমি
– কেমন আছিস তুই ?
– ভালোই।
– রোগা হয়ে গেছিস।
– তুই ও তো। আগে বেশ গলু মলু ছিলি।
– সেই রে।
– কি তাই তো ! বাচ্চা ছিলি একদম।
এত বছর পর পল্লবীর ঠোঁটে হাসি দেখল রাহি। জমানো মন খারাপ যেন নিমিষে উধাও। বাস থেকে নেমে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে সবার সাথেই মিশে গেছিল দুজিনে। শুধু মাঝে কয়েকবার পল্লবীর হাতে হাত পরে গেছিল রাহির। বুঝতে পেরে হাত সরিয়ে নেয় যদিও। সময় টাও যেন দ্রূত কেটে গেল ওদের। ঘড়ির কাটায় সন্ধ্যে আটটা। এবারে বাড়ি ফেরার পালা। রাহি আর পল্লবীর বাড়ি এক ই পাড়ায়। পল্লবীর উপরে দায়িত্ব দিয়ে অনুষ্কা নিজের বাড়ির দিকে রওনা হয়। রাহি আর পল্লবী একে ওপরের চোখ চাওয়া-চাওই করতে থাকে।
– চল !
– হ্যাঁ।
হাটা পথ । মেইন রোডে ভিড় থাকলেও গলির দিকটায় জনস্রোত ততোটাও নেই। বেশ ফাঁকা। পাশা পাশি হাটলেও সেদিন হাত ধরার অনুমতি নেই। কিন্তু মন তো চায় জড়িয়ে ধরতে একবার। হয়তো শেষবার। কিন্তু ভুল সেটা। আঙুলের ভাঁজেও শুন্যতা। দুজনের কেউই কোনো কথা বলছে না। হটাৎ ই পল্লবী বলে ওঠে।
– একা ?
পল্লবীর প্রশ্নে অবাক হয়ে তাকায় রাহি। পল্লবী আবার বলে ,
– মানে সম্পর্কে আছিস ?
– না ।
– কেন ?
– কেন মানে !
– এমনি।
– ভালো লাগেনি তেমন কাউকে।
– হুম। লেখা লেখি করিস এখন !
– না।
– কেনো ?
– ইচ্ছে করে না। আর আমি এখন বছর কুঁড়িতে আটকে নেই যে বসে বসে কবিতা লিখবো।
– অভিমান জমেছে না ?
– কি !
– রাগ করেছিস ভীষণ রাহি ?
– সেই অধিকার কোনোদিন আমার ছিল না ।
– আজ আছে ?
– মানে ?
– তাহলে আজ ও অভিমান জমিয়ে রেখেছিস যে।
– পল্লবী ! অভিমান না। ভালোবেসেছিলাম। সীমাবদ্ধতা জানতাম। তবুও
– ভালোবাসতে নেই রাহি।
– সেটা অজান্তে হয় পল্লবী। তুই কোনোদিন ও আমাকে ভালোবাসিস নি ? একবারের জন্যও !
– একবারের জন্য শুধু ভালোবাসা যায় না।
– বল না। আজকে বল। আজ তো আর কিচ্ছু হওয়ার নেই।
সবটাই শেষ।
– উত্তর নেই রে। যদি উত্তর খুজঁতে হয়, আবার ফিরে যেতে হবে।
– ঠিকাছে।
আবার নিস্তব্ধতা। দুজনে হেটে চলেছে পাশাপাশি। হলুদ আলগুলো রাস্তার উপর আলো ছায়া খেলছে। ঘড়ির কাটায় রাত নয়টা ছুঁই ছুঁই। পাশের মানুষটা যে তার নয় রাহি কিছুতেই মানতে পারছে না। একবার হাত ধরতে ইচ্ছে করছে। নিজের করে নিতে মন চাইছে। কিন্তু আজ তারা দুজন দুই মেরুতে।
– পল্লবি !
– বল
– তুই জানিস, তোকে ঘৃণা করা যায় না ! তুই একটু খারাপ হতে পারতিস তো ! এত ভালো কেন তুই ? তাহলে অন্তত তোর উপর রাগ করতে পারতাম, তোকে ভুলে থাকতে তোকে দোষ দিতে পারতাম। অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারতাম। কেন ভালো রাখলি আমাকে ?
রাহির কথা শেষ হতেই রাহি কে জড়িয়ে ধরে পল্লবী। রাহির শরীর অবশ হয়ে আসতে থাকে। ধীরে ধীরে পল্লবীর ঘাড়ে মুখ গুঁজে দেয় সে। জড়িয়ে ধরে চোখ ভিজে আসে তার। এবারেও এত বছর পরেও পল্লবীর কাছেই তার সব অভিমান রাগ হেরে গেল।
পল্লবী বলে,
– আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা জানি রাহি। হাত ধরতে পারিস। আমাকে বাড়ি অব্দি পৌঁছে দে আজকে !
ওরা জানে আজ ওদের মধ্যে নতুন কিছু সম্ভব নয়। কিন্তু এই মুহুর্ত টুকুই রাহি কে বাঁচিয়ে রাখবে অভিমানের যন্ত্রনা ভুলিয়ে।
দুজনে হেটে চলেছে, অবশেষে পল্লবীর আঙুলের ভাঁজে রাহির আঙুল। দুজনে একটু কাছাকাছি। পাশের প্যান্ডেলের মাইকের আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে ভেসে আসছে।
“Hum tum kitne paas hain
Kitne door hain chaand sitare
Sach poochho to man ko Jhoote lagte hain yeh saare
Magar sachche lagte hain
Yeh dharti, yeh nadiya, yeh raina
Aur, aur tum”
শেষটা ! না হয় না হোক।
©সুস্মিতা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here