Saturday, December 3, 2022

না বলা কথাগুলো

কি ভাবছেন ! পুজো পুজো মরশুম, হওয়ায় ছুটির আগাম মেজাজ। এই তো হাতে গোনা আর কয়েকটা দিন মাত্র।  তারপরেই ওই বিশেষ পাঁচ দিনের রোজনামচার খাতায় জুড়বে, সকালের এক্সট্রা আরো পাঁচ মিনিটের ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই পাড়ার মণ্ডপ থেকে ভেসে আসা সেই পরিচিত লাইন ” আমাদের মণ্ডপের ষষ্ঠী পূজো আর কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হতে চলেছে” আর পুরো লাইন শেষ হতে না হতেই দরজার ওপার থেকে মায়ের ডাক শুনতে পাওয়া যাবে। পুজোর কটা দিন যে একটু ছাড় পাওয়া যাবে ভাবছেন, সেটি হচ্ছেনা এবারেও। অগত্যা সেই এক্সট্রা পাঁচ মিনিটের ঘুমটা কাটিয়ে উঠে বসে চট জলদি তৈরি হয়ে নিতে হবে কেননা, ততক্ষণে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বাবার ডাক পরে গেছে। আবার ব্রেকফাস্ট করতে বসেও শান্তি নেই। ঠাকুর দেখার অজুহাতে পুরোনো বন্ধুদের সাথে আবার একবার দেখা করার উদ্দেশ্যে যে Whatsapp গ্রুপ খোলা হয়েছিল, তাতেও ভিড় জমবে ” কিরে কখন বেরোচ্ছিস !”,” কে কোথায় দাঁড়াবি ?”,” এই আজ কিন্তু সাউথ কভার করতেই হবে”, আবার এরই মাঝে কেউ বলে উঠবে ” শোন না, আজ ও আসবে বলছে, মানে,আমাদের সাথে যাক না আজকে , প্লিজ। ” ব্যাস এর পর আরো গতি বাড়বে বন্ধুদের টাইপিং স্পীড আর ভিড় জমাবে নোটিফিকেশন। কিন্তু অবশেষে যা বুঝবেন, তা হলো, সবাইই আসছে জোড়ায় জোড়ায়। কেবল আপনি ই আসবেন এক শালিখ হয়ে।
কি মুড টা গেল তো বিগড়ে ? কেনো বাবা, তোরা প্রেম করবি অষ্টমী তে শাড়ি-পাঞ্জাবিতে অঞ্জলীর বাহানায় কর না। কিন্তু না, সেটি এবারও হবে না। আপনি এবারও সিঙ্গেল ই থাকছেন ।
এবাবা, আপনাদেরকে তো গল্পের নায়িকার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি। যাকে নিয়ে এই গল্পটা,সেই এক শালিখ। মানে সোহাগ বোস। আর এই গল্পটা সোহাগের।
গল্পটা গত বছরের ষষ্ঠীর। পুজো স্পেশাল রোজনামচার খাতার সকালের চেকলিস্টের চার কোনা বাক্সে টিক চিন্হ বসিয়ে শুরু হলো দুপুরের নতুন চেকলিস্ট। ব্রেকফাস্ট সেরে, অনবরত আসতে থাকা নোটিফিকেশনের ভিড় কাটিয়ে অবশেষে রেডি হল সোহাগ। অপূর্ব এসে পরেছে ইতিমধ্যে।
অপূর্ব , সোহাগের সেই ছেলে বেলার বন্ধু। একসাথে স্কুল এবং কলেজেও। একই পাড়াতেই থাকে দুটো বাড়ির পরেই।
– পনেরো মিনিটের উপর দাঁড়িয়ে ভাই, চল এবার।
– sorry sorry, চল চল।
– তোর লেট করে আসার স্বভাবটা এখনো গেলো না। সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম ঠিক এখানে তোর বাড়ির নীচে, কখন আসবেন আপনি তারপর স্কুল যাবো। আর আজও তোর লেট ! আর কলেজে তো আমায় আর প্রয়োজন হতো না আপনার। আপনি তো,
– এই চল তো চুপ করে। আর দেখ দেরী করে এলাম বলে স্মৃতি রোমন্থন করতে পারলি তো বল !
বলে একটা মিষ্টি হাসি হেসে গাড়িতে উঠে পরে দুজনে।
গাড়ি স্টার্ট দিলো অপূর্ব। স্কুলের শেষ দিনে শার্টে  বন্ধুদের শুভেচ্ছা সাথে কিছু প্রমিস লিখে গেটের বাইরে বেরোনোর পর থেকে আর কারোর সাথে স্কুলের পথ ধরে হাঁটা হয়নি, রাস্তার মোড়ে অপেক্ষারাও আর অপেক্ষা করে থাকেনি, বাতিলের খাতায় উঠেছিল স্কুল ড্রেস গুলো। স্কুল কলেজের গন্ডি পেড়িয়ে সবাই ই এখন কর্মক্ষেত্রের নতুন ব্যাস্ততায় আবদ্ধ।  কিন্তু বছরের এই সময়টাতে প্রতিবার হাজার ব্যস্ততা সত্বেও সবার একসাথে অন্তত একটা দিন ঠাকুর দেখা আর ফিরে দেখা পুরোনো স্মৃতি।
আর কারো সাথে তেমন যোগাযোগ না থাকলেও অপূর্ব র সাথে যোগাযোগ টা বেশ ভালোই থেকে গেছে সোহাগের।



– এই শোন না,  অর্পিতা কোথা থেকে উঠবে ?
– অর্পিতা গাড়িয়াহাট মোড়ে দাঁড়াবে আর মৈনাক, রাই দক্ষিণাপন থেকে উঠবে, আর
– আর ?
– তোকে একটা কথা জানানো হয়নি। হয়তো জানালে তুই আসবি না ভেবে বলতে পারিনি।
– কি কথা !
– রোহিনী আসছে।
রোহিনী আসছে শুনে খানিকটা থমকে যায় সোহাগ। অন্যমনস্ক হয়ে জানলার কাঁচের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে । অন্যমনস্ক হয়ে কখন যেন বলে ফেলে ,
– শরতের মেঘেও তবে বৃষ্টি নামে।
– হ্যাঁ ! কিছু বললি ?
– নাহ।
– রাগ করিস না রে প্লিজ। এত বছরে ওর সাথে আর যোগাযোগ ছিল না। হটাৎ সেদিন বললো কলকাতা ফিরছে। কিভাবে না করি বল। আমাদের বন্ধুত্ব টা তো
– আমি কিছু জানতে চাই নি তো ।
রোহিনী, রোহিনী শর্মা। ওদের তখন ফার্স্ট ইয়ার। এডমিশন ডেস্কে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে। খোলা হালকা কুকরানো চুল। হাটু অব্দি কুর্তি আর একপাশে ওড়না । সেই ওড়না নিয়ে রীতিমতো ব্যতিব্যস্ত হয়ে সে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন এর জন্য দাঁড়িয়ে কাউন্টারের সামনে।
আর ওদের পরিচয়ের সূত্রপাত টাও সেখান থেকেই।
ঘন্টা খানেকের মধ্যে ওরা পৌঁছায় ওদের ডেস্টিনেশন ত্রিধারা। এখান থেকেই শুরু করবে ওদের ঠাকুর দেখার যাত্রা। প্রায় প্রত্যেকেই এসে পড়েছে। তবে রোহিনী তখনো এসে পৌঁছায়নি।
গাড়ির কাঁচ নামিয়ে আলতো বৃষ্টি মাখা ক্লান্ত প্যান্ডেল গুলোর দিকে তাকিয়েছিল সোহাগ। রঙিন আলো গুলোও তার কাছে কেমন ফিকে ঠেকছিল। অপূর্ব আর মৈনাক ব্যস্ত তাদের গার্লফ্রেন্ড দের সাথে। ঘড়ির কাটায় প্রায় সাড়ে ছ-টা। একটা ভিড় বাস এসে দাঁড়িয়েছে তাদের গাড়ির ঠিক বিপরীতে। বাস টা চলে যেতেই সোহাগ খুঁজে পেল তার খুব পরিচিত চেনা দুটো চোখ। ভিড়ের মধ্যেও ওই মানুষটাকেই যেন শুধু সে দেখতে পারছে। সে ব্যস্ত বাসের ভিড়ে তার কুঁচকে জাওয়া শাড়ির আঁচল ঠিক করতে। সেই হালকা কুকরানো চুল, কানে  ঝুমকো। “ওর এখনো নীল রং পছন্দ ! ” মনে মনে বলে ওঠে সোহাগ। সব চেয়ে বেশি পরিচিত মানুষটা যে কতটা অপরিচিত হয়ে যেতে পারে, ওদের মধ্যে দুরত্ব না এলে জানতেই পারতো না সোহাগ। রাস্তা পার করে এসেই দুজনের চোখে চোখ পড়ে যায়। একটু অপ্রস্তুত হয়েই রোহিনী এগিয়ে যায় অপূর্বর দিকে।



পরের সময়টুকুতে আর ওদের কোনো কথাই হয়নি। অপুর্ব কে পেছনে বসতে বলে নিজে ড্রাইভ করার সিদ্ধান্ত নেয় সোহাগ, এদিকে সোহাগের পাসের সিটে বসেছে রোহিনী। গাড়ির কাঁচ খোলা তাই চুলের উন্মুক্ততা সামলাতে তার অসুবিধে হচ্ছে বুঝে গাড়ির কাঁচ তুলে এসী অন করে দিল সোহাগ। নীল শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে নতুনত্বের গন্ধ সাথে মিশে তার খুব চেনা রোহিনীর গায়ের পরিচিত গন্ধটা। মাঝে মধ্যে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল সোহাগ।
কেটে গেছে বেশ কয়েক ঘন্টা। গোটা ছয়েক প্যান্ডেল ঘুরে ক্লান্ত পায়ে সবাই এবার জিরিয়ে নিতে চায় কিছুক্ষণ।
অন্য সময় হলে শহর এখন ঘুমের চাদর মুড়ত। কিন্তু এই সময়টাতে যেন সবে সন্ধ্যে নেমেছে। ঘড়ির কাটায় রাত একটা। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি বলে মৈনাক আর অর্পিতা গেছে কিছু কিনে আনতে। বাকিরা প্যান্ডেলে বসে। ইতিমধ্যে রাইও গেছে একটু ফ্রেশ হতে, কিন্তু সে গিয়ে আরেক কেলেঙ্কারি। তিনি নাকি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন অগত্যা অপূর্বর ডাক পড়েছে। বাকি দুজন বসে পাশাপাশি চেয়ারে। রোহিনী আর সোহাগ।
কলেজে এই জুটিটা খুব একটা কেউ ভালো চোখে না দেখলেও ওদের মধ্যে খুব একটা জটিলতা ছিল না। সোহাগ ছিল বরাবরের জেদি আর একগুঁয়ে আর রোহিনী শান্ত স্বভাবের।
কিন্তু ওদের বিচ্ছেদটা ওদের বন্ধুত্ব ওদের একসাথে ওঠাবসা সবটার ইতি ঘটিয়েছিল এক নিমিষেই।
ওরা তখন থার্ড ইয়ার।
রোহিনী আর সোহাগ কোনোদিন দুজন দুজনকে ছাড়া কলেজে আসতো না। কিন্ত সেদিন সোহাগ কে না জানিয়েই রোহিনী আসেনি কলেজে। বাড়ি ফেরার পথে ঠিক করে সে দেখা করে তবে ফিরবে।
অগত্যা যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ক্লাস শেষ হতেই ছুট দিল রোহিনীর বাড়িতে। নিজের ঘরের ব্যালকনিতে একা বসে সে।
সোহাগ এগিয়ে গেলো তার দিকে।
– কি ভাবছিস রোহিনী ?
সোহাগের গলা শুনে একটু অন্যমনস্ক হয়ে তাকায়। তারপর বলে
– কিছু না তো।
– কি হয়েছে রে তোর ? আজ গেলি না কেনো ! প্রাকটিক্যাল ছিল তো।
– এমনি। ভালো লাগছিলো না।
– এক্সাম এর আগে প্রাকটিক্যাল মিস করবি তুই ?
– তাই বলতে এসেছিস নাকি তোকে বলিনি কেন যে আজকে যাবো না সেটা বলতে ?
– জানিসই যখন তাহলে বল কেন জানাসনি আমায় ! জানিস না তোকে ছাড়া ভালো লাগে না আমার একা ।
–  আমার অভ্যাস আর বাড়াস না সোহাগ।
– তুই থাকতে, তুই না থাকার অভ্যাস কেন করবো ?
– আমি যদি না থাকি !
– মানে ! কি হয়েছে বল তো আগে।
– জানি না রে, ঠিক লাগছে না কিছু। I think it’s not working .
– কোনটা !
– এই যে আমি আর তুই। আমরা কি ভালো আছি সোহাগ ?
– হঠাৎ বলছিস ! তুই ঠিক আছিস তো রোহিনী !
– তুই ভালো আছিস আমার কাছে ?
– হটাৎ বলছিস কেন আজকে এসব ! কি হয়েছে তোর ?
– I think I’m not a good partner সোহাগ। ভালোলাগছে না রে এভাবে সবার আড়ালে সম্পর্ক টা এগিয়ে নিয়ে যেতে। আমি এটাই sure নই আমি কি তোকে ভালোবাসি নাকি শুধুই বন্ধুত্ব !
– কি বলছিস রোহিনী !
– হ্যাঁ সোহাগ। আমি বুঝতে পারছি না রে।
কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে এসে বসে রোহিনীর পাশে। রোহিনীকে আজ ভীষণ অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।
সোহাগের হাত টা ধরে রোহিনী। সোহাগ তখন মাথা নিচু করে বসে। চোখের কোন ভিজে আসছে হয়তো ওর অজান্তেই। ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে রোহিনী।
– কষ্ট দিলাম বল কথা গুলো বলে !
– আমি কি যোগ্য নই তোর ?
– যোগ্যতার জন্য নয় রে। আমি বুঝতে পারছি না কিছু
– আমি কি জোর করছি তোকে রোহিনী ?
– না রে। I just need a break.
ব্যাস তারপরে আর কথা হয়নি ওদের। অনেকবার ফোনে, whatsapp এ এমনকি ফাইনাল ইয়ারের পরিক্ষা র সময়েও রোহিনী কথা বলতে চেয়েছে, কিন্তু সোহাগ এড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে সোহাগ রাতের পর রাত জেগেছে শুধু একটাই উত্তর খুঁজতে ” আমি কি তবে ভালোবাসতে পারিনি তোকে, রোহিনী ? “
প্যান্ডেলে পাশাপাশি বসে এত বছর পরও দুজন দুজনের কাছে নীরব।
সারাদিনে জল টুকু খাওয়া হয়নি ওদের। রোহিনী উঠে গাড়ি থেকে বোতলটা নিয়ে এসে বসে। সোহাগের দিকেও এগিয়ে দেয় বোতলটা।
– সারাদিন জল খাস নি। খেয়ে নে একটু।
রোহিনীর হাত থেকে বোতলটা নেয় সোহাগ।
– কেমন আছিস ?
জিজ্ঞেস করে রোহিনী
– ভালো। তুই বল।
– আমিও।
– কি করছিস এখন !
– ব্যাঙ্গালোর থেকে MBA করেছিলাম। এখন একটা প্রাইভেট কোম্পানি তে আছি ওখানেই।
– কাকু কাকিমা কেমন আছে ?
– ওরা ভালোই আছে। চাকরি পেয়ে মা বাবা কে নিয়ে গেছিলাম ওখানে।
– হুম, জানি।
– জানি মানে ?
– দেখেছিলাম। এসেছিলি তুই।
– তুই কিভাবে ?
– আমার অফিস ভবানীপুরে। তোর বাড়ি থেকে মিনিট দশেকের।
– একবার দেখা করে যেতিস।
– ইচ্ছে করছিল । তবে
– জানি।
– কাকু কাকিমা এসেছে !
– হ্যাঁ। মা ই বললো এবার পুজোয় কলকাতা আসবে। তাই
– হুম। রোহিনী !
– বল।
– কচুরি খাবি ?
– হ্যাঁ ! এখন ? রাত দেড় টা বাজে সোহাগ।
– পাবোনা এখন ?
– দুপুর থেকে না খেয়ে এই মাঝ রাতে তুই কচুরি খাবি ?
– তাহলে ! খিদে পেয়েছে ।
– অপূর্ব রা কোথায় গেল বলতো অর্পিতা কে খুঁজতে ! ও এলে বলছি। দাঁড়া একটু।
– না আমার খিদে পেয়েছে। কিছু খাবো।
– রোল খাবি !
– না। আইসক্রিম ?
– ওতে পেট ভরবে পাগল !
– হ্যাঁ। প্লিজ প্লিজ।
– তোর স্বভাব যায়নি এখনো রে। অসময়ে ভুল ভাল খাস এখনো ?
– অভ্যাসটাও তো ।
ভীষণ সাবলীল ভাবেই কথা বলছিল সোহাগ আর রোহিনী। কিন্তু হঠাৎ যেন সোহাগ চুপ করে যায়। ভিড় কমেছে বেশ অনেকটা। প্যান্ডেলের মাইকের আওয়াজ ও ক্ষীণ হয়ে আসছে। ট্রাফিকের ব্যস্ততাও খানিকটা কম। প্যান্ডেলের বাইরে দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসে দুজনে। তাও প্রায় আধ ঘন্টা হবে ওরা গেছে অর্পিতাকে খুঁজতে।
– রাগ করে আছিস এখনো ?
মাথা নামিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে রোহিনী।
উত্তর দেয়না সোহাগ, বরং প্রশ্ন এড়িয়ে বলে ওঠে,
– কতদিন আছিস কলকাতায় ?
– দশমীর পরেরদিন ফ্লাইট।
– বই পড়ার অভ্যাস আছে এখনো ?
– হ্যাঁ কম বেশি।
– আমিও , আর সময়ও পাই না।
– আমি উত্তর পেলাম না সোহাগ।
– সে বার তোর জন্মদিনে যে বইটা দিলাম, সেটা কেমন লেগেছিল ? আর জানার সুযোগ হয়নি। প্রথমবার বই কিনেছিলাম তোর জন্য। তাই
আবার রোহিনীর প্রশ্ন এড়িয়ে যায় সোহাগ ।
– এড়িয়ে যাচ্ছিস ?
– কি !
– আমায় ?
– কই না তো।
– তোর সাবলীল ভাবে কথা বলার এই ধরণটা আমার খুব চেনা জানিস তো। পাহাড় সমান অভিমান, অভিযোগ জমিয়ে রেখে যখন কথা বলিস, তখন ঠিক এরকম শোনায়। কথা বল সোহাগ। বলতে শেখ। সব কিছু আড়ালে রাখতে গিয়ে আজ আমাদের মাঝে
বলতে গিয়েও থেমে যায় রোহিনী। অজান্তেই চোখের কোন ভিজে এসেছে তার। সোহাগ অবাক চোখে তাকিয়ে। এখনো তার স্বভাব আচরণ মনে রেখেছে রোহিনী ! নিজেকে প্রশ্ন করে।
– সোহাগ !
– বল।
– কেনো এখনো এত একগুঁয়ে তুই ? বুঝিস না কিছু। বুঝতে চাস না কিছু। নিজের মন গড়া ভেবে নিয়ে চাপিয়ে দিস। সেটা সত্যি না হলেও জোর করে নিজের কাছে সত্যি প্রমান করে নিজেই কষ্ট পাস। কখনো শুনতে চেষ্টা কর । অন্তত একবার। সবটা তুই নিজে থেকে জানতে পারিস না সোহাগ।
– হুম।
– তোকে বুঝিয়ে লাভ নেই। তুই বুঝবি না। এত গুলো বছরে যখন বুঝিস নি, সম্পর্কে থেকেও যখন বুঝতে চাসনি। এখন আর । যাই হোক। তুই বোস। আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি।
উঠে যেতে চায় রোহিনী। ঠিক সেই মুহূর্তে রোহিনীর হাত ধরে আটকে দেয় সোহাগ। উঠে দাঁড়িয়েছে সেও।
রোহিনী একটু বিরক্তি বোধ করে।
– কি হয়েছে ?
– তোর কানের দুলটা খুলে পরে গেছিল।
সোহাগের অপ্রত্যাশিত কথায় আরো বিরক্ত হয়ে যায় রোহিনী।
– ধুর। ভাল্লাগে না। তুই কি কোনোদিন সিরিয়াস হবি না ? তোকে আমি বোঝাতে চাইছি। আর তুই !
– আমিও তো বোঝাতে চাইছি।
– কি ?
– খিদে পেয়েছে।
– ধুর , যা তো এখান থেকে। সহ্য হচ্ছে না তোকে।
– বলছিস ?
– কি !



– আমায় সহ্য হচ্ছে না ?
– না হচ্ছে না। সেদিনও শুনতে চাস নি। আর আজ ও।
– আমি আজ দেখাও করতে চাইনি।
– আমি তো বলিনি তোকে আসতে। even আমি নিজেও জানতাম না।
– আসতাম না। শুধু একটা কারণে এসেছি।
– কি কারণ !
– জানতে।
– হেয়ালি করিস না। বিরক্ত লাগছে।
– এইটাই জানতে। যে এখনো তোর বিরক্তির কারণ আমিই কিনা।
– তোর বাজে বকার স্বভাবটা কোনোদিন যাবে না ?
– বাজে না বকলে যে তুই বিরক্ত হবি না।
– উফফ। প্লিজ থাম। ভালো লাগছে না।
– আমাকে ?
– হ্যাঁ।
– শোন। সেদিন আমি শুনতে চাইনি। আমি বরাবরই জেদি। জেদের বশে ভুল করি। সেদিনও করেছিলাম। অভিমান অভিযোগ কিছু নেই জানিস রোহিনী। শুধু আপসোস আছে। সেদিন যদি তোকে বুঝতে পারতাম। তাহলে এই এতগুলো বছর তোর থেকে দূরে থাকতে হতো না। কিন্তু এই জেদ অভিমান টাও তো শুধু তোর কাছেই রাখতে পারি রোহিনী। সেটা বুঝলি না ? আজ এত বছর পরেও তোর রাগ হলেও তোকে রাগিয়েছি। এই অধিকারটা তো এখনো আমারই আছে। এই comfort zone টা আমাদের আছে। তুই যদি সত্যিই বিরক্ত হতি তাহলে তুই উঠে চলে যেতিস। কিন্তু তুই যাস নি। এত গুলো বছর যেখানে আমি ভেবেছিলাম তোকে হারিয়েছি। কিন্তু আমি তো হারাইনি। শুধু আমাদের অনেকটা সময় হারিয়ে গেছে।
রোহিনী আর কিছু বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সোহাগ কিছুক্ষণ থেমে , হাটু গেড়ে বসে রোহিনীর সামনে।
– শোন, এবার যা ঝগড়া রাগ অভিমান মন খারাপ আছে আমার সাথে ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে করবি। রাজি ?
– কি ! ব্যাঙ্গালোর ?
– হ্যাঁ। ব্যাঙ্গালোর।
– মানে ?
– মানে আমি যাচ্ছি তোর সাথে।
– তোর অফিস।
– ট্রান্সফার এর চেষ্টা করবো ছুটির পরে। না হলেও চাকরি ছেড়ে যাবো। ওখানে গিয়ে চেষ্টা করবো। কিন্তু তোকে আর ছাড়ছি না।
– এই তুই পাগল !
– সে তুই কবে আমায় পাগল করে গেলি। আর তো ঠিক হলাম না।
– আচ্ছা বেশ। তাহলে সুস্থ করে দিচ্ছি।
– প্লিজ অনেক করেছিস। আর কিছু করতে হবে না। শুধু আমার টিকিট টা কাট ফ্লাইট এর।
– কিন্তু সোহাগ
– এই ভাই আর কোনো কিন্তু না। আমি যাচ্ছি তোর সাথে
– না সোহাগ। তুই আমার একটা কথা শোন
– বল বল কি হয়েছে ?
কিছু একটা বলতে যাবে, রোহিনীর ফোনটা বেজে উঠলো।
– হ্যালো ! হ্যাঁ বলো। না এখনো ফিরিনি । তুমি ঘুমিয়ে পরো। ফিরে ফোন করবো। good night
সোহাগ – কে ফোন করেছিল রে !
রোহিনী – সুদীপ।
– সুদীপ কে ?
রোহিনী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
– সোহাগ ! একটা কথা বলতে চাই আজকে তোকে।
– কি হয়েছে রোহিনী !
– নেক্সট মাস এ আমার বিয়ে। সুদীপ আমার fiance । তোকে সবটা আমায় জানাতেই হতো, তাই আজকে।
সময়টা যেন থমকে যায় সোহাগের। রোহিনীর কোনো কথা আর তার কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না। এক দৃষ্টে তাকিয়ে রোহিনীর চোখে। রোহিনী আর সোহাগের দিকে তাকিয়ে থাকতে না পেরে মাথা নামিয়ে নেয়।
সোহাগও আর কিছু বলে না। কথারা হারিয়েছে তখন। রাতের নিস্তব্ধতা যেন জাঁকিয়ে বসেছে তাদের।
সোহাগ এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে। দরজা খুলতে খুলতে একটাই কথা শেষ বারের মতো বলে সে রোহিনী কে ।
কখনো কাউকে একা ভালোবেসেছিস রোহিনী ?
ভালো লাগা, ভালোবাসা সবটাই হারিয়েছি আমি তোকে ভালোবেসে। তোর যদিও সেটা জানার কথা নয়, কারণ আমিই তোকে বুঝতে দিতে চাইনি। ভয় পেয়েছি আমায় ভালো রাখার জন্য যদি তুই চলে যেতে চাস। কিন্তু এই যন্ত্রনা টা তুই না থাকলে আরো বেশি যে বাড়বে। তুই থাকলেও বাড়বে তবে তোর উপস্থিতি টুকু সেই জখম লঘু করবে। কিন্তু তুই না থাকলে তো।
ভালোবেসে ভুল করিনি । ভুল করেছি আমি একা ভালোবেসে। ধরে রাখতে গেলে যে দুজনকেই ভালোবাসতে হয় সেই সময় বুঝিনি। ক্রমে দুর্বল হয়েছি। আর আজও। যেদিন থেকে বুঝেছি তুই পারবি না আমায় ভালোবাসতে। সেদিনই আমার সরে যাওয়া উচিত ছিল। এখন আমি নিজের সাথে তোকেও ভালো থাকতে দিচ্ছি না।
আমার অভিমান গুলো জমে পাহাড় হচ্ছে, এখন তো সামলে নিচ্ছি। কিন্তু দিন গুনছি কোনদিন ধস নামবে। চাপা পরে যাবে আমাদের ভালোথাকার মুহূর্ত। কেবলই ধ্বংসাবশেষে খুঁজে পাবো তোর আমার জরাজীর্ণ সম্পর্ক। যার কোনো ভীত নেই।
চাইনা আমাদের মুহূর্ত গুলোর ইতি এভাবে হোক। তাই নিজে থেকেই তোর অজান্তে চলে যাবো অনেক দূরে। যেখানে আমি থাকবো, আমার অনুভূতি থাকবে। শুধু তুই আর জানবি না। তোর অভ্যাসের যতটুকু আমি ছিলাম। সেটুকুও আর আমার নামের হবে না। আঙুলের ভাঁজে আমাদের আঙ্গুলের সাবলীল কথা গুলোর তখন ইতি হবে। আর দুজন দুজনের হাত ধরবোনা। পাশাপাশি থাকবো, পাশে থাকবো তোর,  তবে সমান্তরালে। আমার কাঁধে তোর অধিকার হতে পারতো, কিন্তু হলো না, সেই অভিযোগ ও রাখবো না। জানতে দেবো না, কিছু।
কথারা হারিয়ে যায় তোর কাছে এলে। এভাবেই জমছে অভিমান আর অভিযোগের পাহাড়। কথা বলা দরকার জানি আমিও, কিন্তু সবটা যে শেষ হয়ে যাবে বললেই।
অগত্যা অপেক্ষা। তোর অপেক্ষা , তোকে না পাওয়ার অপেক্ষা, সবটাই আজ কেমন যেন শরতের আকাশে নিম্নচাপের মতন।
কোনো রকম যোগাযোগ আর রাখেনি সোহাগ। সে দূরেই থাকতে চেয়েছে। সে কাছে থাকলে কাছের মানুষটাও ভীষণ রকম আঘাত পাবে, কারণ সেই মানুষটা এই সোহাগের সাথে অভ্যস্ত নয়।
পুজোর আমেজেও এক রকম মন খারাপ মিশে থাকে
এই জন্যই হয়তো ছেলে বেলাটা বড্ডো ভালো ছিল। কতক্ষণে বাবা অফিস থেকে ফিরে ঠাকুর দেখতে নিয়ে যাবে, অপেক্ষা টা অতটুকুই। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে যে মনের জটিলতা বেড়েছে, যার ফল স্বরূপ হাজার হাজার আলোর ভিড়ে নিজের নামের একটুকরো অন্ধকার।
আজও আবার একটা ষষ্ঠী। তারপর একটা গোটা বছর কেটে গেছে। ইতিমধ্যে বিয়েও হয়ে গেছে রোহিনীর । ওরা দুজনে আসবে আজ। প্রতিবারের মতন এবারে আমায় খুব একটা জোর করেনি অপূর্ব, ওদের সাথে বেরোনোর জন্য।
তাহলে এই পরিস্থিতিতে আপনাদের কি মনে হয় ! Should I face the circumstances , and moved on ? Or Stay in distance with the intense love in pain with her ?
~ সুস্মিতা সাহা

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

562,000FansLike
79,200FollowersFollow
376FollowersFollow
- Advertisement -spot_img

Latest Articles

error: Content is protected !!