ভোর তখন পাঁচটা হবে। বাইরে নীলাভ অন্ধকার। তার সাথে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা। আমার বোনকে দুবার ডাক দিলাম, কারন আগেই বলেছি আমরা কোথায় কিভাবে ঘুরব সেটা বোনেরই ঠিক করা। সেইমত, এই যে আমরা ভোরবেলায় বেরোচ্ছি সেটাও ম্যাডামেরই প্ল্যান ছিল। কিন্তু আমার শীতকাতুরে বোনকে  ওঠানো তো দুর, এক চুল নড়ানো অব্দি গেল না। অগত্যা, আমি আর আমার বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম। আগেরদিন রাতে আমরা হোটেলে বলে রাখিনি যে ভোরবেলায় বেরবো। ভাবলাম হয়ত ডাকাডাকি করে গেট খোলাতে হবে। কিন্তু সদর দরজা খোলা। বেশ অবাকই হলাম। উত্তরপ্রদেশের মত জায়গাতে এদের এতো আত্মবিশ্বাস যে চোর ডাকাতের ভয় অব্দি করে না? চোর ডাকাত না হোক, বাঁদরের উৎপাত তো কম নেই। যাই হোক, আমরা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বেলে ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কারন এখানে চাটের সাথে আরও যেটা বিখ্যাত, সেটা হল গোবর। যদি আপনার চোখ নিচের রাস্তাকে আর সামনের দিশ্য ঠিক ঠাক ব্যালেন্স করে না চলতে পারে, তাহলে দিনের বেলাতেও আপনার সুন্দর পাদুটি গোবরের সাথে সাক্ষাৎ মাখামাখি করবে। আর এখানে তো এখনও দিনের আলোর দেখা দিতে অনেক দেরি।

 ঘাটে এসে দেখলাম এক অপূর্ব দৃশ্য। গঙ্গার জলের উপর দিয়ে ধোয়া উঠছে। আসলে কুয়াশা জলের সাথে মিশে উঠে আসছে। তার পাশে নৌকাগুলো উপর নিচে দুলছে। চারদিক নিস্তব্ধ। কয়েকজন মানুষ দেখলাম জলে ডুব দিচ্ছে। সাহস আছে কাকুদের বলতে হবে। যেখানে মোটা জ্যাকেটে আমি হাড়ে হাড়ে ঠোকাঠুকি সামলাতে পারছি না, সেখানে এনারা রীতিমত ডুব দেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন। যাই হোক, আমি আর আমার বন্ধু ঠিক করলাম, আমরা আলদা আলদা দিকে যাব। কারন আমরা ট্রাভেল ভিডিও বানাই, সেক্ষেত্রে দুজন একই দিকে গেলে বিষয়বস্তু এক হয়ে যেতে পারে। আমি একা হাঁটা শুরু করলাম ‘আসি’ ঘাটের দিকে। এটি দক্ষিণ দিক বরাবর বারাণসীর শেষ ঘাট। আর এই ঘাটে ভোরবেলায় বেশ বড় রকমের আরতি হয়। আলো যেহেতু এখনও ফোটেনি, তাই একটু ভয়ে ভয়ে হাঁটছি। কারন রাস্তায় কুকুর অনেক, জানিনা তাদের, আমার প্রতি আচরন এই ভোর রাতে কেমন হবে। তবে পর পর দুটো ঘাট পেরতেই রাস্তায় লোক দেখা গেল। সবাই প্রাতঃ ভ্রমণে বেরিয়েছে। ঘাটের পাশে মহলগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের আলো নেভাতে শুরু করেছে। এক একটা কি বিশাল বিশাল মহল। প্রতিটাই, এক এক ঐতিহ্যের ইতিহাস বহন করতে করতে এখন বিলাসবহুল হোটেলে পরিনত হয়েছে। এই  মহলগুলোর ঘুলঘুলিও বেশ বড়। সেখান থেকে পায়রাগুল ‘বকম বকম’ করতে করতে  বেরিয়ে আসছে বাইরে। ধীরে ধীরে  গঙ্গার ওপারে, পূব দিকে সূর্য ওঠার তোরজোড় শুরু হয়েছে। আলো একটু ফুটতেই দেখা গেল গঙ্গার বুকে অনেক নৌকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই টুরিস্ট। এক ধরনের পাখি নৌকাগুলোকে ছেঁকে ধরেছে । পাশ দিয়ে আবার কোন নৌকা গেলে পাখিগুল সেদিকে চলে যাচ্ছে। ঘাটের ধারে সাধুরা নিজের নিজের বসার জায়গাতে বসে পড়েছে এর মধ্যেই। মাথার উপর তাদের এক ধরনের তালপাতার ছাতা। অনেকে তাদের কাছে নিজের নিজের নাম গোত্র বলে পুজো দিচ্ছে।  আমি যত আসি ঘাটের দিকে এগোচ্ছি, এক ধরনের সাধুর গান, খঞ্জনীর বাজনা কানে আসছে। এ যেন জয় বাবা ফেলুনাথের কোন দৃশ্যর আওয়াজ কানে আসছে। আসি ঘাটে যখন পৌছালাম, দুর্ভাগ্যবশত আরতি শেষ হয়ে গেছে। সেখানে এখন দেশাত্মবোধক গান চলছে। কারন দিনটা ২৬শে জানুয়ারি। আসি ঘাটেই কিছুক্ষণ দাড়িয়ে সূর্যোদয় দেখলাম। তারপর সেখানেই এক দোকানে চা খেয়ে উল্টো দিকে হাঁটা লাগালাম। সমস্যা হল, চায়ের দোকানের দাদা আমার কাছে দশ টাকার কয়েন নিলেন না। প্রশাসনের অপদার্থতাই হোক বা রাজিনিতি, মহানগরগুলো ছাড়া কোথাও ছোট এক টাকার কয়েন চলেনা তা জানি, কিন্তু দশ টাকার কয়েন কি দোষ করল? কি সুন্দর হলুদ রঙের বলয় দিয়ে ঘেরা। যাই হোক, এবার প্রতি ঘাটেই অনেক লোকজন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। “মাহারাজা হরিশ চন্দ্র ঘাট” একটি শ্মশান ঘাট। সেখানে বেশ কিছু অঘোরী সাধুর দেখা পেওয়া গেল, ছাই মেখে গঞ্জিকা সেবনে ব্যাস্ত। তবে এখানে অনেক জাল অঘোরী , নাগা সাধু চোখে পড়ে। বিদেশিরা বেশিরভাগ তাদের পাল্লায় পড়ে থাকে। আমি যেহেতু জীবনের আসল মজা সবে নিতে শুরু করেছি, তাই সাধু সন্ন্যাসীদের দিকে শেষ বয়েসে ঝুঁকবো বলে এগিয়ে গেলাম। আর এগোতে গিয়ে তিনটে আলাদা আলদা জিনিস চোখে পড়ল। প্রথমটি হল গোল করে বসে পিণ্ড দান, আর তার সাথে লাইনও পড়েছে রীতিমত সাধুদের সামনে। দ্বিতীয়, তেল মেখে কুস্তি ও যোগ ব্যামের আসর। তৃতীয়, লাইন দিয়ে সাদা কাপড় কেচে সেগুলো ঘাটের পাশে শুকাতে দেওয়া। এই কাপড়গুলো সাধারণত পিণ্ড দেওয়া, বা পরলোক ক্রিয়া করার সময় মানুষ পরে। তারপর কাজ হলে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়। আর সেগুলই জল থেকে তুলে এনে কেচে আবার বিক্রি করা হয় দোকানে।

অবশেষে দশাশ্বমেধ ঘাট যখন পৌছালাম তখন পেটের ছুঁচোরাও কুস্তি আর যোগ ব্যায়ম শুরু করে দিয়েছে। এদিকে গোটা ঘাট জুড়ে শুধু তেরঙ্গা উড়ছে, আর মুখে ঘুটকা নিয়ে জাতীয় পতাকা ধরে দেশভক্ত মানুষজনের ছড়াছড়ি। যে কাগজের পতাকাগুলো লুটিয়ে আছে নিচে, সেগুলো নিয়ে বাঁদরের বাচ্চারা খেলা করছে। ঘাটের বাইরে এসে সেরকম খাবারের দোকান কিছু পেলাম না। অগত্যা হোটেলে ফিরে এসে অর্ডার দিলাম আলু পরটার। এর মধ্যে আমার বোনেরও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সে এসেই যথারীতি আগে আমার থালা থেকে কিছুটা সাবাড় করে তারপর নিজের জন্য অর্ডার দিল। পাশে ছাদের গায়ে বাঁদর বাবাজী অপেক্ষায় ছিল, কখন আমরা একটু অসতর্ক হব, আর ছোঁ মেরে আমার পরটা তুলে নেবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি দিয়ে আমি নিজের পুরো খাবার শেষ করলাম।

দুপুরে স্নান করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য রামগড় ফোর্ট , সারনাথ ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়। হোটেল থেকেই আমাদের একটা টোটো ঠিক করে দেওয়া হল। প্রথমে গেলাম রামগড় ফোর্ট। তবে বিশেষ কিছু দেখতে পেলাম না, কারন ভিতরে কোন ভোজপুরি সিনেমার শুটিং চলছিল। তবে সংগ্রহশালাটি কিন্তু দেখবার মত। বিশেষ করে রাজার বিভিন্ন গাড়ি, আয়েশ করার সরঞ্জাম ও ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে ব্যবহৃত বন্দুকগুলো। রামগড় ফোর্টের বাইরে বেশ কিছু খাবার দোকান। সেখানেই আমি আবার টম্যাটোর চাট অর্ডার দিলাম। আহা, এ জিনিস সত্যি জিভে স্বর্গ এনে দেয়।  এবার আমরা আবার চলা শুরু করলাম সারনাথের পথে। আর এই যাত্রার যন্ত্রণা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। রাস্তা বেজায় বাজে, তারপর ধুক ধুক করে চলছে টোটো। গাড়িতে বা অটোতে যে রাস্তা আধ ঘণ্টায় শেষ হয়, সেই রাস্তা আমরা এলাম দেড় ঘণ্টায়। তাই, সারনাথ যেতে গেলে ওলা, উবের, গাড়ি, অটো যা খুশি করতে পারেন কিন্তু কম পয়সার লোভে টোটো একদম না।

সারনাথে বৌদ্ধ মন্দির দেখা হলে আমরা নেমে পড়লাম বাজারে। কারন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ‘এন আর সির’ বিরুদ্ধে ধর্না চলছে বলে রাস্তা বন্ধ। একটু সন্ধ্যা পড়লে আমরা এসে পৌছালাম কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সামনে। প্রথমে ভাবলাম রাতে হয়ত ঢোকা যাবেনা। কিন্তু সেরকম কোন বাধা ছিল না। এই মন্দিরে যেহেতু ব্যাগ, বেল্ট, জুতো, মোজা, ঘড়ি কিছুই নিয়ে যাওয়া যাবেনা, তাই সেগুলো জমা দিলাম। জমা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কাউন্টার। সেখান থেকে পুজর জিনিসও কেনা যায়। মন্দিরে কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অনেকরকম পুলিশি পরিক্ষার পর হয় ঠাকুর দর্শন। মন্দিরের গায়েই মসজিদ এবং ভাঙ্গা কিছু স্তম্ভ। এ যেন এক ইতিহাসের জীবন্ত দলীল। একদিকে পাশাপাশি দুটো স্থপত্য

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে, তেমনই ভাঙ্গা স্তম্ভগুলো অতীতের আক্রমনের অনেক সাক্ষী বহন করে। মন্দিরের প্রসাদ খেতে গিয়েই আমি বারাণসীর আর এক রত্নের সন্ধান পেলাম। সেটা হল প্যরা মিষ্টি। লাল, হলুদ আর সবুজ, এই তিন প্রকার প্যরা পাওয়া যায়। এর মধ্যে লাল প্যরা হল সস্তা। সাথে সাথে এক প্যাকেট কিনে আমরা খেতে খেতে হাঁটা লাগালাম মনিকর্ণীকা ঘাটের দিকে। এই ঘাটটি ছিল আমার বিশেষ আকর্ষণ। মন্দির থেকে আর একটু হাঁটলেই ঘাটের প্রবেশ পথ। সরু সরু গলির ভতির দিয়ে হাঁটা। চারিদিকে বিভিন্ন গলি আর এক গলির সাথে এসে মিশেছে। গুগুল ম্যাপ না থাকলে আমরা রাস্তা এমনি হারিয়ে ফেলতাম। এই রাস্তার মধ্যেই পড়ে বিখ্যাত ব্লু লস্যির দোকান। আমি নিজে লস্যি খায় না, তবে বোনের জন্য দাড়াতেই হল। পাশ দিয়ে অনবরত তখন মৃতদেহ কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কারন মনিকর্ণীকা ঘাট এখানকার সবচেয়ে বড় শ্মশান। কখনো এই ঘাটের আগুন নেভেনা। সবসময় মৃতদেহ দাহ হয়। মৃতদেহ নিয়ে বাড়ির লোকেরা রীতিমত লাইন দিয়ে অপেক্ষা করে সৎকারের জন্য। আমরা যখন ঘাটের একদম কাছে, হঠাৎ আশপাশটা কেমন বদলে গেল। এক গা শিরশিরে ভাব এসে ধরল আমাদের। গলিটা এত সংকির্ন আর অন্ধকার, পিছনে যে মৃতদেহ আনা হচ্ছিল তাদের রাস্তা করে দিতে আমাদের পাশের বাড়ির উঠনে নেমে যেতে হল। আমার বোন এই একটি জায়গাতে নিজের সব সাহস হারিয়ে রীতিমত আমার হাত ধরে হাঁটছে। আশে পাশে সারি সারি কাঠ সাজানো। সব কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেও পুড়বে, সাথে দেহগুলকেও পোড়াবে। অবশেষে অন্ধকার থেকে একটু আলোর দেখা পেলাম। বেশ বড় পাওয়ারের লাইট জ্বলছে। কিন্তু কাছে গিয়ে বুঝলাম এ কোন  বৈদ্যুতিক আলো না, এ আগুনের ছটা। একসাথে অনেক আগুন। অনেক মরা একসাথে পুড়ছে। পাশে আরও মরা নামানো। পোড়ানর আগে তাদের খাট সমেত গঙ্গার জলে চোবানো হচ্ছে। মৃতদেহের এতো লম্বা লাইন যে, কোন কোন মরা ঠিক ঠাক পুড়ছেও না। তার আগেই কাঠ নিভিয়ে জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে পরবর্তী দেহকে। এক ঘোরের মধ্যে আমরা ছিলাম কিছুক্ষণ। তারপর হোটেলে ফিরে আমরা যে যার বিছানায় গেলাম। কারন পরের দিন ফেরার ট্রেন। তার উপর আরএসি টিকিট। বিশ্রাম দরকার।

বারাণসী থেকে আমি কোন অভিযোগ নিয়ে ফিরিনি। যে শহর যেমন, তাকে তেমন ভাবেই চিনে ফিরেছি। আর বেড়াতে যাওয়ার মানেই তাই। গঙ্গার ঘাট সহ শহর বেশ পরিস্কার। যে পরিমান তীর্থযাত্রী এই শহরে আসে, তাতে শহরকে পরিস্কার রাখা বেশ কঠিন কাজ। প্রশাসন সে লড়াই লড়েছে, আজও লড়ছে। কিন্তু তাও কিছু কথা রয়েই যায়। গঙ্গাকে যেখানে পূজো করা হয়, সেখানেই গঙ্গা আজ বিষাক্ত। এর জন্য দায়ি কে? মানুষ বারাণসীতে মুক্তিলাভের জন্য, মরার আগেই পৌঁছে যায়। যাতে তার দেহের সৎকার এই শহরেই হয়। কিন্তু যেভাবে গঙ্গার জলে মৃতদেহ চুবিয়ে স্নান করানো হচ্ছে, সেতো ভয়ঙ্কর। রীতিমত রোগ মহামারীকে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে জলে। ঐতিহ্য বজায় রাখতে এখানে ইলেকট্রিক চুল্লি নেই। থাকলেও যে পরিমান মৃতদেহ সৎকারের জন্য আসে, তাতে কাঠে পোড়ানো ছাড়া, কোন উপায় থাকে না। কিন্তু কেও কি হিসাব রেখেছে, মৃত দেহগুলোকে পোড়াতে কত জ্যান্ত গাছকে প্রান দিতে হচ্ছে দিনের পর দিন? সত্যি এ শহর মায়ার শহর। আর সেই মায়াতেই হয়ত এই প্রশ্নগুলো হারিয়ে গেছে।

Article By Rajat Saha

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here