ব্যস্ত কলকাতা, জীবনের ভাঙা গড়ার স্মৃতি মাখানো সন্ধ্যে নেমেছে রোজের নিয়মে। বাড়ি ফেরার তোরজোড় গোটা শহর জুড়ে।

সময়ের অভাবে এখন আর রকে আড্ডা জমে না সেইভাবে। গানের কলি, সদ্য শেখা গালাগালিতে নীলাঞ্জনা র কথা কেউ মনে করায় না আর। 

শহরটা যেন যান্ত্রিকতার জাঁতাকলে পিষে আবেগ নিংড়ে নিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। যাইহোক অনেক শব্দ গাঁথলাম এবার গল্পে আসা যাক। 

সপ্তাহের শেষ কাজের দিন। ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবো। সেই ইচ্ছেতেও জল ঢেলে দিল গাড়িটা। আজই বিগড়ে বসল ইঞ্জিন।

অগত্যা ক্যাবেই যেতে হবে , আবার এই বিকল্পেও এসে পরলো আরেক সমস্যা। পকেটে কড়কড়ে 2000 এর নোট আর পঞ্চাশ-ষাট টাকার খুঁচরো।

ক্যাবে যে আমায় 300 টাকার ভাড়ায় 2000 এর ভাঙাতি দেবে না সেই ব্যাপারে নিশ্চিত। সুতরাং আজ বাসে করেই বাড়ি ফেরার যাত্রা সারতে হবে সেই ব্যপারে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রইল না।

অফিসের গ্যারেজে আজকের মতো গাড়িটার ব্যবস্থা করে হাঁটা শুরু করলাম বাসস্টপের দিকে। ঘড়ির্ কাঁটায় সন্ধ্যে সাড়ে ছ-টা। প্রায় না হলেও গত পাঁচ বছরে কলকাতার কোনো বাসস্টপেই আমার জুতোর ছাপ পড়েনি।

তবে কোনদিনই আমার একার আগমন ঘটতো না বাসস্টপে। কলেজ জীবনে আমার সাথে আরো একজোড়া জুতোর ছাপ লেগে থাকতো। অনেক পুরোনো স্মৃতি মোড়ানো এই বাসস্টপ।

শহরের বেশ কিছু যায়গায় আমার আর ওর গল্প লুকিয়ে আছে। সে চলে গেলেও স্মৃতি গুলো আজও সজীব আমারই চেষ্টায়। চেষ্টা বলবো না বৃথা চেষ্টায়। বৃথা কারন! আচ্ছা থাক সে কথা পরেই বলবো। আজকে গাড়ির ইঞ্জিন বিগড়ে যাওয়ায় বাড়ি ফিরতে বিলম্ব হলেও হয়তো নিয়তির টানে আমাদের আবার দেখা।

কাকতালীয় হলেও আজ আবার কলম ধরার একটা সুযোগ করে দিল। নিজেকে লেখক বলে দাবী একেবারেই করবো না কারন আমার লেখা কেউ পাঠ করবার বিকল্প নেবে না।  মুনমুন মূখার্জির “বছর চারেক পর” কবিতা শুনে এটুকু ধারনা হয়েছিল যে প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে অনেক গুলো বছর পর দেখা হলে নাকি বিরহের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে চোখে-মুখে। হয়তো আমিই ভিনগ্রহের প্রাণী তাই আমার সেরকম কিছুই হয়নি। বরং আজ এতোগুলো দিন পরে দেখতে পেয়ে পুরোনো স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিলো ক্রমশ। মনে ভীড় জমাচ্ছিলো হাজার প্রশ্ন কিন্তু রেড সিগন্যাল থমকে দাঁড়িয়ে ক্রসিংয়ে। আবার উল্টোপাল্টা লিখছি। এবার ঘটনায় আসি বরং।

খুব একটা অপেক্ষা করতে হয়নি বাসের জন্য আজ। মিনিট পনেরোর মধ্যেই দেখা মেলে বাসের। কিন্তু প্রচন্ড ভীড়, তার উপরে বাসে ওঠার অভেস্যে তালা লেগেছে বহুদিন, চাবিটাতেও মরচে ধরা। তাই কোনোরকমে চেপে পড়লাম বাসে।

যুদ্ধকালীন তত্পরতায় যেন অসিম শক্তি অর্জন করে ঘামে ভেজা কতো গুলো ইন করা শার্টের ভাঁজে কেরামতি করে গভীরে প্রবেশ করলাম। তুলনামূলক ভীড় কম ভিতর দিকটায়।

বরাবরই একটাই প্রশ্ন ছিল আমার যে বাসের ভিতরে যায়গা থাকতেও কেনো দরজায় গিয়ে সবাই ভীড় জমায়? উত্তরে সে বলতো ” গরিবের টাইটানিক”। ভারী মজার ছিলো ও। দুটো তিনটে স্টপেজ যেতেই একটা সিট ফাঁকা পেলাম। গিয়ে বসলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ ফাঁকা হয়ে গেল। আমার তো একেবারে লাস্ট স্টপেজ, তাই কানে হেডফোন গুঁজে ” যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে ” গানে মত্ত। রবীন্দ্র প্রেমী আমি ছিলাম না কোনোদিনই কিন্তু আমার রবীন্দ্র প্রেমী হয়ে ওঠাতেও  কৃতিত্ব এখানে ওরই।

কলেজে যখন সেকেন্ড ইয়ার দেখা হয় ওর সাথে কোচিংয়ে। মেধাবী ছাত্রী বলেই বেশ পরিচিতি ছিল। দেখতেও খুব সুন্দর। কোনোদিনও ওকে পরিপাটি করে সাজতে দেখিনি। তাও সুন্দর ছিল ও খুব।

বন্ধুত্ব হয় আমাদের। কখন যে বন্ধুত্তের পাঁচিল টপকে প্রেমের ইট গাঁথা শুরু হলো টেরই পাইনি। সবাই যখন ঢাকুরিয়া লেক, ভিক্টোরিয়ায় প্রেমে ব্যস্ত আমরা তখন ময়দানে নীল, সীমাহীন আকাশের নীচে। কখনো গাছের ছায়ায় আমার কাঁধে ওর মাথা রেখে কখনো ওর কোলে মাথা রেখে । দারুন গান করতো, আমার আব্দার ও রাখত, ওর কোলে মাথা রেখেই রবীন্দ্র সঙ্গীতে ডুবে যেতাম।

সেই থেকে রবি ঠাকুরের প্রতি টান এখনো অনুভব করি। ওর গান গুলো লুকিয়ে ফোন রেকর্ড করে রাখতাম। ভাগ্গিস রেখেছিলাম তাই আজও ওর অনুপস্থিতিতে  ওকে অনুভব করতে পারি।

ওর মতো করে আমার মনে আর কেউ ঠিকানা খুঁজতে পারেনি। আসলে আমি তো এখনো ওর ঠিকানায় রোজ অদৃশ্য চিঠি লিখি।

যাই হোক আজ বার বার ওর কথা তেই চলে আসছি। ওকে নিয়ে লিখতে বসলে একটা আস্ত  উপন্যাসেও শেষ হবে না। কারন আমাদের সম্পর্কের ইতি ঘটলেও অসমাপ্ত হয়েই থেকে গেছে।

ওকে মনে পরলেই ওর কথাই বলে যেতে ইচ্ছে হয় তাই আজ বার বার ওর পথে হেঁটে চলেছি ,আমার গন্তব্যে আর পৌঁছাতে পারছি না।

 এবার আজকের ঘটনায় আসা যাক… বাস মোটামুটি ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর একটা স্টপেজে বাস থামল। যদিও আমার সেই দিকে তেমন খেয়াল ছিল না কারন আমি তো হেডফোনে ব্যস্ত।

বাস চলতে শুরু করেছে আবার, হটাৎই খুব চেনা একটা গন্ধে যেন অবশ হয়ে যেতে থাকলাম, গন্ধটা এতটাই চেনা যেন সে। কিন্তু  সেটা কি করে সম্ভব ও তো বিয়ে করে ব্যাঙ্গালোর এ থাকে। মনের ভুল ভেবে আবার গাছপালা, আবাসন পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া বাসের ছন্দে আর হেডফোনে মন দিলাম।

কিন্তু না! সামান্য হাওয়া দিতেই আবার সেই গন্ধটা ! এবার হেড ফোন খুলে বাসের সামনের দিকে তাকিয়েও কিছু খুঁজে পেলাম না।

ঠিক পাশের রো এর সিটে দৃষ্টি আটকে গেল। কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল নিশ্বাস। অজান্তেই ভিতর থেকে একটা নাম বেরিয়ে এলো “কথা” ! ওপাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটিও অবাক চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে শেষমেশ আমার চোখে স্থির হলো।

পরের স্টপেজে র জন্য বাস হটাৎ সজোরে ব্রেক চাপলো। সেই করণেই আমাদের দৃষ্টি আবার স্বাভাবিক  হলো ঠিকই কিন্তু মনের চঞ্চলতা ক্রমশ বেড়েই চলল।

প্রমান স্বরূপ এতদিন পর কিভাবে কি কথা বলবো সেটাই অজানা আজ। অথচ আমাদের কথা র শেষ ছিল না।

নামের সাথে ওর একটিই অমিল, ওর নাম কথা হলেও ওর থেকে বেশি আমিই কথা বলতাম আর আমার সব কথা খুব মন দিয়ে শুনত, এতটুকু বিরক্ত বোধ করতো না কোনোদিন।

আজ কি জিগ্জ্ঞেস করবো আর কি ভাবেই বা কথা শুরু করবো কিছুই বুঝতে পারিনি আজ। তাই পাঁচ বছর ধরে জমিয়ে রাখা প্রশ্ন গুলো গ্রিন সিগন্যাল  না পাওয়ায় থমকে দাঁড়িয়ে।

যখন আমি রেড সিগন্যাল  দাঁড়িয়ে  কথা তখন গ্রিন সিগন্যাল  হয়ে আমার পাশে এসে বসে। আমি আরো অবাক হয়ে যাই।

কেমন যেন অনুভুতি গুলো চেনা-অচেনা র ভিড়ে তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগলো। এতো দিন পর পুরোনো হারিয়ে যাওয়া অনুভুতি গুলো আবার কিছুক্ষণের জন্য ফিরে পেলাম, যেন ঘন মেঘে ঢাকা বর্ষার মাঝে একটুকরো বসন্তের হাতছানি।

একবার মাথা নিচু দুজনের আবার দুজনের দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুতিতে হেসে ফেলা চলতেই থকলো কিছুক্ষণ।

আর কয়েকটা স্টপেজ পরেই নামতে হবে ভেবে কাপা কাপা কন্ঠে আবার ওর নাম বেরিয়ে এলো ভিতর থেকে। কথাও আগ্রহের সাথে আমার কথা শোনার অপেক্ষায়।

  • কথা ? 
  • হ্যাঁ ! 
  • কে-কেমন আছিস ?
  • হুম ! 
  • কি ? 
  • ভালো। 
  • ও ! হ্যাঁ ! 
  • কি হ্যাঁ ? 
  • ভালো থাকবি না কেনো ? বোকা বোকা প্রশ্ন করলাম।
  • কথা বলতে চেয়েও কথা খুঁজে না পেলে এরমই হয়। 
  • হ্যাঁ মানে।
  • তুই ?
  • আমি ? 
  • কেমন আছিস ? 
  • অসমাপ্ত  উপন্যাসের শেষ পাতা যেমন হয়। 
  • লেখা-লিখি করিসনা আর ? 
  • না। 
  • কেনো ? তুই আমায় কথা দিয়েছিলি কোনোদিনও লেখা বন্ধ করবি না।
  • হুম! কিন্তু মনে করে দেখ বলেছিলাম তুই থাকলে। 
  • আমি তো ! 
  • কি ? আটকে গেল তো কথা টা? 
  • হ্যাঁ ! 
  • জানি। তুই আছিস আজ ও আমার ডায়েরিতে, আছিস আমার শার্টের ছিড়ে যাওয়া বোতাম এ। আছিস আমার সেই পুরোনো রিস্ট ওয়াচ টায়, তুই আজ ও আছিস আমার ঘরের প্রতিটা ফোটো ফ্রেমে , আমার বালিশে ,আমার চাদরে, আমার বাড়ির বারান্দায় রাখা সেই চেয়ার তায়। কথা তুই আজও আমার মনে আছিস। 
  • থাম! আর আমার অপরাধের বোঝা বারাস না। 
  • অপরাধ? 
  • হ্যাঁ ! 
  • কিসের ? 
  • তোকে কষ্ট দেয়ার অপরাধ। তোকে একা করে দেয়ার অপরাধ। 
  • আমি একা নই । তুই তো আছিস। 
  • কষ্ট হচ্ছে না? 
  • জানি না। তবে ?
  • তবে ! 
  • মনটা কেমন ভারী হয়ে আসছে। 
  • আমাদের কি সত্যিই সব শেষ ? 
  • “রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে।”
  • হুম ! রবীন্দ্র প্রেমী হয়েছিস খুব। 
  • হ্যাঁ! তোর জন্যেই। 
  • গান শুনছিলি ? 
  • হ্যাঁ ! 
  • কি গান ? দেখি ? 
  • না ! না ! 
  • কেনো দে না। 

এটা তো আমার , আমার গাওয়া না ? 

  • হ্যাঁ ! রেকর্ড করে রাখতাম। 
  • তুই পাগল একটা। 
  • তাই ? 
  • হ্যাঁ ! 
  • তোরই জন্য। 
  • তুই হটাৎ বাস এ ? 
  • গাড়িটা খারাপ হয়েছে হটাৎ। 
  • ও।

 বিয়ে করিসনি ?

  • তোর পাগল টাকে অন্য কেউ সামলাক তুই চাস?
  • কিছু জিনিস না চাইলেও চাইতে হয়। আর কতদিন একা থাকবি ?
  • তুই ও তো আছিস। 
  • মানে ? 
  • বিয়ে করেছিস ঠিক ই তবুও নিজেকে একা করে রেখেছিস। তাই তো ? 
  • সব বুঝে যাস এখনো। 
  • তোকে বুঝি । 
  • এই নে আমার নম্বর। 
  • না থাক। 
  • কেনো ?
  • আমার জন্য তোর বর্তমান সম্পর্কে চিড় ধরুক চাই না কথা।
  • আমি তোকে ছাড়া একাই। বর্তমানে সামাজিক দৃষ্টিতে সম্পর্কে আছি তবে তোর আমার যে সম্পর্ক ছিল সেই দিন গুলো আকড়ে আজও। তোকে আবার পাশে চাই।
  • কথা ? 
  • হ্যাঁ ! থাকবি না ?
  • আমি তো ছিলাম। আজও আছি। কিন্তু ?
  • কি ? 
  • তোর হাসব্যেন্ড ?
  • থাক ! 
  • কেনো ? 
  • পরে বলবো। আজ আসি। ফোন করিস। 
  • সাবধানে যাস। 
  • হুম। তুই ও। বাড়ি ফিরে মেসেজ করিস। 
  • আচ্ছা। 

স্টপেজ আসতেই নেমে গেল কথা। পরের দুটো স্টপেজ পরে আমিও। বাড়ি এসে কখন ওর নম্বরে মেসেজ করবো সেই ধৈর্য ধরে রাখতে পারছিলাম না আজ। আট টা নাগাদ বাড়ি এসেই ওকে জানাই আমার ফেরার কথা। উত্তরের অপেক্ষা শেষ হলো। রিপ্লাই তে জানলাম ও ফিরেছে বাড়ি। শেষে একটা আব্দার করলো, ” আজকের আমাদের হটাত দেখা হওয়া নিয়ে একটা ছোটো গল্প লেখ। অনেকদিন তোর লেখা পরিনি।” তাই কথার আব্দার রাখতে লেখা নিয়ে বসলাম। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here