অতঃপর হাজারো ঝড় ঝাপটার কাঁধে মাথা রেখে এই ক্লান্ত বিদ্ধস্ত বছরটা শেষ হলো। গত শতাব্দির অন্যতম খারাপ বছর হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ২০২০’র নাম থাকা অনিবার্য। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত, এক অনাকাঙ্খিত ছন্দপতন ঘটেছে সবার জীবনেই। এই অদৃশ্য দানবের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পায়েনি কেউ। এই সাদাকালোর চড়াই উৎরাই এর মধ্য দিয়েই ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে মুছে গেল অভিশপ্ত ২০২০। এইখানে প্রশ্ন থেকে যায় দেওয়ালে ঝোলানো একটা গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের কি ক্ষমতা জীবনের অনিবার্য গতিময়তার পথরোধ করে। স্মৃতির পাতা উল্টে দেখলে দেখা যায় এইরকমই একটা রঙিন আলোয় মোরা রাতে একবুক আশা নিয়ে একইভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল ২০২০ সালটাকেও। প্রতিবছরের মতোই গতবছরের পুরোনো মনখারাপকে পেছনে ফেলে নতুনের আশায় বুক বেধেছিলাম আমরা। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি না পাওয়া ছেলেটা নতুন বছরে পুরোনো হতাশা ভুলে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। জীবনের গতির সাথে তাল মেলাতে না পেরে পিছিয়ে পড়া মেয়েটাও ঠিক করেছিল নতুন বছরে অন্তত একটা নতুন কিছু সে শিখবেই। যে ছেলেটা বা মেয়েটা নিজেদের স্বপ্নকে ছোয়ার লড়াই লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তারাও গা হাত পা ঝেড়ে নতুন করে লড়াই শুরু করেছিল। তারপর জীবনের স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সবাইকেই। এরইমধ্যে রোদ ঝলমলে জীবনের ওপর নেমে এসেছে কালো মেঘের ছায়া। এক অদৃশ্য ভাইরাসের করাঘাতে থমকে গেছে জীবনের গতি। শুরু হলো এক অসম লড়াই। করোনা দানবের হাত থেকে রক্ষা পেতে মাথা পেতে শিকার করতে হলো বন্দী দশা। এদিকে বাড়ির ভেতর আরেক গেরো, হামলা করছে অভাব রাক্ষস। কর্মহারা হলো না জানি কতজন। রোজগারের গ্রাফ ক্রমশ নিচের দিকে যেতে থাকলো, ক্রমশ পরিস্থিতি আরো বিরূপ হলো। কিন্তু হেরে যায়নি কেউ, লড়াই করেছে বুক চিতিয়ে। কেউ সাদা পিপি কিট পড়ে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে ঢাল হয়ে দাড়িয়েছে তো কেউ বাড়ির ভেতরে থেকেই সামিল হয়েছে। এ যেন রিয়ালিটি শো এর খেলা, বিধাতাপুরুষ একের পর এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে মানুষের দিকে, এই খেলা চলেছে গোটা বছর ধরে।

তবু জীবন থেমে থাকে না। জীবন নদীর স্রোতে বয়ে গেছে অনেটা সময়, ধীরে ধীরে লকডাউন উঠেছে, জীবনও ছন্দে ফিরছে আস্তে আস্তে। কালো বছরটারও আয়ু ফুরিয়েছে। দিনান্তে এসে নতুনের আশায় আবারও বুক বেঁধেছে সবাই। সেই জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত মেয়েটা এক বছরের বিশ্রাম শেষে আবারো নতুন উদ্যমে উঠে দাড়িয়েছে। বহুদিন ছেলেমেদের ছেড়ে একাকিত্বের সঙ্গে ঘর করা বাবা মা’রা এই কদিনে ফিরে পেয়েছে সংসার, মনের বিশাদ ভুলে তারা উঠে দাড়িয়েছে আবার। ব্যাস্ত রোজনামচার তারনায় যারা পরিবারে প্রায় ব্রাত্যর দলে নাম লিখিয়েছিল, একদিনে তাদেরও মনের দূরত্ব কমেছে। বিরূপ সময় ভালো থাকার বেঁচে থাকার কৌশল শিখিয়েছে এই বছরটা। এইভাবেই মন্দের ভালো নিয়ে একুশে পা পরলো সক্কলের। মানুষের চরিত্রও জলেই মতন, যে পরিস্থিতিতে রাখা হয়ে সেইমত রূপ নেয়ে। যত অন্ধকারেই থাকুক না কেন আশার আলো মানুষ ঠিক খুজে নেয়। এইখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব। এইভাবেই ভালো মন্দর দোলাচলে এগিয়ে চলুক জীবন, নতুন বছরে নতুন উদ্যমে শুভ হোক চলার পথ।

ঈশানী ধর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here