গিরগিটিদের সমাজ

জীবন যুদ্ধের অনেক বর্ণনা চাইলেই ইন্টারনেট ঘেটে খুঁজে পাওয়া যায়। রাজার হালে থেকে কিছু মানুষ খুব সহজেই কঠিন সময়ে কিভাবে পথ চলা যায় সেই নিয়ে হাজার একটি বাণী ও বিনামূল্যে দান করেণ। তবুও নিজে এগিয়ে এসে নতুন পথের দিশা দেখায় না। আজকের দিনে বোধহয় আমরা মানুষের বেশ ধারণকারি গিরগিটির সাথে বাস করি। এ যেন গিরগিটি দের সমাজ। নিজের রক্তের সম্পর্কের মানুষ গুলোও যাদের সাথে ছোটো বেলায় কানামাছি খেলা, লুকোচুরি খেলা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া সব চলতো। সেই সব মানুষরাই যেনো কিসের লোভে রং বদলে নিল নিমিষেই। কেনো এতো অরুচি তাদের প্রতি জানেন ? নিজের অভিজ্ঞতাই একটু ছোটো করে বলি তবে।
বয়স তখন খুব বেশি না। খুব বেশি হলে বয়স তখন পনেরোর কাছা কাছি। মা, বাবা দুজনে প্রায়শই দেশের বাইরে থাকতেন। আমি জ্যাঠা-জেঠ্যিমা র কাছেই বড়ো হয়েছি। মা-বাবা যদিও সব খরচ পাঠাতেন। সব কিছুই ঠিক চলছিল। হটাৎ একদিন, দিনটা ষোলোই জুন, 2010। মা-বাবা র সেদিন ফিলাড্যালফিয়া থেকে ফেরার কথা। দু-বছর পরে সেদিন ওদের ফেরার কথা। আনন্দে স্কুল যাইনি সেদিন। কিন্তু ওদের আর ফেরা হলো না। জানতে পারি ফিলাড্যালফিয়া থেকে যে বিমান কলকাতায় ল্যান্ড করার কথা ছিল, সেই বিমানের চাকা আর কলকাতার বুকে নামতে পারেনি। খোলা আকাশেই সব টা শেষ হয়ে যায়। সাথে আমার মা-বাবাও। আর কোনোদিন মা-বাবা কে দেখতে পাইনি। জীবনে হারানোর দিন গোনা শুরু হলো সেদিন থেকে। আর আমার জায়গা হয় না আমার নিজের বাড়িতেই কোনোরকমে দশম শ্রেণীর পরীক্ষাটা এক রকম অনুরোধ করেই দিয়েছিলাম। তারপরে আর আমার বাড়িতে থাকা হয় নি। নিজের জেঠু ই বেড় করে দিল আমাকে বাড়ি থেকে। সেদিন রাতে ক্লান্ত টলোমলো পায়ে এসে বসলাম সার্দান এভিনিউয়ের ফুটপাথে। রাত তখন কতো জানি না। ধীরে ধীরে শূন্য হতে থাকলো রাস্তা। বর্ষাকাল তখন। তবুও নিজেকে প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানোর উপায় ছিল না সেদিন। একটা দোকানের নীচে দাড়িয়ে ছিলাম। দোকান বন্ধ হতেই আর ঠায় হলো না। রাস্তার হলুদ আলো গুলোর মতই আমি সেদিন একা, নিসঙ্গ। জল জমা রাস্তায় খল খল শব্দ করে,হলুদ সেই আলো গুলোর নীচেই একটুকরো আশ্রয় খুঁজেছিলাম। বৃষ্টি নিজের খেয়াল খুশি মতো ঝরে চলেছে। মাঝে সাঝে ঝোড়ো হাওয়া সিমেন্টের বিল্ডিংয়ে র ফাঁকে শো-শো শব্দ করে ছুটে চলেছে এদিক ওদিক। মনেও যে ঝড় উঠেছিল সেদিন। মন ও ভিজেছিলো নিসব্দে। মনের নদী বাঁধ খুব বেশি দৃঢ় ছিল না। তাই খুব সহজেই ভেঙে আমার চোখ ভিজিয়ে দিল। বৃষ্টির ফোঁটা র সাথে আমার চোখের ধারাও সেদিন মাটিতে মিশেছিল। এরপর রাস্তাঘাট একেবারে শুনশান। শুধু বৃষ্টির এক ঘেয়েমি শব্দ। ল্যাম্পপোস্টে পিঠ ঠেকিয়ে ব্যস্ত মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি জানি আগে শুনতাম মেঘের কাছে নাকি চিঠি পাঠানো যায়। আজ ও খুব ইচ্ছে হলো বাবার নামে চিঠি লিখে মেঘের ডাকঘরে পাঠাই। পাঠালাম ও মেঘের দিকে চেয়ে বললাম ” মেঘ! আমার বাবাকে জানিও আমি অপেক্ষা করে আছি তার ফেরার।” জন্ম মৃত্যু র পার্থক্য বোঝার মতো বুদ্ধি তখন আমার ছিলই। তবুও শেষ আশায়। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তারপরে, জানি না। ঘুম ভাঙে এক দোকানদারের ডাকে। আমার জন্য তিনি দোকান খুলতে পারছিলেন না। সেদিন সকালে আমার উঠে দারানোর জোর ছিল না। আধপেটা খেয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলাম। রাতে আর কিছু খাওয়া হয় নি। বুঝে গেছিলাম এবার থেকে আর খাওয়া ভুলতে হবে। মন মানলেও পেট মানতে চায় না যে। মনের উপর জোর খাটানো যায়, পেটের উপর? যায় না। সেদিনের পর এই দোকান সেই দোকান ঘুরে যদি কিছু খাবার পাওয়া যেতো সেই আশায় ঘুরতাম। একটা কাজের সন্ধানে অনেক ঘুরেছি। কোনো লাভ হয় নি। ধীরে ধীরে শার্টটা বিবর্ণ হতে থাকে। বুক পকেটটা ও ছিড়ে যায়।  চুল উস্কশুষ্ক। আমায় দেখলেই সবাই বিরক্ত হতো। তাই কোনো দোকানেই আমায় আর খাবার দিত না। ক্যালেন্ডারের হিসেব নেই। জানি না কতো মাস, কতো বছর আমার এই ভাবে কেটেছিল। একদিন দুপুরে হাটতে হাটতে গড়িয়াহাটের দিকে যাই। বাবা কলকাতা আসলে আমায় নিয়ে আসতো। সেই জায়গায় যদি আজ ও বাবার গায়ের গন্ধটা পাই সেই লোভেই গেছিলাম। কয়েকদিন না খাওয়া তাই শরীরে কুলোলো না। পরে গেলাম মাথা ঘুরে। কখন জ্ঞান ফিরেছে,কিভাবে ফিরেছে কিছুই জানিনা। শুধু চোখ খুলে দেখি একজন মাঝ বয়সি ভদ্রলোক আমার মাথার পাশে বসে। আমার পোষাক দেখে বুঝেই যায় আমার পরিচয়। নিজেকে নিঃশ বলে আর পরিচয় দিতে হয় না আমায়। কিছু খেতে পাইনি বুঝতে পেরে আমাকে সেদিন তিনি খাইয়েছিলেন। জানতে পারি তিনি ফুটপথের একটা ছোটো খাটো ফাস্ট ফুড দোকানের মালিক। খাওয়া শেষে ধন্যবাদ জানাতে চাইলে ধন্যবাদ অস্বিকার করেন। সাহস করে একটা কাজের জন্য সাহায্য চাই। হরি বাবু কিছু ক্ষণ ভেবে আমাকে একটা কাজের ব্যাবস্থা করেও দেন নিজের দোকানেই। বাসন ধোঁয়ার কাজ। বিনা দ্বিধায় এক কথায় রাজি হয়ে যাই। সেদিন অনেক মাস পর আমি হেসেছিলাম। ওই দোকানেই আমার রাতের থাকার ব্যাবস্থা ও হয়ে যায়। খাওয়া-পরা সবই ঠিকঠাক চলতে থাকে। শরীরে জড়ানো জীর্ণ জমাটা দেখে একটা নতুন জামা এনে দেন হরি বাবু। পরনে নতুন জামা পেয়ে বেশ খুশি হয়েছিলাম। বছর ঘুরে শীত এলো। রাস্তার উপরে দোকান। কলকাতায় রাতে বেশ জাঁকিয়ে শীত পরে। সেই শীতেই কোনো রকমে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাতাম। বাবার কথা খুব মনে পরত সেই রাত গুলো তে। একা একা চোখ ভিজে গাল ভিজিয়ে দিত। কেউ ছিল না আমার নীরবতার চিৎকার শোনার। এভাবে কেটে গেলো প্রায় দেড়টা বছর ।বড় একা। তবুও হরি বাবুর পাশে থাকয় একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই। মাসে 200 টাকা আর খাওয়া-দাওয়া এইসব কোনো কিছুরই আর অসুবিধা তেমন ছিল না। দিব্যি চলে যাচ্ছিল। দিনের বেলা রেস্তোরায় খেতে আসা, অতিথি দের এঁটো বাসন মেজে দিনটা কেটে যেত। আর রাতে একা ফুটপাতে, আকাশ কে সঙ্গী করে ঘুম আসতো চোখে। মাঝে মাঝে ইটের টুকরো দিয়ে রাস্তার উপরে আঁকিবুকি কাটতাম। দিন হলেই আবার রোজের ব্যস্ততা শুরু হলেই আবার মুছে যেত সেই সব ছবি। কাজে অরুচি মোটেই ছিল না। যা বলতেন সবটাই হাসি মুখে করতাম। এমনি করেই বেশ চলছিল হটাৎ একদিন। রোজের মত সেদিনও কয়েকজন এসেছিলেন রেস্তরায়। বাসন ধুইঁয়ে রাখতে গেছি এমন সময়ে যারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে কারো এক জনের পেছনের পকেট থেকে মানি ব্যাগ মাটিতে পরে যায়। আমি তুলতে গেলে সেই রেস্তরারই একজন কর্মী কে দেখি নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিতে। আমি অবাক হয়ে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার সময় সে আমাকে সবার সামনে চোর বলে দাবী করে। তেনারা আমার কোনো কথা না শুনেই তিন জনে মিলে আমাকে রাস্তায় ফেলে প্রহার করতে শুরু করেন। লাথি, ঘুসি, চড় কোনো কিছু থেকেই বঞ্চিত করেননি। জোরে ধাক্কা মারায় ল্যাম্পপোস্টে আমার মাথা ফেটে যায়। শেষে হরি বাবুও আমাকে ভুল বোঝেন। আর আমার জায়গা হয় না তার দোকানে। সেদিন ই বেড় করে দিল আমাকে। পায়ে ধরে অনুরোধ করেও লাভ হয়নি। আবার আমি আশ্রয়হীন হয়ে পরি। হাতে তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকা মতো জমানো ছিল। সেই নিয়েই বেড়িয়ে পড়েছিলাম অজানা উদ্দেশ্যে। সেই টুকু ভাগ্যও কপালে ছিল না। ভেবেছিলাম পুনরায় সেই সার্দান এভিনিউ র ফুটপাতেই ঠিকানা খুঁজব কিন্তু সেখানে পৌছানোর আগেই হাতে যেটুকু টাকা ছিল সেটুকু ও কেড়ে নিল নিয়তি। এক পুলিশ আমার পোষাক দেখে আমাকে ভিখারি বলার সাথে সাথে সেই সাড়ে তিন হাজার টাকাও কেড়ে নিলেন। বললেন আমার কাছে নাকি এতো টাকা থাকতে নেই, আমি চুরি করে এনেছি সেই টাকা। শেষ সম্বল হারিয়ে এসে পড়লাম সার্দান এভিনিউ তে। তিনটে বছর পরে ফিরেছিলাম সেখানে। সেই চেনা পথ। সেই ল্যাম্প পোস্ট এর নীচেই আবার মাথা গুঁজলাম। অসহ্য মাথা যন্ত্রনায় চুল ছিড়েও শান্তি মিলছিল না এক টুকরো। জল পিপাসায় কাতর হয়ে পথ যাত্রীদের থেকে একটু জলের আশায় গেলেও মিলল না এক গন্ডুস জল। রাত বাড়লে ধীরে ধীরে শূন্য হতে থাকল ব্যস্ত ফুটপাথ। পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে কুঁকড়ে গেছিলাম সেই রাতে। ঘুম আসছিল না চোখে। শুধু আবছা হয়ে যাচ্ছিল চারিদিকটা। রাত তখন খুব গভীর। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। একটা ইটের টুকরো নিয়ে ফুটপাতেই কল্পনা চিত্রে মা কে আঁকলাম। তার উপরেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি আমার সামনে কয়েক জন দাড়িয়ে। ধীরে ধীরে লোক আরো বাড়তে থকলো। আমি অবাক হয়ে উঠে বসলাম। ভিড়ের মাঝে কোথা থেকে যেন প্রশ্ন এলো,” এটা তোমার আঁকা ?” আমি কাঁপতে কাঁপতে উত্তর দিলাম “হ্যাঁ”। তারপরেই যে যার ইচ্ছে মতন টাকা দিয়ে চলে গেলেন। অনেকে খুব ভালো ও বললেন আমার মায়ের ছবি দেখে। মায়ের দিকে তাকিয়ে ওই কটা টাকা পেয়ে চোখের জল ফেললাম। রাস্তার কলে ঠোঁট লাগিয়ে জল খেয়েই পেট ভরালাম। শুধু জল খেয়েই পেট ভরত আমার তখন। মাঝে মাঝে কেউ কিছু ছুড়ে দিলে তবেই খাওয়া জুটতো। কল্পনাতে যা আসতো তাই আঁকতাম ফূটপাথ জুড়ে। সেই আঁকাতেই কিছু পয়সা পেতাম। রাত হলে আবার একা। খুব কষ্ট হতো। কিন্তু আমার আঁকা মায়ের ছবিটার দিকে তাকালে কষ্ট গুলো লাঘব হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে মাস ঘুরতেই ছবিটাও অস্পষ্ট হতে শুরু করলো। একদিন মুছে গেল সম্পূর্ণ। অনেক কটা বছর পেড়িয়ে গেছে বাড়ির বাইরে। এখন রাস্তাই আমার বাড়ি। দু-দশ টাকা রোজগারে, জল খেয়ে পেট ভরিয়ে কোনো মতে দিন কাটছিল।একদিন আর্ট গ্যালারির পাশে ফুটপাথে বসে আঁকছিলাম। সেদিন সম্ভবত কোনো অনুষ্ঠান ছিল সেখানে। অনেক লোকের সমাগম ছিল। ময়লা জামাকাপড় মুড়ে রেখেছিল আমায় শরীর। তাই বড়ো গাড়ি তে করে আসা সুইটেড শরীর গুলো কেউই আমার দিকে ফিরে তাকাল না। ভিতর থেকে একজন সিকিউরিটি গার্ড এসে আমাকে তুলে দিল। লোক জন ভীড় করেছে তখন। ভীড় ঠেলে একজন বছর পোইষট্টি র বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। আমাকে মাটিতে পরে থাকতে দেখে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। তার হাত ধরে উঠে দাড়িয়ে মাথা নীচু করে দাড়িয়ে রইলাম। উনি প্রশ্ন করলেন, ” দেওয়ালে আঁকা ছবি টা তোমার আঁকা?” আমি মাথা নীচু করেই উত্তর দিলাম ” হ্যাঁ”।ছল ছল চোখে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে আমাকে ভীড় মুক্ত করে বললেন,” আমার সাথে যাবে ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিলাম ” কোথায়?” ” আমার বাড়ি। তোমার কোনো অসুবিধে হবে না। আমি একজন আর্টিস্ট। কিন্তু বিগত দশ বছরে তোমার মতো কাউকে দেখিনি। আর্ট গ্যালারিতে বেশিরভাগই যারা আঁকেন নিসন্দেহে তাদের মান অনেক উচ্চ। তবে তাদের আঁকায় প্রাণ খুঁজে পাই না। পাই শুধু টাকার লোভ আর নাম কেনার গন্ধ। কিন্তু তোমার আঁকায় প্রাণ আছে। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?” আমি অবাক দৃষ্টিতে তার কথা শুনে গেলাম। এতো কঠিন অথচ এতো নরম ভাবে আমার সাথে অনেক বছর কেউ কথা বলেনি। অবহেলা করেছে চোর বদনাম দিয়েছে। উনার কথায় ঘাড় নড়িয়ে সম্মতি জানালাম। উনি বেজায় খুশি হয়ে উনার গাড়িতে করে বাড়ি নিয়ে গেলেন। সেতো শুধুই বাড়ি নয় যেন রাজার বাড়ি। তবে উনি একা থাকেন। কয়েক জন পরিচারিকা ও ছিলেন উনার। সবার সাথে আমার আলাপ করিয়ে দিলেন। আর সবাই কে বললেন আমার সেখানে থাকার কথা। সকলে বেশ খুশিই হলো। আমিও আবেগী হয়ে পড়েছিলাম। মাটিতে বসে পা ধরে ধন্যবাদ জানাতে চাইলাম। কিন্তু উনি আমায় উঠে দাড় করিয়ে বললেন আমি যেন এবার থেকে শুধু আঁকাতেই মন দিই। আমিও হাত জোর করে রইলাম। চোখ ভিজে এলো। মনে মনে অনেক ধন্যবাদ দিলাম। আমার খাওয়া নিয়েও আর কোনোও সমস্যা রইল না। আমার অন্ধকার জীবনে নতুন আলোর পথ এনে দিয়েছিলেন তিনি। এর আগে অনেক বড়ো মাপের মানুষরা দু-পাঁচ টাকার বিনিময়ে নিজে খেটে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কিন্তু হাত ধরে পথ খুঁজে দেয়নি। আমার খুব খেয়াল রাখত সুধীর বাবুর পরিচারিকা রা। আমার পোষাকেও বদল এলো। আমি আঁকা তেই মন দিতে থাকলাম। এভাবে একটা বছর খুব ভালো ভাবে কেটে গেছিলো। আমার বয়স এখন খুব সম্ভবত একুশ। আমার আঁকা সুধীর বাবুর খুব পছন্দের। রোজ আমাকে উত্সাহিত করেন তিনি। আমার আঁকা গ্যালারিতে কিংবা বিক্রি করার কথাও তিনি ভেবেছেন। আমি কোনো কিছুতে না করিনি। আমি উনার কাছে কৃতজ্ঞ। প্রথম আমার একটা আঁকা বিক্রি হয় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায়। পুরো টাকাটাই উনি আমার হাতে তুলে দেন। কিন্তু আমি উনার কাছে রেখে দিতে বলি। তবুও তিনি রাজি হননি। মায়ের একটা ছবি জল রঙে এঁকে ছিলাম সেই ছবির সামনে গিয়ে মাকে সেদিন আমার প্রথম রোজগারের কথা বলেছিলাম। সুধীর বাবু আমার নামে একটা ব্যঙ্ক অকাউন্ট খুলিয়ে দেন। বছর ঘুরতে এভাবেই আমার আঁকা ছড়িয়ে পরে শহর জুড়ে। মাঝে মাঝে ডাক আসতো গ্যালারিতে প্রেস কনফারেন্সে। মাধ্যমিক পাস করেছিলাম যথেষ্ট ভালো নম্বর নিয়ে তাই কথা বলতে খুব একটা অসুবিধে হতো না। তবে সুধীর বাবুর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতাম প্রত্যেক বারই। খুব ভালো সময় কাটতে থাকে আমার। জীবনের ভালো সময় হয়ত এসেই গেছে এবার ভেবে নিয়েছিলাম। শূন্য থেকে এখন আমার বাবা সম একজন সাথে আছেন, পেট চালানোর মতো ব্যাঙ্কে টাকাও আছে। মন খারাপের সঙ্গি আঁকা ও আছে। মা-বাবা ও ছিল মনের মধ্যে ঘুমিয়ে। ডাকলেই সাড়া পেতাম। কিন্তু আমার ভালো থাকা খুব বেশি দিনের জন্য ছিল না। একটা আঁকার জন্য একদিন প্রেস কনফারেন্সে যাচ্ছিলাম। রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে সজোরে একটা বাসের ধাক্কায় মাটিতে লুটিয়ে পরি। জ্ঞান হারাই। অনেকক্ষণ পরে চোখ খুলে বুঝতে পারি আমি নার্সিংহোমে। সাড়া শরীরে হাড় ভাঙার মতো জন্ত্রণা।কে কিভাবে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে জানি না। মোটামুটি আমার তখন পরিচয় হয়ে গেছিলো আঁকার জগতে তাই আমায় চিনতে অসুবিধে হয়নি। এরপরে ডাক পরে সুধীর বাবুর। এক দণ্ড অপেক্ষা না করে তিনি চলে আসেন। জানতে পারি আমার ডান হাত কেটে বাদ দিতে হবে। শুনেই আঁতকে উঠি। সুধীর বাবু আমার বাম হাত ধরে মনে সাহস জোগায়। কিন্তু আমার ভয় আমার আঁকা নিয়ে। আমি তাহলে আর কোনো দিন ও আঁকতে পারবো না! ভয় হয় এবার যদি সুধীর বাবু আর আমাকে থাকতে না দেন। কোথায় যাব আমি! অনেক কিছু নেতিবাচক ভাবনা ঘুরতে থাকে মনে। সব বুঝে উনি নিজেই আমার মাথায় হাত রেখে অভয় দিয়ে বলেন। ” কিছু হবে না। আঁকতে পারবে না তো কি হয়েছে তোমায় আমি পড়াশুনো শেখাব। তুমি আমার সাথেই থাকবে। কোনো চিন্তা নেই।” আমি উনার কথা শুনে একটু নিশ্চিন্ত হই। তবে আঁকা হারানোর জন্ত্রণা অপারেশনের জন্ত্রানা কেও ছাপিয়ে গেছিলো সেদিন। বাড়ি ফিরে রেস্টে থাকার কথা বলেছিলেন ডাক্তার বাবু। সেই অনুযায়ি আমার দেখভাল সঠিক ই হত। আঁকা হারিয়ে অনেক মাস কেটে গেছিল। হটাৎ একদিন রাতে আমি আবার কিছু ফিরে পেলাম। ঘুম আসছিল না চোখে। বারান্দায় বসে পেন নিয়ে ডেয়ারিতে বাম হাতে আঁকিবুকি কাটছি। আঁকিবুকি কাটতে গিয়েই হটাৎ যেন একটা চিত্র ফুঁটে উঠলো ডায়েরির পাতায়। নিচে নাম সাইন করতে গিয়ে হাত কাঁপলেও বোধগম্য হচ্ছিল বটে। খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন। সকাল হতেই সুধীর বাবু কে দেখানো মাত্র উনিও উল্লাসে আত্মহারা হয়ে পড়েন। আঁকা কেই সঙ্গি করে আবার উনার উত্সাহে শুরু হয় আমার পথ চলা। পরিচিতি আবার ফিরে পাই। কয়েক মাস পরে আমার বাদ হয়ে জাওয়া হাতে নকল হাত বসানো হয়। তার পরে তিনটে বছর কেটে গেছে আজ। কয়েকমাস হলো সুধীর বাবু কে হারিয়েছি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি চলে যান আমাকে ছেড়ে। কিন্তু যাওয়ার আগে আমাকে নতুন জীবন দিয়ে গেছেন। উনার বাড়িতেই আমি আজ থাকি। আমার নিজের একটা আঁকার স্কুল আছে এখন। অনেক ছোটো ছোটো বাচ্চাদের আঁকা শেখাই আমি। আর আমার আঁকা গ্যালারিতে আজ জায়গা করে নিয়েছে। শুধু গ্যালারিতেই না। মানুষের মনেও। সবটাই সম্ভব হয়েছে সুধীর বাবুর জন্য। সোশিয়াল মিডিয়ায় ফ্যান, ফলোয়ার সবই আছে। মিডিয়ার আনাগোনা সব সময়ই লেগে আছে বাড়িতে। শূন্য থেকে শুরু করে সব ই আছে আজ আমার। শুধু রাতের বেলা একলা আকাশের নিচে মাথা রাখার মতো একটা কাঁধ ছিল না । আমার নিজের কথা শোনার মতো সেই একজন শ্রোতা ছিল না। অভাব ছিল শুধু সেই এক জনের। আজ সে আছে। আজ তাকে খুঁজে পেয়েছি অবশেষে যে আমাকে ভালোবেসেছে। পেয়েছি তাকে যাকে জড়িয়ে ধরে আবেগে ভাসা যায়। পেয়েছি তাকে যে সবার পরিচিত ঈশান কে নয়, নিজের ঈশান কে চায়। আমার আমি টাকেই যে ভালোবাসে, আগলে রাখে। সেই আয়ুশী কে পেয়েছি আমি। শূন্য থেকে অসিমে পৌছিয়েছি আজ আমি। @sush

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here