পর্ব – ১পোশাকি বাহার
বাংলার আনাচে কানাচে এখন মাল্টিন্যাশানাল কম্পানির রাজত্ব । ব্র্যান্ডের কাছে মাথা নুইয়েছে ছোটো থেকে মাঝারি সব ব্যাবসায়ই । ফুলকোপি, কলমি শাক থেকে শুরু করে চাল, ডাল, আনাচপাতি, যন্ত্রপাতি, পোশাকপাতি সবই এখন অ্যাভেলেবেল, একছাদের তলায়ে। ঝলমলে আলোয় মোরা ঝকঝকে তকতকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হরেক রকম মাল, থুরি মল মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সর্বত্র । এর দরুণ পিঁছিয়ে পড়ছে ছোটো এবং মাঝারি শিল্প । ক্ষতি হচ্ছে বাংলার আদি কুটির শিল্পের । সূক্ষাতি সূক্ষ কারুনৈপুন্য পূর্ণ কুটির শিল্প এখন বাঙ্গালির কাছে নস্টালজিয়া মাত্র। তবু শহুরে ত্রিফলা আলো পেরিয়ে খানিকটা তাকালে চোখ এরায়ে না বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুঁটির শিল্পগুলি।


বয়ন-শিল্প –
বাংলার কুঁটির শিল্পের কথা বলতে গেলে প্রথমেই উঠে আসে লাল পেড়ে তাঁত, নকশাকাটা বালুচরি বা উচ্চমানের রেশমের কথা , অর্থাৎ বাংলার বয়ন-শিল্পের কথা। রেশম চাষ, বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি-ভিত্তিক কুটির শিল্প, ভারতের শীর্ষ পাঁচটি রেশম উত্পাদনকারী রাজ্যের মধ্যে অন্যতম হল বাংলা (কর্ণাটক, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং জম্মু ও কাশ্মীর)। বর্তমানে, ভারতে উত্পাদিত কাঁচা রেশমের প্রায় 9% ভাগ রয়েছে বাংলায়। বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদিত 4 টি জাতের সিল্ক – তুঁত, তুষার, ইরি এবং মুগা এখানে চাষ করা হয়।
বাংলায় তৈরি সিল্কের মধ্যে অন্যতম হল বালুচরি, মুর্শিদাবাদী সিল্ক ইত্যাদি। সিল্ক ছাড়াও বাংলার বয়ন শিল্পকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে বাংলার তাঁত শিল্প। ফুলিয়া, শান্তিপুরি, গরদ, টাঙ্গাইল তাঁত, ধানেখালি, মলমল, মসলিন, জামদানি, কাঁথা স্টিচ, বাটিক ইত্যাদি নানান বাহারি নাম উঠে আসে বিভিন্ন গ্রাম গ্রামান্তর থেকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কঞ্জিভরম রেশম এবং বানারসি রেশমের সোনালি সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়, কিন্তু আমরা যখন টেক্সটাইল শিল্পের ইতিবৃত্তি সম্পর্কে আরও কিছুটা এগিয়ে যাই, তখন আমরা জানতে পারি যে আমাদের বাংলার তাঁতটি সবচেয়ে প্রাচীন।


বাংলায় তাঁত শাড়ি বুননের প্রথম নিদর্শন মেলে পঞ্চদশ শতাব্দীতে শান্তিপুরে (পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলাতে)। মোগল শাসনকালে শিল্পটি বিশাল রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে ও সমৃদ্ধ হতে থাকে। মসলিন ও জামদানি ছিল মুঘল দরবারের অতি জনপ্রিয় শাড়ি। ব্রিটিশ সরকার ম্যানচেস্টারের টেক্সটাইল শিল্পকে রক্ষা করতে এই শিল্পকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কঠোর প্রচেষ্টা সত্বেও ভারতে তন্ত শাড়ি ব্যবসা নষ্ট করা ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়েনি।
সূক্ষ্ম মসলিনগুলি রাজশ্রেণীতে শোভিত হত এবং তাঁত শাড়িগুলি সাধারণ লোকের ব্যাবহার্য। এই বুনন ঐতিহ্য ব্রিটিশ শাসনকালেও অব্যাহত ছিল এবং স্বাধীনতার কয়েক দশক পরে শান্তিপুরে আধুনিক বুনন কৌশলগুলির প্রবাহ দেখা গিয়েছিল যেমন তাঁতটির উন্নতি এবং জ্যাকওয়ার্ড তাঁতের প্রবর্তন যা আজও ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের পরে বাংলাদেশ থেকে বহু হিন্দু তাঁতি ভারতে পাড়ি জমান এবং পশ্চিমবঙ্গে পুনর্বাসিত হন।

লেখাঃ ঈশানী

(টিম মর্মকুটির)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here