কি রে ! কি হলো তোর ? সেই সকাল থেকে তোকে ফোন করে যাচ্ছি , ফোন রিসিভ করছিস না ! ( প্রেরণা )
– না আসলে মাথাটা একটু ধরেছিল। ( দীপ )
– কেনো ? আবার তোর মাইগ্রেনের ব্যথা হচ্ছে নাকি ?
– না না। কাল রাতে ঘুম হয়নি ঠিক করে। তাই আর কি।
– তোর মতো কুম্ভকর্ণ নাকি রাতে ঘুমায়নি! ব্যাপারটা কি বলতো?

ফোনের ওপার থেকেই দীপের ঠোঁট চাপা হাসি বুঝতে পারলো প্রেরণা।

– কি আবার ব্যাপার ! কিছুই না।
– না না ! কিছু তো বটেই। বল বল।
– আরে সত্যি কিছু না।

ময়দান থেকে এতো সহজে উঠে আসার মেয়ে নয় প্রেরণা। ফোনের ওপার থেকেই দীপ-কে একরকম চেপে ধরেছে সে। আর প্রেরনার কথার উত্তর না দিয়ে পালাবার উপায় যে নেই দীপের ,সেটা সে বেশ ভালোই বুঝেছে এতক্ষণে।

– তুই বলবি না তো ? আমি আসছি তোর বাড়ি।
– আরে শোন শোন !
– বল !
– তুই আয়।
– কি?
– আমার বাড়ি আয় ।
– কেনো রে ? এই একটু খোলসা করে বলতো।
– আয় না তুই। বুঝতে পারবি।

প্রেরণাকে ফাঁকি দিতে এবারেও পরাজিত হতে হলো দীপের। অগত্যা প্রেরণা কে বাড়িতেই ডেকে নিল দীপ।
সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে ওদের বন্ধুত্ব। দীপের ক্লাসে বসে লুকিয়ে টিফিন খাওয়া থেকে, বই এনেও বই না আনার ভান করে পুরো স্কুল বিল্ডিং ঘুরে বেড়ানোর সাথী প্রেরণা। দুজনেই হরিহর আত্মা। হাটা পথে মিনিট পাঁচেকের দুরত্ব প্রেরণা আর দীপের বাড়ির। ফোন রেখেই গায়ে কোনো রকম জামা গলিয়ে দ্রুত পায়ে এসে পৌছালো দীপের বাড়ি। কলিংবেল বাজতেই অরুনিমা দেবী দরজা খুললেন।

– আরে প্রেরণা? আয়! এই ভর দুপুরে ! বাড়িতে সবাই ঠিক আছে তো?
– হ্যাঁ মণি! সবাই ঠিক আছে। আসলে দীপের সাথে একটু কথা ছিল তাই।
– ও! ঠিকাছে তুই যা।
– হ্যাঁ মণি।

প্রেরণা দীপের বাড়ি এলেই বরাবর দরজা আগলে দাড়িয়ে থাকে দীপ। তবে এবারে তা হলো না। ঘরে ঢুকে দেখে বাইরের ব্যালকনি তে আরাম কেদারায় বসে দীপ। ঘরে ঢুকে ব্যালকনিতে আসতে দীপ উঠে বসল।

 

– কি রে ? আজ এখানে !
– হ্যাঁ। মানে,
– মানে মানে পরে করবি। আগে কি হয়েছে বলতো তোর ?
– বলছি। আগে শোন না। বলছি আমাকে একটা ভালো পাঞ্জাবী পছন্দ করে দিবি ?
– পাঞ্জাবি আর তুই ? তোকে গত সাত বছর ধরে কোন বার অষ্টমীর দিনেও পর্যন্ত পাঞ্জাবি পড়াতে পারলাম না । তুই আজ হঠাৎ বলছিস পাঞ্জাবি পড়বি!
– হ্যাঁ মানে ভেবে দেখলাম ,তুই এতবার বলছিস।

ভুরু কুচকে মিনিট খানেক চুপ করে দাড়িয়ে থেকে বিস্ময়ের ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে প্রেরণা।

– দীপ ?
– হ্যাঁ !
– প্রেমে টেমে পড়েছিস নাকি ?

প্রেরণার প্রশ্ন শুনে হতবাকের মতো তাকিয়ে থাকে সে। প্রেরণা আবার প্রশ্ন করে।

– কি রে !
( দীপ এবারে উত্তর দেয়। )
– হ্যাঁ। মানে।
– ( উত্তেজনা মিশ্রিত কন্ঠে প্রেরণা বলে ওঠে ) কি ?
– এই এই চুপ কর। মা চলে আসবে।
– আরে আসতে দে। এতো সুখবর আমার গোবর গণেশ প্রেমে পড়েছে। তা সে কে?
– নাম জানি না।
– মানে ? আরে পুরো কথা বল।
– রঞ্জিত জেঠুর বাড়ি তে থাকে। পিজি তে। মনে হয় এই বছরই এসেছে।
– আচ্ছা এইবার বুঝলাম তোর রাত জাগার কারণ আর ব্যালকনিতে বসে থাকার কারণ।
( মাথা নিচু করে হাসে দীপ। ছোট থেকেই একটু মুখচোরা স্বভাবের ছেলে দীপ।)
প্রেরণা আবার বলে,
– কেমন দেখতে ?
– খুব সুন্দর। খুব বেশি ভালো দেখতে পাইনি রে। কাল দুপুরে তোর বাড়ি থেকে ফেরার পর ব্যালকনি তে এসে দেখি রঞ্জিত জেঠু দের দোতোলার ব্যালকনিতে দাড়িয়ে। ভিজে চুলে টাওয়াল জড়িয়ে ওই চেয়ারটায় বসেছিল। আমার তখনও অতোটা কিছু মনে হয়নি। আমি যখন ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি ওরই রুমমেট কেউ ওকে ডাকতে আসে, আমি দরজার ধারে দাড়িয়ে দেখি ওকে খোলা চুলে। ভিজে চুল গুলো লেপ্টে ছিল ওর গালে চিবুকে, চোখ দুটো সেই চুলের মাঝে যেন লুকোচুরি খেলতে ব্যস্ত। দুর থেকে খুব বেশি স্পষ্ট হলো না। তবে যতোটুকু দেখেছি সারাটা দিন চোখ বুজ্লেই মনে পরছে। রাতেও অদ্ভুত অস্থিরতায় ঘুম আসেনি।
( এক নিশ্বাসে বলে গেল দীপ। )
– হুম। বুঝলাম।
– কি বুঝলি ?
– বুঝেছি যে আপনি প্রেমে পড়েছেন।
– ধ্যাত। জানি না।
– মেয়েদের মতো লজ্জা পাস না তো।
– না। ওই শোন না।
– বল!
– কি করা যায় ?
– আপাততো দু চোখ মেলে দেখ ওকে। পরের সপ্তাহে বাবা বলছিল রঞ্জিত জেঠুর বাড়ি যাবে তখনই যদি নাম জানতে পারি কিনা দেখবো।

 

প্রেরণার কথা শুনে এক লাফে উঠে দাড়ায় দীপ।

– হ্যাঁ হ্যাঁ প্রেরণা। ওর নামটা একটু জানার চেষ্টা করিস।
– হ্যাঁ কিন্তু।
– কিন্তু ?
– কি খাওয়াবি আমায় ?
– কাল বেড়োবি ?
– কোথায় ?
– ময়দান। ওখানে বাদাম ভাজা খাওয়াবি।
– ব্যাস?
– হ্যাঁ আপাততো তাইই। যেদিন প্রপস করবি সেদিন বিরিয়ানি চাই।
– আচ্ছা বেশ। পাগলি একটা।

প্রেরণা চলে গেলে আবার আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে পুনরায় কল্পনায় ফিরে যায় দীপ।

এই প্রথম কোনো মেয়েকে ভালোলেগেছে দীপের।
দীপের যে চোখ দুটো সবসময় বইয়ের পাতায় ঘোরাফেরা করতো আজ সেই চোখ পাশের বাড়ির বারান্দায় স্থির হয়েছে। রাতের ঘুমও আজ তার নিখোজ। রাত জেগে নিজের মনে একটা ছবি সে এঁকে নিয়েছে তার।

কিছুদিন এইভাবেই তাকে লুকিয়ে দেখার পর একদিন ,

স্নান সেড়ে সবে ঘরে ঢুকেছে দীপ। দক্ষিনের জানলাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছিল সে। সেদিন হটাৎ বৃষ্টি, সাথে দমকা হাওয়াও চলছে বাইরে। কোনোরকমে গায়ে গেঞ্জি গলিয়ে ব্যস্ত হয়ে জানলা বন্ধ করতে এগিয়ে যেতেই তার চোখ পরে রাস্তার ওপারে রঞ্জিত জেঠুর বাড়ির দোতোলার জানলার দিকে। তারই মতো মেয়েটিও ব্যস্ত জানলা দিতে। হটাৎই দুজনের চোখ পরে দুজনের চোখে। সেই প্রথম দীপ তার ভালোলাগার মানুষের চোখে চোখ রেখেছিল। শান্ত দুটো চোখ, আর্চ করা ভুরু, বৃষ্টি ভেজা টোল পরা গালে খোলা চুলের অবাধ আনাগোনা। সম্বিত ফিরতেই দুজনে অপ্রস্তুত হয়ে পরে। অস্থির হাতে মেয়েটি জানলা বন্ধ করতে দীপও জানলা বন্ধ করে খাটে এসে বসে। মনের অস্থিরতা যেন তার হাজার গুনে বেড়ে গেছে। বালিশের তলা থেকে ফোন বেড় করে প্রেরণা কে ফোন করে দীপ।

– হ্যালো ! প্রেরণা। এখনই আয় না একটু। কথা আছে।
– এই বৃষ্টিতে ?
– হ্যাঁ হ্যাঁ। আয় প্লিজ।
– আচ্ছা আসছি দাড়া।

মিনিট পনেরোর মধ্যে এসে হাজির প্রেরণা।

– কি রে বল? জরুরী তলব কেনো?
– আজ ওকে দেখলাম।
– হ্যাঁ সে তো রোজই দেখিস।
– আরে আজ ওর চোখ দুটো দেখলাম। অনেক্ষন।
– মানে?
– জানলা বন্ধ করতে গিয়ে , ও জানলা বন্ধ করছিল। চোখে চোখ পরে গেছিল।
– তারপর তারপর?
– খুব শান্ত ওর চোখ দুটো। টোল পরা গালে সবসময় যেন খুব মিষ্টি হাসি লেগে।
– বুঝলাম। তো এইবার নামটা তো জানতেই হচ্ছে দেখছি।
– এই প্রেরণা। একটু দেখ না প্লিজ।
– হুমম কাল এ দেখবো। তুই থাক বসে তোর নীলাঞ্জনার অপেক্ষায়।
– নীলাঞ্জনা?
– ” সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা।”
– ধ্যাত।
– হুমম আর লজ্জা পেতে হবে না। ওই আমি আসি রে। বৃষ্টি থেমেছে একটু।
– হ্যাঁ সাবধানে যাস। পৌছে জানাস।
– গার্লেফ্রন্ড এলে দেখবো কেমন আমার জন্য চিন্তা করিস।
– কি যে বলিস। তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড প্রেরণা।
– হুম। বুঝেছি। চলি।
– হ্যাঁ।

” ওর নামটাও নিশ্চই ওর মতোই সুন্দর।” মনে মনে বিড় বিড় করে বৃষ্টি ভেজা বারান্দার আরাম কেদারায় বসে এক গাল হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপ।

রোজের মতন সে রাতেও তার চোখে ঘুম আসেনি। মনের ভিতর একরাশ চঞ্চলতা। অপুর্ন মন গড়া আঁকা ছবিটার পূর্ণতার অপেক্ষায় দীপ। সকালের অপেক্ষা।

– দীপ ! কি রে তোর স্নান হলো ? আর কতো বেলা করবি ?

তার মা অরুনিমা দেবীর , দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আর মায়ের ডাকে সাড়া দিতে কোনো রকমে গলায় গেঞ্জি গলিয়ে দরজার ছিটকিনি খোলে দীপ।
ভিজে এলোমেলো চুল হাত বুলিয়ে ঠিক করতে করতে বলে ,
– হ্যাঁ! হ্যাঁ! বলো।
– কি রে তোকে না বলেছিলাম আমায় একটু মন্দিরে নিয়ে যেতে। দুপুরের মধ্যে তো ফিরতে হবে বাবু।

হাতে লাল কাপড়ে ঢাকা পুজোর থালা নিয়ে ব্যস্ততার সাথে বললেন অরুনিমা দেবী।

– বাবা কোথায়?
কথায় একটু বিরক্তির সুর চাপিয়ে বলেন ,
– তোর বাবার কি কোনো কান্ডজ্ঞান আছে? সক্কাল সক্কাল বাজার পৌছে দিয়েই উনি ক্লাবে গিয়ে গল্প করছেন।
একগাল হাসি নিয়ে আলমারির পাশের আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল আছরাতে থাকে দীপ। ছেলের ঠোঁটে হাসি দেখে একটু রেগে গিয়ে তার মা বলেন,
– হ্যাঁ তুই তো হাসবি ! যেমন বাবা তেমন ছেলে হয়েছে, এবারে তাড়াতাড়ি চল দুপুরে মধ্যে ফিরতে হবে তো নাকি ! কোনরকমে চুলে চিরুনি ছুঁয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে দীপ। ” চলো” বলে ড্রয়ার থেকে গাড়ির চাবি বের করে, অস্থির পায়ে সিঁড়ি থেকে নেমে বাড়ির নিচে মায়ের জন্য অপেক্ষা করে দ্বীপ।
প্রায় ঘন্টাখানেক ড্রাইভ করে মন্দিরে পৌছায় ওরা। বরাবরই তার মন্দিরে যাওয়া থেকে অরুচি। অগত্যা মা কে মন্দিরে নামিয়ে সে বাইরে অপেক্ষা করে। তার মন পরে আছে রঞ্জিত জেঠুর বারান্দায়। গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে যখন ফোনের স্ক্রিনে মগ্ন দীপ।

– শুনছেণ ?

পাশ থেকে হটাৎ শান্ত স্বর শুনে অন্যমনস্ক হয়ে বলে ,

– বলুন।
– বলছি একটু সাহায্য করবেন !
ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাতেই তার চোখ স্থির হয়ে যায়। মেয়েটিও অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে । এই যে তার নীলাঞ্জনা। ঠোঁট কেঁপে ওঠে দীপের। ঠোঁটের ফাঁক থেকে অস্পষ্টো স্বরে বলে ফেলে “নীলাঞ্জনা” । মেয়েটি বলে,

– কিছু বললেন ?
– না। মানে। বলুন।
– আমি আসলে কলকাতার কিছু চিনি না। ভিড়ের মাঝে মন্দিরের সিঁড়িটা খুঁজে পাচ্ছি না। একটু দেখিয়ে দেবেন?
– হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই। আপনি আসুন আমার সাথে।

বরাবর মন্দিরের সাথে দুরত্ব রাখা ছেলেটা আজ নির্বিঘ্নে মন্দিরে জেতে রাজি হলো দীপ।
ভীড় ঠেলে মোটামুটি একটু ফাঁকা জায়গা দেখে দাড়ালো দুজনে। পুজোর থালা ঠাকুর মশাইএর হাতে দিয়ে হাত জোর করে চোখ বুজে দাড়ালো মেয়েটি। সেও হাত জোরে পাশে দাড়িয়ে দীপ। এই প্রথম এতো কাছ থেকে তার নীলাঞ্জনা কে দেখছে সে। কাঁধ ছোঁয়া কানের দুলের মাঝে মুক্ত চুলের আনাগোনা, কাজল কালো দুই চোখের আড়ালে যেন অনেক গল্প লুকিয়ে। মন চাইছিল যেন সেই সব গল্পের সাক্ষী হতে। এক দৃষ্টে তাকিয়ে সে মেয়েটির দিকে। সরু আইলাইনার যেন আঁকা পোক্ত হাতে। আর্চ করা ভুরুর অসামান্য সৌন্দর্য। কোনোদিন দীপ সৌন্দর্য এর পূজারী ছিল না। কিন্তু সেই মেয়েটির সৌন্দর্য যেন গভীরের। মেয়েটির ডাকে সম্বিত ফিরল দীপের।

– আমার হয়ে গেছে। ধন্যবাদ।
– হ্যাঁ । চলুন।

মেয়েটি এগিয়ে গেলে পেছন থেকে অপ্রস্তুত হয়ে ডাকে দীপ।
– একটু দাড়ান।
– হ্যাঁ বলুন।
– আ- আপনার নামটা!
– আমি মোহিনী। মোহিনী রায়। আপনি ?
– আমি দীপ। দিপায়ন চৌধুরী।
– আমাকে তুমি করে বলতে পারো।
– ( মোহিনীর কথায় একেবারে মোহিত হয়ে পরেছে দীপ) হ্যাঁ। ধন্যবাদ। আচ্ছা চলো।
– দীপ!
(মোহিনীর মুখে দীপ নাম টা শুনতেই দীপের উত্তেজনা ক্রমশ বেড়ে উঠল।)
– হ্যাঁ। বলো।
– ( ঠোঁটে লাজুক হাসি এঁকে বলে) আমাকে নীলাঞ্জনা নামেও ডাকতে পারো।

মোহিনীর কথায় হতবাক হয়ে দাড়িয়ে রইল দীপ। মেয়েটি এগিয়ে গেছে তখন। দীপের মনে তখন হাজার হাজার প্রজাপতির আনাগোনা। সে মায়ের কথা বেমালুম ভুলেও গেছে। ইতিমধ্যে তার মা তার পেছনে এসে দারিযেছে তবু তার খেয়াল নেই।

– দীপ!
– ( অবাক চোখে সে মায়ের দিকে তাকায়) হ্যাঁ !
– দীপ ? কি রে ! কি হলো ?
– হ্যাঁ! ও মা ! বলো।
– তুই মন্দিরে ?
– না, মানে হ্যাঁ একজন সিঁড়ি খুঁজে পাচ্ছিল না তাই।
– আচ্ছা একজন !
– হ্যাঁ। একজন।
– হুম বুঝেছি। চল।
– কোথায়?
– এখানেই থাকবি ? নাকি বাড়ি গিয়ে তার নাম টা জানবি?

মায়ের কথায় রীতিমত অবাক হয়ে যায় দীপ।

– মানে?
– তোমার নীলাঞ্জনার নাম টা জানতে হবে তো নাকি?
– ( সে এতক্ষণে বেশ বুঝেছে যে তার মা সব জানে, লাজুক হাসি হেসে বলে , ) তুমি জানো?
– হ্যাঁ ! দীপ আমি তোর মা। সব দিকে নজর রাখি আমি।

এক গাল হাসি ঠোঁটে এঁকে বলে, ” চলো”

মন্দির থেকে বেড়িয়ে বাড়ি ফেরে দীপ। ঘরে এসে দেখে রঞ্জিত জেঠুর বাড়ির দোতলার বারানদায় বসে মোহিনী। দীপ কে দেখতে পেয়ে সেও একরকম আড় চোখে তাকিয়ে। ব্যপারতা দীপের নজর এড়ালো না। প্রত্যেকবার সে মেয়েটির চোখের স্নিগ্ধতায় স্থির হয়েছে। এবারেও তার অন্যথা হলো না। মেয়েটিও তার দিকে তাকিয়ে। হটাৎই ঘরে প্রেরণা আসায় দীপের হুশ ফিরল।

– কি রে? মোহিনীর সাথে দেখা হলো ?
( প্রেরণার কথায় অবাক হয়ে দীপ প্রশ্ন করে, )
– মানে ?
– মানে মন্দিরে একসাথে পুজো দেওয়া হলো ?
– প্রেরণা !
– কি ? বোকাবনে গেলি তো?
– হ্যাঁ মানে।
– শোন, তোকে বাড়িতে না দেখে কাকু কে জিজ্ঞেস করতে জানলাম তুই আর মণি মন্দিরে গেছিস। তো আমি আর মোহিনী মন্দিরে গেলাম। আমি নিজে থেকেই ভিড়ে ওকে একা করে দিই যাতে ও তোকে খুঁজে তোর সাথেই কথা বলে। আর ওর নাম টা তুই ওর থেকেই শুনতে পারিস।

দীপের ঠোঁটের হাসি আরো চওড়া হয়ে উঠলো প্রেরণার কথায়।

– কিন্তু ও কেন আমার সাথে!
– এই জন্যেই তুই গোবর গনেশ। মেয়েদের মন একদম বুঝিস না।
বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল প্রেরণা।

মাস দুয়েক পেড়িয়ে গেছে। এভাবেই বারান্দায় দাড়িয়েই ওদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। কিন্তু ভালোবাসি কথাটা এখনো বলা হয়নি তাদের।
কলেজের ফাঁকে মাঝে মধ্যে দুজনে বেরিয়ে পড়ত ময়দানে, কখনো বা কফি হাউস , কখনো আবার বই পাড়া। মোহিনীর কলকাতা চেনানোর একমাত্র সঙ্গি দীপ। দীপ লক্ষ করেছিল মোহিনীর বই এর প্রতি টানটা একটু বেশিই। রবিবার করে দুজনে বেরিয়ে পরত বই পড়ায়।

এমনই এক রবিবার, দুজনে বেরিয়েছে বই পাড়ায়। দীপের জন্মদিন সেদিন। মোহিনী জেনেও বুঝতে দেয়নি সে দীপ কে। সেদিন বইপাড়ায় সে দীপের আড়ালে তার জন্য প্রিয় বইটা সে কিনেছে তার হাত খরচের টাকা থেকে।
ফেরার পথে, ঘড়ির কাটায় তখন সন্ধ্যে আটটা। ব্যস্ত কলকাতার শূন্য গলি দিয়ে হেটে চলেছে দুজন। হলুদ আলো গুলো রাস্তার উপরে আল আধারি খেলা করে চলেছে। হাটতে হাটতে আচমকা দীপের হাত শক্ত করে ধরে মোহিনী।

– মোহিনী ?
মোহিনী কোনো কথা না বলে দীপের জন্য কেনা বইটা দীপের হাতে দেয়। দীপ রঙিন কাগজে মোড়া প্যাকেট দেখে মোহিনী কে প্রশ্ন করে,
– কি এটা?
মোহিনী চুপ করে থাকে, তার চোখ ভিজে। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে মোহিনী। দীপ কিছু বুঝতে না পেরে আবার প্রশ্ন করতে দীপ কে জড়িয়ে ধরে মোহিনী। দুজনের চারিপাশের সময় যেন তখন থমকে গেছে। কম্পিত হাতে বাহু ডোরে সে আগলে নেয় মোহিনী কে। মোহিনীর গাল দুটো ধরে সে চোখ রাখে তার চোখে।

– কি হয়েছে মোহিনী ?
– আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারবো না দীপ।
– আমায় ছাড়া কেনো থাকবে?
– আমার ভয় করছে। সবাই হারিয়ে যায়। সময় হারিয়ে দেয়।
– আমি যাব না তোমায় ছেড়ে। বিশ্বাস করো একবার।
– সবাই বলে। কিন্তু দিন শেষে সবাই চলে যায় । কেউ থাকে না।
– আমি থাকবো। মিলিয়ে নিও। কিন্তু হটাৎ করে তুমি এইসব কেন ভাবছ?
– আমি তোমায় ভালোবাসি দীপ।

মোহিনীর কথায় দীপেরও চোখ ভিজে আসে। সে আবার জড়িয়ে নেয় মোহিনী কে তার বুকে। দুরে কোথাও থেকে একটা চেনা গান ভেসে আসে,

“যদি তারে নাই চিনি গো
সে কি নেবে আমায় চিনে
এই নব ফাল্গুনের দিনে
জানি নে জানি নে ।।”

মোহিনীর গাল দুটো ধরে চোখ মুছিয়ে দেয় দীপ। মোহিনীর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় দীপ। নীরব সম্মতিতে মোহিনীর ঠোঁটে ঠোঁট রাখে দীপ।

একটা সম্পর্কের শুরু কখনো এই ভাবেও হয়। নামহীন একটা সম্পর্ক। যেখানে শুধুই বিশ্বাস। হারানোর ভয় টাও অনেক সময় ভালোবাসার প্রকাশ।

“সে কি আমার কুড়ির কানে
কবে কথা গানে গানে
পরাণ তাহার নিবে কিনে
এই নব ফাল্গুনের দিনে
জানি নে জানি নে ।। ”

গল্পটা হয়তো এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু নদীর যে একপাড় গড়ে অপর পাড় ভাঙে।
প্রেরণা আর দীপের সম্পর্কটা কেবল প্রিয় বন্ধুত্বের গণ্ডিতে বন্দি থাকলে হয়তো গল্পটা এখানেই শেষ হতো।

সেদিন বাড়ি ফেরার পর ফ্রেশ হয়ে ঘরে এসে ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে ওঠে। প্রেরণার।

” দীপ ! তোর সাথে জীবনের অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছি। সব সময় পাশে থেকেছি। কিন্তু এবারে আমাকে আমার তোকে দেওয়া কথার খেলাব করতেই হবে রে। আমি আজ রাতের ফ্লাইটে পুনে চলে যাচ্ছি। ভালো থাকিস। ”

প্রেরণার অপ্রত্যাশিত মেসেজে চোখ ভিজে ওঠে দীপের। প্রেরণার আকস্মত কিছু না জানিয়েই চলে যাওয়ার কারণ বুঝে উঠ্তে পারে না দীপ। বার কয়েক ফোন করেও কোনোরকম যোগাযোগ করতে পারেনা সে। এয়ারপোর্টে পৌছিযেও একবারের জন্যেও সে দেখতে পেল না প্রেরণা কে। এয়ারপোর্ট পৌছাতেই মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল প্লেন। সেই ফ্লাইটেই প্রেরণা ছিল খবর নিয়ে আরো ভেঙে পরল দীপ। তবুও উত্তর তার কাছে অমিল। প্রিয় বন্ধুকে ছাড়া তার যে এক একটা দিন ও একএকটা বছর।

কলকাতার বূক থেকে উড়ে গেল প্রেরণার ফ্লাইট। তার এইভাবে চলে যাওয়ার কারণটা শুধুই প্রেরণা জানে।

জানলার ধারে মেঘেদের পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রেরণা। ” আমি যে তোকে ভালোবেসেছিলাম দীপ। মেয়েদের মন তুই একদম বুঝিস না। “

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here