কয়েকটা ভালো থাকার গল্প পাশাপাশি বারবার দুঃস্বপ্নে ভাসছিল, মেয়েটা ঘামতে শুরু করলো, ঘুম ভেঙে গেল। ওয়াশরুম থেকে চোখে মুখে জল ঝাপটা নিয়ে, রুমে এসে আয়নার সামনে বসলো।
আয়নায় চোখ রেখে সাজগোজ করছিল, ভীষণ হাসছিল। আসলে মনখারাপ হলে একটু নাচ-গান করে মুড ফ্রেশ করে। চোখে বেশ মোটা করে কাজল পরলো, তার গয়নার বাক্স থেকে পায়ের আঙট্ আর ঘুঙুর পরলো।
ঠোঁটে কালো লিপস্টিক পরনে একটা সাদা শাড়ি আর গাঢ় লাল ব্লাউজ; বারান্দায় থাকা রজনীগন্ধা ফুল তুলে খোঁপায় লাগলো। বেশ পরিপাটি করে পায়ে আলতা পরলো।

তারপর ফোন থেকে অদ্ভুত একটা গান চালিয়ে দরজা বন্ধ করলো, ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটি মোমবাতি জ্বলছে, সামনে ড্রেসিং টেবিলে আয়নায় বারবার চোখ রাখছে আর মুচকি হাসছে।
ঘরের মধ্যে, একটা কাচের পাত্রে জলের মধ্যে রাখা রক্তগোলাপ-টা ধীরে ধীরে কালো হতে শুরু করলো, গোটা ঘরটা কালো ধোঁয়ায় ঘোলাটে হয়ে আসছে, একটা দম বন্ধ করা পরিস্থতিতে মেয়েটা আয়নার দিকে চেয়ে সমানে পৈশাচিক নৃত্য করে যাচ্ছে।

 

কিছুক্ষণ পর, মোমবাতির আলো গাঢ় অন্ধকারে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, তারপর যেটা ঘটলো সেটার জন্য মেয়েটা মোটেই প্রস্তুত ছিল না!
বাইরে তখন মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, ঝড় উঠেছে, বৃষ্টি হচ্ছে না কিন্তু বাজ পড়ছে; যেন ওই রুমের উপরেই বাজ পড়তে চাইছে, কিন্তু বাড়ির সামনে ইলেকট্রিক খুঁটি থাকায় রক্ষে পেয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সেই মোমবাতির শিখায় ফিকে হয়ে ফুটে উঠলো ঠিক আজকের তারিখে — আজ থেকে দু বছর আগের ঘটনা, ছেলেটার নাচ খুব প্রিয় ছিল, এখানে সেখানে পাগলের মতো নাচ দেখে বেড়াতো; একবার ওই নাচ দেখেই এক মেয়ের প্রেমে পড়ে, তাকে সবকিছু জানায়, অল্প বিস্তর কথা চলতে থাকে। কয়েক মাসের মধ্যে তারা ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে তারপর সম্পর্কে আবদ্ধ হয়, ছয় মাসের মাথায় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত পাকা হয়।

এমন সময় সেই ছেলেটা তারই এক বান্ধবীর নাচে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়, আস্তে আস্তে নিজের প্রেমিকার প্রতি টান কমতে থাকে! সে যেন ওকে তার নাচের মায়ায় হাতছানি দিয়ে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রাখতে চাইছে কিন্তু ছেলেটা নিষ্কৃতি পেতে চায় তার থেকে।
কখনো রাত করে বাড়ি ফিরে, কখনো মদ গাঁজা একসাথে সেবন করে বাড়ি আসে। চৌঠা জুন রাতে বাড়ি ফিরে দেখে তার প্রেমিকা তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, মেয়েটা সাজগোজ করে নাচ দেখাবে বলে! ওদিকে কারেন্ট নেই, মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, রুমে একটা কাচের বাটিতে বড়ো একটা মোমবাতি জ্বলছে।
ছেলেটি কিছুতেই এসবের জন্য প্রস্তুত ছিল না, কথা কাটাকাটি , তুমুল তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়; কেউই কম নয়, কথায় কথা বাড়ে, পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যায়, ছেলেটা মেয়েটাকে কয়েকটা চড় থাপ্পড় মারে। উল্টো জবাবে মেয়েটা হাতের সামনে থাকা ফুলদানি দিয়ে ছেলেটার মাথায় সজোরে মারে; প্রচন্ড রক্তারক্তি ছেলেটা কিছুক্ষণের মধ্যে ওখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।

 

রাগের মাথায় মেয়েটা সর্বনাশ করে বসে, মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে; তারপর মেঝেতে লেগে থাকা সমস্ত রক্ত মুছে ফেলে, লাশটা কে একটা বড়ো বস্তার মধ্যে বেঁধে নিয়ে, নিজের চারচাকায় করে দূরের কোন এক নদীতে ফেলে আসে, সেই রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল আর আজকের মতোই বাজ পড়ছিল।
লাশটা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময়, ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় লেগে থাকা কয়েক ফোঁটা রক্ত খেয়াল করতে ভুলে যায় আর ধস্তা-ধস্তির সময়, ছেলেটার হাতের আংটি টা মোমবাতি জ্বালানোর কাচের বাটিতে গাঁথা হয়ে গেছে, মোমবাতি গলে সেই আংটি ঢাকা পড়ে যায়!
মেয়েটা এখনো ওই নাচের পোগ্রামে যায়, রাত-বিরেতে বেশিরভাগ দিন বাইরে কেটে যায়, যেকটা রাত ওই রুমে থাকে তখন লোডশেডিং তেমন হয় না, স্বভাবতই সেই কাচের বাটিতে অর্ধেক মোমবাতি ভর্তি হয়েই রয়েছে, সেটা রিপ্লেস করার প্রয়োজন হয় নি!

মেয়েটা এখন নাচতে নাচতে খেয়াল করলো, আজ সকালেই তো পড়ার ছেলেপুলে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাচটা ভেঙে ফেলেছে, তাহলে এতক্ষণ ধরে আয়নায় কাকে দেখছিল?
সেই বলটা ছিটকে এসে ওই মোমবাতির বাটিতে লেগে সেটাও চুর্ন বিচূর্ণ হয়ে গেছে, আর আংটির ওই হীরে লাগানো অংশ টা কিছুটা মোমের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। মেয়েটা নতুন একটা কাচের বাটিতে সমস্ত মোম সমেত মোমবাতিটা রেখে দিয়েছে, বাকি সব ভাঙা কাচ কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েই তার হাত কেটে যায়!

 

কাচ নতুন রক্তের স্বাদ পায়; আর ওই আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই ছেলেটা এতদিন তার প্রেমিকাকে নিজের হাতে সাজিয়ে এসেছে, পায়ে আলতা পরিয়ে দিয়েছে, ঘুঙুর বেঁধে দিয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টি হলে কারেন্ট চলে গেলে মোমবাতি জ্বালিয়ে নাচ দেখিয়ে নিজের প্রেমিককে মনোরঞ্জন করতো, তারপর দুজনের শারীরিক কিছু একটা ঘটোতো…!
আজকের তারিখটা মনে পড়তেই মেয়েটা আঁতকে উঠে! মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করে, আয়নার সামনে থাকা ওই কালো ছায়া তাকে মায়ায় টানতে থাকে, সে ক্রমশ তার কাছে এগোয়, হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁতে যাবে এমন সময়, শাড়ির আঁচল ওই জ্বলন্ত মোমবাতির নাগালে আসে, আঁচলে লেগে সেটা পায়ের কাছে এসে পড়ে, দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আগুন, নিমিষের মধ্যে মেয়েটার সারা শরীর পুড়ে যায়।

পুড়ে যাওয়া মাংসের দিকে এখনো ঠিকরে পড়ছে সেই আংটির উপর পড়া মোমবাতির শিখার আলো…🔥

— উৎপল দাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here