“আমার আবার ফেরার সময় একটু পান না খেলে ঠিক হয়না বাপু”, বললো দিপু।
শুরুতেই বলে রাখি, দিপু হলো আমার কাজের জায়গার সঙ্গী, শুধু সঙ্গী বললে হয়তো ভুল হবে, ও হলো গিয়ে যাকে বলে একবারে “পরম বন্ধু”।

‘হা হা!
তা এতই যখন পান খাওয়ার শখ! চাকরিটা ছেড়ে একটা পানের দোকান খুলে ফেললেই তো পারিস’, বললাম আমি।
যাই হোক রোজ রাতের মতো দুজনে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছিলাম। তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
আর একটু এগিয়েই দিপুর বাড়ি। ওকে বিদায় জানিয়ে আমি রওনা দিলাম আমার গন্তব্যের দিকে। রোজের মতো আজও একটু দেরি হয়ে গেল।
গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে পৌঁছলাম আমার বাড়িতে। (আমি মধ্যবিত্ত মানুষ, না আছে বউ-এর চিন্তা, আর না আছে সন্তানের মায়া, তাই একটু দেরি করেই বাড়ি ফিরি রোজ)
চারিদিকে বেশ ভালোই অন্ধকার হয়ে এসেছে। শীতের রাতে এটাই আশা করা স্বাভাবিক। আস্তে করে গেটটা আটকে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দরজায় দুটো টোকা দিলাম, ‘শিবু…. এই শিবু কোথায় রে দরজা খোল।’
ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো, “হ্যাঁ বাবু যাই….”।
‘কোথায় থাকিস বলতো? জানিস না, আমি কাজ থেকে আসার সময় কত ক্লান্ত থাকি। যাইহোক, কেউ এসেছিল নাকি আমার খোঁজ করতে.??’

শিবু বললো, “আজ্ঞে বাবু না তো, কেউ তো আসে নাই।”
‘ আচ্ছা, ঠিক আছে। যা, তুই এক কাপ গরম কফি রেডি কর দেখি, আমি ততক্ষণ স্নানটা সেরে ফেলি।’
(শীতকাল হোক বা গরমকাল আমার বাপু কাজ থেকে এসে স্নান না করলে কেমন যেন গা-হাত-পা চুলকোয়)
আমি চলে গেলাম স্নান করতে আর শিবু গেল রান্না ঘরে আমার জন্য কফি বানাতে।
পাক্কা কুড়ি মিনিট পর স্নান সেরে এসে চুলটা আঁচড়িয়ে সোফায় বসতে যাবো হঠাৎ কে যেন খুব জোরে জোরে দরজা বাজাতে লাগলো।
আমি বললাম,’ এই শিবু, দেখ তো কে এলো (মনে মনে ভাবলাম “এতো রাতে আবার কে রে বাবা”)
শিবু গিয়ে দরজা খুলতেই যে ভদ্রলোক আমার সামনে এসে উপস্থিত হলেন, তাঁর সারা শরীরে চাদর জড়ানো, হাত-পা-মুখ সব কিছু সেই চাদর দিয়ে ঢাকা। শুধু একদম হালকাভাবে দেখা যাচ্ছে ওনার চোখ দুটো। একদম শান্ত প্রকৃতির মানুষদের যেরকম চোখ হয়, ঠিক সেরকম।
“আপনি তো সুমনবাবু, তাই না?”, জিগ্গেস করলেন তিনি।
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার নাম সুমন অধিকারী। কিন্তু আপনাকে ঠিক….’, কথাটা শেষ করার আগেই উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে টেবিলের ওপর একটা বাক্স রাখলেন।
তারপর আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উনি বলে চললেন, “আমি শ্রী রমেন মহাপাত্র, আপনার বন্ধু অমর গাঙ্গুলি আমার কলেজের সহপাঠী ছিলেন। উনিই আমাকে পাঠিয়েছিলেন আপনার কাছে, ওনার এই বাক্সটি দিয়ে….”

আমি তাঁকে না থামিয়ে পারলাম না। আমি বললাম ‘আরে, বেটা অমর পাঠিয়েছে আপনাকে?
হা-হা-হা, মশাই ও বেটা নিজে না এসে আপনার ঘাড়ে এই দায়িত্ব চাপিয়ে দিলো। দাঁড়ান ওকে একটা ফোন করি…..।’ আমি ফোনটা জাস্ট করতে যাবো ঠিক তখনই আমাকে বারণ করে উঠে দাঁড়ালেন লোকটি।
“না থাক, অমর কাজে খুব ব্যস্ত। তাই তো আমাকে পাঠিয়েছিলেন। আপনি শুধু শুধু ওকে ফোন করবেন না”, বললেন ভদ্রলোকটি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘না, মানে এতো ব্যস্ত যে ফোনটাও তুলতে পারবে না.?’
“হুমম…”, বলে চুপ হয়ে গেল লোকটি।
‘শিবু, যা তো, আরেক কাপ কফি নিয়ে আয়।’ বলতেই “হ্যাঁ বাবু যাই”, বলে শিবু চলে গেল রান্নাঘরে।
‘আচ্ছা আপনি এলেন কিসে.?’ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
“প্লেনে”, লোকটি বললেন।
— তা এত রাতে আসতে কোনও সমস্যা হয়নি তো.?
— না। বরং ভালোই হয়েছে। রাতের অন্ধকারে একটু সুবিধাই হয়েছে।
— আচ্ছা। যাইহোক, আজ রাতে কিন্তু আমার এখানে থেকে খেয়ে তারপর যেতে হবে, ঠিক আছে?ভদ্রলোক সম্মত হলেন।
— আচ্ছা আপনি থাকেন কোথায় মশাই.!! শিবুর বাড়ির ওখানেই.??
— না ঠিক ওখানেই নয়, তবে ওখান থেকে বেশি দূর ও নয়।
— বেশ। তাহলে আপনি বসুন, আমি একটু আমার ঘর থেকে আসছি।
এই বলে সবে উঠতে যাবো এমন সময় চোখটা গেল ওনার হাতের দিকে আর লক্ষ করলাম, লোকটার হাতে কালো কালো কীসব যেন লেগে আছে। আমি ভাবলাম হয়তো কোথাও পড়ে গিয়েছিলেন। যা অন্ধকার জায়গা।
হঠাৎই তিনি আবার বলে উঠলেন,” একটু দাঁড়ান, একটা কথা ছিল।”
“হ্যাঁ, বলুন না”, বললাম আমি।
“আপনি সত্যিই সুমনবাবু তো.?”
(আমি একটু হেসে বললাম) ‘হা হা হা… আরে মশাই হ্যাঁ, আমিই সুমন আর আমার ছোট বেলার বন্ধুই হলো আপনার সহপাঠী অমর। কেন আপনার সন্দেহ হচ্ছে নাকি.!! তাহলে একটা ফোন করি অমর কে..?? কি বলেন..’

“আরে, না, না, ঠিক আছে”, খানিক লজ্জিত হয়ে বললেন তিনি।
এরপর আমি চলে গেলাম আমার ঘরের দিকে।
বাইরে বেশ ভালোই হওয়া দিচ্ছে। তাই শরীরটা মাঝে মধ্যেই কেঁপে উঠছে। আলমারি থেকে চাদরটা বের করে গায়ে দিয়ে ফাইল গুলো জায়গায় রাখতে যাবো এমন সময় শিবু চেঁচিয়ে উঠলো, “বাবু… ও বাবু”
আমি দৌড়ে গেলাম। ওমা! গিয়ে দেখি সোফায় কেউ নেই শুধু টেবিলে বাক্সটা পড়ে আছে। আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে শিবুকে বললাম ‘কোথায় গেল রে লোকটা.??”
” আজ্ঞে আমিও তো তাই জন্যই আপনাকে ডাকলাম। আমি কফি নিয়ে এসে দেখি দরজা খোলা আর লোকটি নেই।” ভয়ে ভয়ে বললো শিবু।
লোকটা গেল কোথায়! ভাবতে ভাবতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, পাশের ঘরে জানালার দিকে দুটো চোখ জ্বলছে। মনে হচ্ছিল, যেন কোনও আগুনের শিখা জ্বলছে। (যেহেতু ঘরটা তখন অন্ধকার, সব লাইট বন্ধ। আমি রীতিমত ভয় পেয়ে গেছিলাম)।চাপা স্বরে বললাম, ‘কে ওখানে?’
ঘর থেকে আওয়াজ এলো, “আমি রমেন”। সেটা শুনে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলাম ঘরে।
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, ‘আপনি তো ভয় দেখিয়ে দিয়েছিলেন মশাই। উফফ্! বাপরে!’
এই প্রথম লোকটার মুখ দিয়ে একটা হাসির শব্দ পেলাম মনে হয়।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি থাকুন এখানে। আমি আমার কাজটা সেরে আসছি। তারপর খেতে বসবো’, বললাম তাঁকে।

“বাবু তাহলে কফিটা.!!” বললো শিবু।
‘ওটা আর দিতে হবে না। তুই বরং খাবার দিয়ে দে টেবিলে। আমি আসছি…’ বলতে শিবু চলে গেলো।
ফাইলগুলো ফেলেই দৌড়েছিলাম তখন। সেগুলো ঠিক করে রেখে সব কাজ মিটিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম।
‘কই, রমেনবাবু আসুন, খাওয়া-দাওয়াটা সেরে ফেলি, তারপর গল্প হবে’, বলে দেখি ঘরে তো কেউ নেই। রমেন বাবু…. না কোনও সাড়া দিচ্ছেন না। “আপনি কি বাথরুমে.!!” না তাও কোনো সাড়া নেই। ওদিকে দরজাটাও তো দেখি খোলা। (লোকটা এতো রাতে বেরিয়ে গেল নাকি.!)
‘এই শিবু কোথায় রে’, বলে হাঁক দিতে, সেও
“হ্যাঁ বাবু যাই….” বলে সাড়া দিল।
— কই কোথায় গেলেন উনি.??
— আমি তো দেখিনি বাবু।
(এই অন্ধকারে কোথায় গেল লোকটা! দুশ্চিন্তা বেড়ে গেলো।)
বাক্সটা কিন্তু তখনও ওই টেবিলেই পড়ে রয়েছে।
আমার আর সেটা খোলার সাহস হলো না। (যদি খারাপ কিছু হয়, ঠিক ভরসা পেলাম না খোলার)
ভাবলাম কাল একবার পুলিশে খবর দেবো। ওরা যা করার করবে। শিবু খাবার দিলো। আমি রাতের খাবার খেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
শীতকালের রাতের আকাশের দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। আকাশের সেই দৃশ্যটাকে উপভোগ করতে করতে কখন যে ঘুম চলে এলো, আর মনে নেই।

(পরদিন সকালে)
— শিবু রে, এক কাপ চা দিবি বাবা।(ঘুম থেকেই আমার চা লাগেই)
— হ্যাঁ বাবু দিচ্ছি।
দেখলাম বাক্সটা তখনও টেবিলেই পড়ে আছে। শিবুও হাত লাগায়নি।
মুখ দিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে চা টা মুখে দিতে যাবো, তখনই ফোনটা বেজে উঠলো….
ফোনটা তুলতে ওপাশ থেকে যার গলা পেলাম সে আর কেউ নয় আমার বন্ধু “অমর”।
“কি.. সুমন অধিকারীবাবু, ভালো আছেন তো.??”
(বুঝলাম আমার নাম সমেত পদবি ধরে মজা করে ডাকা অভ্যাসটা ওর এখনো যায়নি)
আমিও বললাম, কিহে অমর গাঙ্গুলি এতদিন বাদে মনে পড়লো বুঝি.??
” হা হা হা… তুই আর বকিস না তোর তো কাজটাই সব। না করলি বিয়ে আর না করলি ঘর-সংসার”।
— হ্যাঁ, সেই তো, নিজে তো বিয়ে করেছিস। বুঝছিস তো কেমন মজা লাগে বিয়ে করলে, বললাম আমি।
— আচ্ছা ছাড় এসব। যেটার জন্য ফোন করেছিলাম। তোর মনে আছে তোর সেই মূল্যবান বাক্সটার কথা.!
(কথাটা শুনে মনে একটু শান্তি পেলাম আর বুঝলাম তাহলে এই বাক্সটা অমর-ই পাঠিয়েছে। যাক বাবা আর চিন্তা রইলো না।)
আমি বললাম, হ্যাঁ…. সে তো এখন….
(কথা শেষ করার আগেই অমর বললো)
— হ্যাঁ, তোর বাক্সটা আমি আমার এক বন্ধুর হাতে পাঠিয়েছিলাম তোর কাছে। বুঝতেই তো পারছিস আমি কতটা ব্যস্ত থাকি, তাই ওকে দিয়ে পাঠিয়েছিলাম…
— আরে হ্যাঁ সেটা তো…..
আবার আমাকে থামিয়ে দিলো অমর বলল,
“তুই আজকের পেপারটা দেখেছিস.??”
আমি বললাম, ‘এই রে, আজকের পেপার তো দেখা হয়নি। কেন বলতো.?’
— একবার দেখ তারপর বলছি, বললো অমর।
— শিবু… আজকের পেপার টা কোথায় রে…
— বাবু টেবিলের ওপরেই আছে।
— দাঁড়া দেখছি…
(পেপার এর প্রথম পাতায় একটা প্লেন দুর্ঘটনার ছবি। রাত ন’টা বেজে কুড়ি মিনিটে প্লেন দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৯০ জনের)
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ দেখলাম। খুব খারাপ লাগলো দেখে। একজন মানুষ মারা গেছে..’
“হ্যাঁ ওই প্লেনটাতেই ছিল আমার ওই বন্ধু….”
কথাটা শুনেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল, জোরে চেঁচিয়ে বললাম ‘কি……………..!’
ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেলো, মাটিতে বসে পড়লাম আমি।

দূরে টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাক্সটা ওখানেই রয়েছে”…..

লেখা : রুপম দাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here