“কানাইদা, তুমি আগে আমার জিনিসগুলো দাও। আমার পরে সবাইকে তখন থেকে ছেড়ে যাচ্ছ”, বিরক্ত হয়ে কথাটা বলে শিবেন।  এমনিতেই পাবজি ছেড়ে উঠে আসতে হয়েছে, তার উপর এসে থেকে দাড় করিয়ে রেখেছে আর বয়স্ক লোকেদের ছেড়ে যাচ্ছে। আরে শিবেন ছোকরা বলে কি সময়ের দাম থাকবে না?

“হ্যা রে, শুনলাম তোর পিসি নাকি হঠাৎ চলে এসেছে। কি ব্যাপার? পিসেমশাই তো আসে নি। সব ঠিক আছে তো?” চালের ব্যাগটা কাউন্টারে রাখতে রাখতে জিজ্ঞাসা করল কানাইদা।  এই হচ্ছে সমস্যা। পাড়ার মুদিখানা দোকান মানেই সেটা হল নিন্দাচর্চা করার আখরা। কানাইদা হল সেখানকার স্যাটেলাইট। পাড়ার চারিদিকে এর ওর ঘরের খবর ছড়িয়ে দেয়। 

“তুমি আগে একটু হাত পা চালিয়ে কাজটা কর। ভর দুপুরে খদ্দেরকে দশ পনেরো মিনিট দাড় করিয়ে রাখছ। আবার এর ওর খবর জানা”, কথাটা বলেই ব্যাগটা উঠিয়ে নেয় শিবেন। আজ দুদিন হল শিবেনকে ওর মা উঠতে বসতে এটা ওটা আনতে বলছে। বাবাকে বলতে পারছেনা কারন, দু দিন ধরে বাবা আর মায়ের মধ্যে খুটখাট লেগেই আছে। আর এর কারণ হল পিসি। আজ চার দিন হল পিসি হঠাৎ দুম করে চলে এসেছে শিবেনদের বাড়িতে। এমনিতে পিসি খুব একটা আসত না। তাই যখন এল, তখন সবাই বেশ খুশি হল, কিন্তু সমস্যাটা বাঁধল যখন জানা গেল যে পিসি শশুরবাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে। প্রথমে কি নিয়ে সমস্যা সেটা জানায় নি পিসি। তবে পিসি কে যে উঠতে বসতে কথা শোনাতো পিসেমশাই ও শাশুড়ি সেটা বাড়িতে সবাই জানত।  তারপর পরশু রাতে বাবা পিসিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতেই আসল ব্যাপার জানা গেলে। পিসেমশাই নাকি ব্যাবসার নামে বাইরে গিয়ে হোটেলে কারোর সাথে রাত কাটিয়ে এসেছে। সব কিছু জেনে পিসি কিছুতেই আর শশুরবাড়ি ফিরতে চায় না। বাবাও বোনকে বলতে পারছেনা শশুরবাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু মা বুঝিয়েই যাচ্ছিল, “আরে ওরকম আধ একটু হয়। তুমিই বা ঠিকঠাক বরকে বেঁধে রাখতে পারো না কেন। কই আমাদের স্বামীরা তো এসব করে না।” পিসি একটাও কথা বাড়ায় নি। শুধু বলেছিল কটা দিন থাকতে দাও, তারপর কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেব। মা পিসির ঘর থেকে বেরিয়ে আমার ঘরে ঢুকে গজগজ করতে করতে বলেছিল, ” মুরোদ আছে নাকি কিছু করার? দাদার ঘাড়ে পড়ে খেতে এসেছ তুমি। আমি কি কিছু বুঝিনা।” 

শিবেন মা কে চুপ করাতে যাবে কি বাবা ঘরে ঢোকে। আর তারপরই শুরু হয় ঝগড়া ঝামেলা।  শিবেনের এইসব পারিবারিক কচকচানি বিরক্ত লাগে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় আসে। দেখে পিসিও নিজের ঘরের বারান্দায় দাড়িয়ে। চুলগুলো খোলা, হওয়াতে উড়ছে। মাঝে মাঝে চোখের জল মুচছে। মা বাবার কথাগুলো পিসির কানে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সে দরজাটা বারান্দা থেকে লাগিয়ে দেয়। পিসি এমনি খুব ভালো। যদিও বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আর পিসির সাথে খুব একটা কথা হয়না শিবেনের। এবারেও পিসি আসার পর শিবেন শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল কেমন আছে। উত্তরে পিসি খুব মলীন একটা হাসি হেসেছিল। 

বাড়ি এসে শিবেন বইয়ের তাক গোছাচ্ছিল। গেম খেলতে খেলতে মোবাইলের চার্জ শেষ। এদিকে চার ঘণ্টা হতে চলল লোডশেডিং হয়ে আছে। কি করবে কি করবে ভেবে বইয়ের তাক গোছাতে শুরু করল সে। যদিও এর আগে বইয়ের তাক তার মাই গোছাত। এই কমাস আগেও বই পড়ার কত সখ ছিল শিবেনের। যেদিন থেকে হাবলাটা ওকে পাবজি ধরালো, সেদিন থেকে সব শেষ। সায়ান্তনী পূততুন্ডর বইটা মুছতে গিয়ে হঠাৎ পিছনে আর একটা বই চোখে পড়ল। এ বই তো শিবেন কেনেনি কখনও। বইটা বার করে হতে নিল সে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখের বালি। বইটা অনেক পুরনো আর ধুলোয় ভর্তি।  বইয়ের পাতা উল্টে সে আরো অবাক হল। প্রতিটা পাতায় ছয় সাত লাইনের হাতে লেখা চিঠি। অনেক সময় পেনের লেখা, ছাপা অক্ষরগুলোর উপর দিয়ে চলে গেছে। দু ধরনের হাতের লেখা। প্রথম পাতার লেখাটা পড়তে যাবে তখনই ঘরে মা ঢোকে। 

“মা এই বইটা কার?” শিবেন মা কে জিজ্ঞাসা করে। শিবেনের মা বইটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। 

“এটা আগের ভাড়াটে কাকিমার থেকে নিয়েছিলাম। দেখেছিস, ফেরত দেওয়া হয়নি। দে তো আমায় ওটা। কাল তো মাধবিতলার দিকে সেলাই করতে দেওয়া শাড়িগুলো আনতে যাব, তখন দিয়ে দেব। ওরা তো এখন ওদিকটাতেই থাকে।” মা বইটা নিয়ে চলে গেলে শিবেন অবাক হয়। এর আগে যে  ভাড়াটে থাকত, সেই কাকিমা বেশ জাঁদরেল মহিলা ছিলেন। সারাক্ষণ মুখে পান ভরে স্বামী আর ছেলেকে হুকুম করে যেতেন। সে নাকি চোখের বালি পড়ত। অবাক হওয়ার মাঝেই দরজায় টোকা পড়লে শিবেন পিছনে ঘোরে। পিসি দাড়িয়েছে দরজার সামনে। 

“আরে পিসি, ভিতরে এস।” শিবেন হাসি মুখে বলে। 

“বাঃ, কত  বইরে তোর। সব নতুন নতুন লেখকের নাকি?” বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে পিসি বলে। 

“হ্যা বেশিরভাগ। পুরনো ক্লাসিকগুলোতো লাইব্রেরীতেই পাওয়া যায়।”। 

“আচ্ছা আচ্ছা, বলেই পিসি শিবেনের দিকে ঘোরে। “শোন না, আমায় একটা ছোট্ট সাহায্য করে দিবি? “

পিসির কথায় অবাক হয় শিবেন। শিবেন কি সাহায্য করতে পারে? ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় শিবেন। 

“তোর মনে আছে, ক্লাস সেভেনে তোকে একজন অঙ্ক আর ইংরিজি পড়াতে আসত, বাসুদেব ঘোষ। তার নাম্বার আছে তোর কাছে? আমায় একটু নাম্বারটা দিবি?” পিসির কথা শুনে শিবেন অবাক হয়। বাসুকাকাকে পিসি এখনও মনে রেখেছে? বাসুকাকা যখন শিবেন কে পড়াতে আসত  তখন পিসির বিয়ে হয়নি। চা দিতে আসার সময় পিসি আড় চোখে বাসুকাকাকে দেখত, আর বাসুকাকাও হাসতো। তখন শিবেন সবে পাকতে শুরু করেছে, তাই পিসি আর বাসু কাকার ব্যাপারটা বুঝতে পারত। কিন্তু কিছুদিন পরই ব্যাপারটা বাড়িতে জানাজানি হয়ে যায়। দাদু তখন বেঁচে ছিল। বাবা বাসুকাকাকে ছড়িয়ে দিল। এক মাসের মধ্যে বাবা আর দাদু পিসির জন্য ছেলে খুঁজে বিয়ে দিয়ে দিল। বিয়ের সময় পিসি এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি। এমন কি বিদায়ের সময় পিসি দাদু বা বাবা কারোর দিকে না তাকিয়ে সোজা সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে উঠেছিল। হয়ত অভিমানে, বা বাসুকাকাকে হারানোর কষ্টে পিসি শক্ত হয়ে গিয়েছিল।  এতদিন পর পিসি আবার বাসুকাকার নাম্বার চাইছে, কিন্তু কেন? বিস্ময়ের মধ্যেই শিবেন উত্তর দিল, “হ্যা আছে। কারেন্ট এলে, মোবাইলটা অন করে দিচ্ছি”। 

সুতপা একটা রিক্সা ডেকে তাতে উঠে বসল। পাড়ার সামনে থেকেই রিক্সাটা নিল। ভাড়া বেশি পড়বে একটু। কিন্তু কিছু করার নেই। পাড়ার মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলে, হাজার জনকে হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বেলা এখন অনেকটা বড়। তাই হয়ত রাস্তার লাইটগুলো এখনও জ্বালায় নি। শিবেনের থেকে বাসুদেবের নাম্বারটা প্রথমে চাইতে কেমন একটা লাগছিল। কিন্তু না চাইলে আর কোন উপায়ও ছিল না। যদিও শিবেন ওর মায়ের মত না। সুতপার সাথে যে খুব একটা কথা বলে সেটা নয়, তবে উঠতে বসতে দুদিন বৌদি যেভাবে কথা শোনাচ্ছে, তাতে শিবেন সঙ্গ দেয় না। উল্টে মনে হয়, মাঝে মাঝে শিবেনও বিরক্ত হয়। বাসুদেব প্রথমে সুতপার গলা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল। চুপ করে ছিল কিছুক্ষন। শেষে জড়ানো গলায় দেখা করার সময় ও স্থানের কথা বলেছিল। এখন সুতপা যাচ্ছে নিউল্যান্ড রেস্টুরেন্টে। ওখানেই আসবে বাসুদেব। 

রিক্সা এসে দাড়াল রেস্টুরেন্টের সামনে। ঘড়িতে ছটা বেজে গেছে। মানে বাসুদেব ভিতরে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ বুকটা কেমন করতে আরম্ভ করল সুতপার। এসব তো স্কুলের মেয়েদের হয়, তার মত মাঝ বয়সি অসহায় মহিলাদের হয় নাকি? ভিতরে ঢুকে আজ দশ বছর পর বাসুদেবকে দেখল সুতপা। সেই চোখ, সেই ঠোঁট, গাল ভরা দাড়ি। শুধু চুলগুলো একটু পাকা। 

প্রায় কুড়ি মিনিট হয়ে গেছে দুজনে বসে আছে। দু একটা কথা হয়েছে। অবশ্য কথা বলা ভুল, দুজন দুজনের দিকে তাকিয়েই কাটিয়েছে। 

“তাহলে তুমি আর তোমার হাসবেন্ডের কাছে ফিরে যাবে না?” বাসুদেব জিজ্ঞাসা করে। 

“না বাসুদা। আমি একটা চরিত্রহীনের সাথে কিভাবে থাকব? যদি ও অন্যকরোর প্রেমে পড়ত, আমি মেনে নিতাম। প্রেম হারানোর দুঃখ আমি জানি। তাই কারোর জীবনে প্রেম এলে আমি বাধা দেব না। কিন্তু ওর প্রতিরাতে আলাদা আলাদা মেয়ে চাই। এটা তো একরকম বিকৃত নোংরা মানসিকতা। এরকম কাওকে স্বামীর পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে।” কথাটা অনেকটা ঘৃণা নিয়ে বলে সুতপা। 

“তাহলে তুমি কি ভাবছ?” বাসুদেব জিজ্ঞাসা করে। 

“আমি এখানেই থেকে যাব। দাদার বাড়ি বেশিদিন বসে বসে থাকতে পারবনা। বৌদি উঠতে বসতে অনেক কথা শোনাচ্ছে। দাদাও আমাকে নিয়ে ফালতু চিন্তায় পড়ে যাবে। তাই তোমায় বলছি, একটা কাজ দেখে দেবে আমায়? যতদিন না ভালো কিছু কাজ পাচ্ছি, দুটো টিউশুনি দেখে দাও। অন্তত নিজের হাত খরচটা চালাই। দুটো টাকা দিতে পারলে অন্তত বৌদির কথা শোনা থেকে রেহাই পাব।“ সুতপা কথাটা বলে মুখটা নামায়। গালের পাশ দিয়ে আঁকা বাঁকা পথে জল গড়িয়ে আসে। বাদুসেবের ইচ্ছা হয় আবার আগের দিনগুলোর মত সুতপার চোখের জল মুছে দিতে। কিন্তু সেই অধিকার কি বাসুদেবের আছে? সে জলের গ্লাসটা এগিয়ে দেয় সুতপার দিকে। 

“আমায় পরশু অব্দি সময় দাও। টিউশুনির ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। আর তোমার সার্টিফিকেটগুলো সব আছে তো সাথে?” বাসুদেব জিজ্ঞাসা করে। সুতপা নাক টেনে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোক জল খেয়ে বলে, ” যা হোক একটা চাকরী দেখে দাও। খুব বেশি মাইনের না হলেও হবে। এখন শুধু বাকি জীবনটা বেঁচে থাকা নিয়ে কথা।” 

বাসুদেব সুতপাকে এতটা অসহায় কখনো দেখেনি। 

“বাসু দা”, সুতপা আবার বলে, “কিছু মনে যদি না কর, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?”

“মনে কেন করব, বলো”। 

” আমি কিন্তু চাইনা তোমার জীবনে আমায় নিয়ে নতুন কোন সমস্যা হোক। তোমার পরিবার আছে। তারা আমার ব্যাপারে জানলে কিভাবে মেনে নেবে আমি জানি না। তাই যদি খুব অসুবিধা থাকে তো বলে দিতে পারো। আমি তোমার উপর আলাদা করে কিছু চাপাতে চাই না। আমি এই শহরে কাওকে চিনিনা। তাই কিছুটা বাধ্য হয়েই আজ ছুটে এলাম।” সুতপার কথা শুনে বাসুদেব ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। সুতপা অবাক হয় সেটা দেখে। 

“আমার তো কোন পরিবার নেই সুতপা। তুমি যাওয়ার পর আমি তো আর কাওকে ভালোবাসতে পারলাম না। আর ভালোবাসা ছাড়া মানুষ কিভাবে পরিবার বানাতে পারে বল? 

সুতপা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “মানে? তোমার স্ত্রী? তোমার বিয়ে?”

“বিয়ে তো আমি তোমায় করব বলে ঠিক করেছিলাম সুতপা। আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে। তুমি তো এলে না। আমি অপেক্ষা করেছিলাম রেলগেটের কাছে । তুমি অন্য আর এক ঘরে চলে গেলে। সাথে আমার স্বপ্নগুলকেও ভাসিয়ে দিয়ে গেলে।“  বাসুদেব কথাগুলো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে সুতপাকে বলে। 

সুতপা যেটা শুনলো সেটা আশা করে নি। বাসুদা তার জন্য আর কাওকে বিয়ে করে নি? মনে পরে গেল ১০ বছর আগের সেই দিনের কথা। সুতপা আর বাসুদেব একসাথে কলেজ থেকে ফিরত। বাসুদেবের কলেজ শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তাও সে সুতপার জন্য কলেজ আসত।  এছাড়া শিবেনকে পড়াতেও যেত বাসুদেব । সে সময় ফোন ছিল না আর চিঠি কারোর হাতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল, তাই বই এর বিভিন্ন পাতায় তারা ছোট ছোট চিঠি লিখত। নিজের চোখের বালি বইয়ের এক পাতায় রোজ কিছু না কিছু লিখে সুতপা কলেজ নিয়ে যেত। ঢোকার মুখে সেটা বাসুদেব কে দিত। বাসুদেব ফেরার পথে পাশের পাতায় উত্তর লিখে বইটা সুতপা কে ফেরত দিত।  কিন্তু একদিন বাড়িতে ওদের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। বাড়ি থেকে ছেলে দেখা শুরু করলে সুতপা বাসুদেবের সাথে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। সুতপা সে কথা বইয়ে লিখে সেদিন কলেজে ঢোকার মুখে বাসুদেবকে দেয়। ফেরত দেওয়ার সময় বাসুদেব শুধু জানিয়েছিল সময় ও ঠিকানা লেখা আছে। দূরে বৌদিকে বাজারের ব্যাগ হাতে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আর বইটা খোলার সাহস হয়নি সুতপার। সুতপা বাড়ি ঢুকলেই তার বাবা তাকে ডেকে পাঠায়। জানায় কাল থেকে তার বাইরে বেরোনো বন্ধ। একটা ছেলেও দেখা হয়েছে। সামনের মাসের শুরুতেই বিয়ে। সুতপা ঘরে এসেই বইটা ব্যাগে খুঁজতে লাগল। তার বাসুদা কোথায় তার জন্য দাড়াবে সেটা দেখা দরকার। কিন্তু বইটা ব্যাগে পাওয়া যায় নি। আর কোথাও পাওয়া যায় নি। তার বাসুদা কোথায় তার জন্য অপেক্ষা করবে সেটা সুতপা আর জানতে পারে নি। কোন যোগাযোগ করতে পারেনি বাসুদেবের সাথে। কিন্তু আজ সুতপা ভাবতেই পারে নি, সেদিনের পর বাসুদেব নিজেকে আর একটাও সুযোগ দেবেনা। সে সেদিনের কথা সব খুলে বলে  বাসুদেবকে। কান্নায় ভেঙে পরে সুতপা। কিন্তু এই কান্না কিছুটা খুশির। কারন তার বাসুদা আজও শুধুই তার। সেদিন রেস্টুরেন্টে দুজনেই অনেকক্ষন হাত ধরে বসে ছিল। আসেপাশের লোকেরা ব্যাপারটা হয়ত অন্যকিছু ভাবছিল, কিন্তু সেদিকে ওদের দুজনের কোন খেয়াল ছিল না।  

ঘরের ভিতরে ঢুকেই দরজাটা লাগিয়ে শিবেন খাটে বসে পড়ে। সে হাফ্যাচ্ছে। আজ সে কিছুটা সন্দেহ নিয়েই পিসির পিছন পিছন যায়। তারপর পিসি যখন রিক্সা থেকে নামে, কায়দা করে আগে রেস্টুরেন্টে  ঢুকে কোণের টেবিলে বসে পড়ে। বাসুদেবও শিবেন কে দেখতে পায় নি। ওই কোনটায় যে বসে তাকে রেস্টুরেন্টের আর কেও দেখতে পায় না। প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্যই বানানো ওটা। কিন্তু শিবেন পিসিদের দেখতেও পাচ্ছিল, শুনতেও পাচ্ছিল। পিসি আর বাসুকাকার কথা গুলো শুনে নিজের মায়ের উপর ঘেন্না আসছিল তার। শিবেন সকালে যে বইটা পেয়েছিল সেটা পিসির বই। আর শিবেন এটাও বুঝেছিল যে সেদিন পিসির ব্যাগ থেকে বইটা মা লুকিয়েছিল। শিবেন জানে না তার দাদু , বাবা , মা এসব করে কি পেয়েছিল, কিন্তু সেদিন পিসিকে অন্য জায়গায় বিয়ে না দিলে আজ পিসি সুখে থাকত, ভালো থাকত। 

শিবেন উঠে গিয়ে মায়ের আলমারিটা খোলে। বইটা চোখে পড়ে। শিবেন পাতা উল্টে শেষ চিঠিটা পড়তে থাকে। মাত্র কটা লাইন লেখা। “সুতপা, তুমি জানতে চেয়েছ আমি তোমার দায়িত্ব নিয়ে পারব কিনা। আমি পারব। তুমি শুধু একটু কদিন ভাত ডালে মানিয়ে নিও। দুটো কাপড়ে কোনরকম চালিয়ে নিও। একবার মাস্টারির চাকরীটা পাকা হয়ে গেলেই তোমার যত্নের কোন ত্রুটি রাখব না। তুমি পারবে না আমার ভালোবাসায় কটা দিন একটু কষ্টে কাটিয়ে দিতে? যদি পারো, তুমি কাল বিকেল ছটা নাগাদ রেলগেটের কাছে এস। আমি অপেক্ষা করব। ছোট ঘর আমার, কিন্তু দুজন মিলে সেই ঘরটা সুন্দর করে বাঁধব।” 

শিবেন বাইরে দরজা খোলার আওয়াজ পায়। পিসি এই ফিরল। আর সাথে সাথে মাও চিৎকার করা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর শিবেন নিজের ঘরের দরজা খুলে দেখল মা রান্না ঘরে আর পিসি স্নানঘরে। শিবেন ধীরে ধীরে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। 

সুতপা স্নান ঘর থেকে বেরোয়। বৌদি এখনও চিৎকার করে যাচ্ছে। তবে সুতপার সে সবে কিছু যায় আসছে না। আবার অনেক দিন পর মনের কোণে হালকা খুশির হওয়া ছুয়ে যাচ্ছে। সে নিজের ঘরে আসে। বিছানায় ওটা কি নামানো? সুতপা এগিয়ে যায়। তার সেই পুরনো চোখের বালি বইটা। শেষ চিঠির পাতাটা খোলা অবস্থায় রাখা।

লেখক – রজত সাহা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here