ঘোষ বাড়িতে আজ খুশির রেশ,কেননা এই বাড়ীর একমাত্র ছেলের আজ বিয়ে । সারা বাড়ীতে আত্মীয় স্বজন গিজ গিজ করছে । তাই ঘোষ গিন্নীর আজ জল পানের সময় টুকু নেই ,একা হাতে সব তদারকি করছেন। ওনার কর্তা বছর বারো আগে ইহলোকের মায়া কাটিয়ে পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন । একা হাতে তিনি ছেলে সৌম্যকে মানুষ করেছেন ঘোষ গিন্নী অহনা দেবী ।ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ,এখন ছেলে সরকারী চাকুরীজীবি । উনি আর ওনার কর্তা কত স্বপ্ন দেখেতেন এই দিনটা কে ঘিরে,এত বছর পর আজ কর্তার অনুপস্থিতি যেন বেশি পীড়া দিচ্ছে ।আঁচলে চোখ মুছে আবার কাজে লেগে পড়লেন উনি ।ছেলে নিজে দেখে শুনে বিয়ে করছে ,যদিও মিলির সাথে বার তিনেক দেখা হয়েছে । মেয়েটা বেশ আত্মীয়সু,ভালোই লেগেছে অহনা দেবীর ।

সৌম্যর বিয়ের লগ্ন রাত নয়টায়,হৈ হৈ করে সকলে বরযাত্রী গেলো । পড়ে রইলেন শুধু উনি একা । বিয়ে দেখে সকলে ফিরে এলো সেই রাতেই ।
উনি আত্মীয়দের জিজ্ঞসা করলেন বৌ কেমন হয়েছে ? ভালোই , বলে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করলেন ।
তবে ওনার ছোট বোন চন্দনা বলে উঠলো,দিদি তোর বৌ তো দেখতে শুনতে ভালোই, তবে একটু মুখরা আর বাচাল । ￶অত্যাধিক কথা বলে ,তোর ঠিক বিপরীত রে দিদি … 

চন্দনার সাথে তাল মিলিয়ে ওনার 
ননদ ও বললো ,হ্যাঁ বৌদি আমিও চন্দনার সাথে একমত ,বৌ সুবিধার হবে না । দেখো কয়েক মাসের মধ্যে হাঁড়ি আলাদা করবে ওই মেয়ে ।
মনে কাঁটা বিঁধলো ওনার ,হালকা হেসে বললেন কি জানি গো ,সময় কথা বলবে ।

রাত তখন দুটো,শুয়ে পড়লেন অহনা দেবী ,নিজেকে তো আড়াল করতেই হতো,সবাই জানে উনি শক্ত মানুষ তাই লোকের সামনে ভেঙে পড়লে চলবে কেন ? কিন্তু একান্তে দু ফোঁটা অশ্রু নির্গত হলো ওনার চোখ থেকে ,ওরা কি করে কয়েক ঘন্টায় মিলিকে বুঝতে পারলো ? উনি তো তিন বারেও পারেননি । যাইহোক তবু তো পুএবধূ ,উনি ওনার কর্তব্য পালন করে যাবেন । তবুও মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে রইলো ।

পরেরদিন সকাল দশটা,গাড়ীর হর্ন জানান দিলো বর-কনে চলে এসেছে । চন্দনাও বরণ ডালা সাজিয়ে রেডী । অহনা দেবী তো বিধবা ,তাই এই সকল শুভ নিয়ম থেকে বাত্য । পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন অহনা দেবী । মিলিকে খুব সুন্দর লাগছে ,কিন্তু ওনার এমনই কপাল যে নিজের ছেলের বৌকে বরণ অবধি করতে পারবেন না । ওরা সামনে আসতেই চন্দনা উলু ধ্বনি দিতে শুরু করলো ।

একি আপনি বরণ ডালা ধরে কেন ? মামনি কোথায়? অবাক হয়ে বলে ফেললো মিলি ।

নববধূর এমন কথা শুনে হচকচিয়ে গেলো চন্দনা ,আমতা আমতা করে বললো দিদি তো বিধবা তাই শুভ জিনিসে হাত লাগবে না ।

মা কখনো অশুভ হয়?? মামনি এসে আমাকে বরণ করুক নাহলে এই ঘরে ঢুকবো না | মিলির স্বরে দৃঢ়তা ।

আড়াল থেকে সমস্ত ঘটনাটা দেখছিলেন অহনা দেবী,ওনার মনের কালো মেঘ সরে গিয়ে যে চাঁদের আলো উদিত হলো । লোকজন কে উপেক্ষা করে চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু নির্গত হচ্ছে ওনার | না উনি মানুষ চিনতে ভুল করেননি ।
চন্দনার হাত থেকে বরণ ডালা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন ,এই দেখ এবার তোর মামনি তোকে বরণ করে ঘরে তুলবে ।

এবার তুই খুশি তো ? খিলখিলিয়ে হেসে মিলি বললো খুবব…

লেখিকা – সঞ্চারী চ্যাটার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here