দু পা পিছিয়ে ফুটপাতে উঠে দাড়ালো মেয়েটা। মেয়েটার সামনে জনোয়ারগুলো দাঁত-জীভ বার করে দাড়িয়ে আছে। সব গুলোই চার পেয়ে। অন্যসময় হলে এদের শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে নেড়ি কুত্তা বলে চলে যাওয়া যেত, কিন্তু রাত ১০টা বাজলেই রাস্তার কুকুরগুলো নিজের চেহারা পাল্টে নেয়। মেয়েটা বেশ ভয় পেয়েছে। বড় রাস্তা হলে এইসময় তাও দু একটা লোক থাকে, কিন্তু এরকম আধা অন্ধকার গলিতে প্রতি রাতেই এই এক গল্প। একটা সিগারেটের দোকানও এখানে নেই, যে দুটো সুখ কিনতে লোকে রাস্তায় নেমে আসবে। নাহ্, এবার নিচে নামা উচিত। নাহলে মেয়েটা হয়ত হার্টফেল করেই মরবে।
গায়ে জামাটা গলিয়ে, মনের মধ্যে শক্তিমানের সাহস ভরে সঞ্জীব নিচে নেমে এল। আজ দু বছর হল সঞ্জীব দমদম এসেছে। ইউনিভার্সিটির চাপে না তার সেরকম কোন বন্ধু হয়েছে না সাথী। প্রেমিকার কথা তো ছেড়েই দেওয়া যায়। এখানে কাওকে সে চেনেও না। তাই কাটোয়া শহরের সেই পাড়ার হিরো টাইপ ফিলিংসটা আবার ফিরে এল মনের মধ্যে।
দরজা খুলে রাস্তায় নেমে আসে সঞ্জীব। মেয়েটা তার থেকে একটু দূরে দাড়িয়ে। এক চুলও নড়ছেনা কুকুরের সামনে থেকে। ওদিকে কুকুরগুলো গরররর গরররর করে মেয়েটার দিকে নিশানা তাক করে আছে। একটু নড়লেই দাঁত বসিয়ে দেবে। সঞ্জীব হতে একটা লাঠি নিল। কুকুরগুলো ওর দিকেও তেড়ে আসতে পারে যেকোন সময়। একটু এগোতেই মেয়েটার মুখটা প্রথম ঠিকঠাক ভাবে দেখল সঞ্জীব। আর দেখা মাত্রই ৭০ টাকার জোড়া চপ্পল পরা পা টা আটকে গেল। চোখটা বড়ো করে আরো একবার দেখলো সঞ্জীব। যা দেখছে সেটা সমন্ধে নিশ্চিত হওয়া দরকার। ডলি, ও দমদমে কি করছে? এটা সেই ডলি , যার জন্য একটা সময় সঞ্জীব কি না করতে বাকি রেখেছে। স্কুলের মাঠে বটগাছের উপরে ওঠা থেকে, দিনের পর দিন পিছন পিছন টো টো করে ঘোরা সব করেছে। আশিসদার মত স্যারের কাছে অঙ্ক পড়লেও ডলির জন্য পরিমলের মত খাজা স্যারের কাছে আর একটা অংক টিউশন নিয়েছিল সঞ্জীব। শুধুমাত্র ডলিকে প্রসাদ তুলে দেবে বলে সেবার স্কুলের পুজোয় অ্যাসিস্ট্যান্ট পুরোহিত অব্দি হয়েছিল। সেই ডলি আজ দাড়িয়ে সামনে, ভীত, অসহায়। সঞ্জীব আর কিছু না ভেবে সোজা লাঠি উঠিয়ে তেড়ে গেল কুকুরগুলোর দিকে। ওরাও হয়ত এই অকস্মাৎ আক্রমণ আঁচ করতে পারে নি। ঘেও ঘেউ করতে করতে অনেকটা পিছিয়ে গেল।

মেয়েটা ঘামে নেয়ে গেছে একবারে । এখনও হাফাচ্ছে। শুধু সঞ্জীবের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সঞ্জীব তাকিয়ে হাসে। ডলি একটু সামলে নিয়ে হাসি ফিরিয়ে দেয়।
“ধন্যবাদ”, ডলি বলে।
“আবার ধন্যবাদের কি আছে।” গদ গদ হয়ে উত্তর দেয় সঞ্জীব।
“তুমি এখানে?” ডলি জিজ্ঞাসা করে।
“ঐতো, তোমায় বাঁচাতে”, কথাটা বলেই সঞ্জীব বুঝতে পারে মাখনটা একটু বেশি লাগানো হয়ে গেল। ডলি হেসে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। যাক, মেয়েটা হাসছে, এখন এটাই অনেক।
“আমি জিজ্ঞাসা করছি, তুমি দমদমে কিভাবে?” স্বাভাবিক হয়ে জিজ্ঞাসা করে ডলি।
“মাস্টার্স করছি। এখানেই একটা রুম ভাড়া নিয়ে আছি। তুমি কলকাতায়?”
“আমি ফ্যাশন ডিজাইনের একটা কোর্স করছি। ফাঁড়ির দিকে একটা মেসে থাকি”।
এত কাছে থাকে ডলি। কথাটা ভেবেই একটা আনন্দের ঢেউ পেরিয়ে গেল সঞ্জীবের মনে। সে জিজ্ঞাসা করল, “তা এত রাতে এই গলি দিয়ে ফিরছ?”
“আসলে মেন রোডটা খোড়া হয়েছে, তাই ভাবলাম গলি দিয়ে চলে যায়। বুঝতে পারিনি গলিটা এত শুনশান, আর তার উপর কুকুর ভর্তি।”
“আর তুমি কুকুর খুব ভয় পাও” সঞ্জীবের মুখে কথাটা শুনেই ডলি লজ্জায় মাথা নামিয়ে দেয়। সঞ্জীব স্কুলে পড়ার সময় দেখেছে, টিউশন থেকে ফেরার পথে কুকুর দেখলেই ডলি দাড়িয়ে পড়ত। যতক্ষণ না কোন লোক আসছে গলিতে, ঠায় দাড়িয়ে থাকত। সঞ্জীব সেটা বুঝেই অনেকবার সেই গলিতে সাইকেল থামিয়েছে। ডলিও সঞ্জীবকে দেখে পাশে পাশে হেটে বেরিয়ে গেছে। হায় ডলি, এক বার যদি বুঝত , সঞ্জীব কেন সাইকেল থাকতেও গলিটা হেঁটে হেঁটে পেরোচ্ছে।
“আচ্ছা চল, তোমায় মেন রোড অব্দি পৌঁছে দি” সঞ্জীব হাতের লাঠিটা সাইডে ছুড়ে ফেলে দেয়।
“না না ঠিক আছে, আমি চলে যাব”
” শোন, এই পুরো গলি জুড়ে কুকুরে ভর্তি। আর তোমায় মেন রোডে উঠিয়েই চলে আসব, মেস অব্দি যাব না ” কথাটা বলেই সঞ্জীব হাসে। ডলি ও হেসে সম্মতি জানায়। দুজনে হাঁটা শুরু করে।
“তা তুমি অটো কেন করনি? এত রাতে কেও হেঁটে বাড়ি ফেরে?”, সঞ্জীব জিজ্ঞাসা করে।
“আজ অটো স্ট্রাইক, আর আমি এমনিতে হেঁটেই ফিরি। সারাদিন তো সেরকম হাঁটার সুযোগ থাকে না”, ডলি উত্তর দেয়।
“তাহলে একটা ক্যাব করে নিতে। এত রাত্রে এভাবে একা আসার মানে নেই।” সঞ্জীব এর কথাটা শুনে ডলি চুপ করে যায়। ওর এই বোকামির কোন উত্তর নেই।

ডলি কে সঞ্জীব প্রথম দেখেছিল বারো ক্লাসের কৃষ্ণবাবুর টিউশনিতে। সঞ্জিবদের ব্যাচ বেরোচ্ছিল , আর ডলিরা ঢুকছিল। ডলির মুখের হাসি দেখে রীতিমত ছিটকে গেছিল সে। এরকম খুনখারাপি মার্কা দেখতে মেয়ে যে ওদের কাটোয়াতে আছে সেটাই জানত না সঞ্জীব। কানের কাছে এসে রাহুল ছোট্ট করে নামটা বলেছিল, ডলি চক্রবর্তী। এই সেই মেয়ে, যে কটোয়াতে ছেলেদের মহলে চক্রবর্তীর মেয়ে নামে বিখ্যাত। সেই রাতে বাড়ি ফিরে পড়াশোনা তো হয়ই নি , উল্টে চোখের সামনে সেই হাই ব্রাইটনেসের হাসি বার বার এসে যাচ্ছিল। না, এই মেয়েকে না পেলে সঞ্জীবের জীবনটায় রদ্দি মার্কা টায়ার এর মত বৃথা হয়ে যাবে। এর পরই ডলি যে যে টিউশনে পড়ে, সেখানে ভর্তি হওয়ার প্ল্যান করে সঞ্জীব। কিন্তু চাইলেই তো সব হয় না। টিউশন এ পড়তে টাকাও লাগে। তাই বাড়িতে কোন রকম ম্যানেজ করে অতিরিক্ত একটা অঙ্ক ও ফিজিক্স টিউশনিতে ঢুকে গেল। তবে তাতে সব সমাধান হল না। গোটা শহরে এরকম হিরোইন মার্কা দেখতে মেয়ে খুব কম আছে, কিন্তু সিঙ্গেল ছেলের সংখ্যা অনেক। তাই কদিনেই সঞ্জীব টের পেল, প্রতিযোগিতায় তার আগে অনেকে আছে। কেও কেও চর থাপ্পরও খেয়েছে, কিন্তু ডলি কোনোদিন কোন ছেলের দিকে ঘেঁষে নি। তবে সঞ্জীব লেগে থাকল। যেহেতু ডলির বাড়ি ওদের স্কুলের গেটের একদম সামনে, তাই প্রতি শুক্রবার ডলি কে দেখতে বট গাছে উঠে বসে থাকত সঞ্জীব। কারন ঐ একটা দিন ডলির কোন টিউশন থাকে না, আর বিকালটায় ডলি ছাদে পায়চারি করে। সব কিছু এভাবেই চলছিল। চার মাসের মাথায় সঞ্জীব ডলি কে শুধু একটা হাই বলতে পেরেছিল। উত্তরে ডলি বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়েছিল। ব্যাস, তারপর আর আগ বাড়িয়ে নিজের থেকে কথা বলার সাহস হয়নি ডলির। তবে সঞ্জীব খেয়াল করত, ডলি তার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে, তা ঐ গোটা আট মাসে তিনবার তো হবেই। এর পর সেবারের সরস্বতী পুজোয় একটা কার্ড নিয়ে গেছিল সঞ্জীব, ডলি কে প্রপোজ করবে বলে। কার্ডের ভিতরে একটা ক্যাডবেরি সিল্কও ভরে দিয়েছিল।নিজে দিতে পারবেনা বলে ডলির বন্ধু রেনুকে হাত করেছিল সঞ্জীব। দূর থেকে সঞ্জীব দেখেছিল, রেনু ডলিকে কার্ডটা দিলে, কট কট চোখে ডলি একবার তাকিয়েছিল। তারপর সোজা বাড়ি ঢুকে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে ফোনের দিকে তাকিয়ে বসেছিল সঞ্জীব। কার্ডে সে নাম্বারটা লিখেছিল, হয়ত ফোন করবে একবার। কিন্তু কোন ফোন আসে নি। হঠাৎ একটা অপমানিত হওয়ার ভয় তাড়া করছিল সঞ্জীবকে। ঐ দুটো অতিরিক্ত টিউশন ছেড়ে দিল সে। তারপর উচ্চমাধ্যমিক শেষে সঞ্জীব চলে এল কলকাতায়। সেভাবে আর বাড়ি গিয়ে থাকা হয় না তার। গেলে অবশ্য সঞ্জীব চাইত, একবার যদি রাস্তায় ডলিকে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু তারপর থেকে আর ডলিকে দেখেনি সঞ্জীব। চাইলেই এই ক বছরে একবার ডলির বাড়ির সামনে গিয়ে দাড়াতে পারত সে। কিন্তু সেদিনের সেই রাগ ভরা চাহনী সেই সাহস কখনও দেয় নি।

“কি হল, কোথায় হারিয়ে গেলে”, ডলির ডাকে বর্তমানে ফিরে আসে সঞ্জীব।
“না, ভাবছিলাম কটোয়াতে তোমার সাথে কথা বলার সাহস সুযোগ দুটোই হয় নি। কিন্তু মজাটা দেখ, আজ তুমি আর আমি একসাথে হাঁটছি”, কথাটা বলেই সঞ্জীব বুঝল শেষ লাইনটা আবার বেশি মাখন দিয়ে ফেলেছে।
“তুমি কি সবসময় এরকম চিজি লাইন মারো মেয়েদের?” ডলি জিজ্ঞাসা করে।
“বিশ্বাস কর, আমি কিন্তু বলতে চাইছি না, মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। মানে আমার কথার অর্থ কিন্তু একদম সৎ।”
“ঠিক আছে ঠিক আছে, বুঝেছি” ডলি হেসে থামিয়ে দেয় সঞ্জীবকে।
“আমি জানতাম না তুমি এত সহজ করে কারোর সাথে কথা বলতে পারো। কাটোয়াতে সবসময় এত রাগি রাগি মুখ করে থাকতে।” সঞ্জীব বলে।
“তোমরা ছেলেরা কম ডিস্টার্ব করতে নাকি? বাড়ি থেকে বেরোনোর উপায় ছিল না। সব সময় কেও না কেও পিছনে পরেই থাকত।”
“হ্যালো ম্যাডাম, ধীরে ধীরে।” কথাটা বলেই দাড়িয়ে যায় সঞ্জীব। “আমি আপনার পিছনে ওভাবে পড়িনি , মনে ডিস্টার্ব করিনি কখনও।”
“জানি, শুধু চুপ চাপ সাইকেল থেকে নেমে আমার পিছনে হাটতে।”হেসে উত্তর দিয়ে আবার চলতে শুরু করে ডলি।
“মানে তুমি আমার দিকে নজর রাখতে”, সঞ্জীব জিজ্ঞাসা করে।
“হ্যা, বিশেষত পরিমলবাবুর ব্যাচ থেকে ফেরার পথে। ওই রাস্তাটায় কুকুর থাকত। ওই একদিনই আমি চাইতাম তুমি আমার পিছন পিছন হাঁটো।” কথাটা বলেই হেসে ওঠে ডলি। সঞ্জীব ও হাসে। হাঁটতে হাঁটতে তারা ডান দিকের আর একটা গলিতে ঢুকে যায়।
সঞ্জীব ডলির দিকে আড় চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে বলে,”তবে একটা কথা বলব? তোমার হাসি আমি আগে শুনেছিলাম। কিন্তু এই প্রথম তোমার গলার আওয়াজ এত কাছে থেকে শুনছি। এত মিষ্টি করে কথা বল। টিউশনে তো স্যারদের সাথেও গম্ভীর ভাবে কথা বলতে। “
“তুমি আবার চিজি লাইন মারছ।”
“একদম না।” ডলির কথা শেষ করার আগেই সঞ্জীব বলে, “এটা একদম সত্যি কথা।”
ডলি হো হো করে হাসতে থাকে। সঞ্জীব আশে পাশে দেখে। এত রাতে একটা মেয়ে হাসছে দেখলে ঘুমন্ত গলি ভড়কে যেতে পারে। ডলি ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বার করে স্ক্রিনটা দেখে আবার ব্যাগে ভরে দেয়।
“তোমায় আর আমি কটোয়াতে দেখি না। বাড়ি যাওনা নাকি? অবশ্য আমিও কমই যাই।” ডলি জিজ্ঞাসা করে।
“না সেরকম যাওয়া হয় না। গেলেও বাড়ি থেকে বেরোই না। একটু থেমে সঞ্জীব আবার বলে, “তুমি কি আমায় কাটোয়াতে দেখার আশা রেখেছিলে?”
“মানেটা কি? আমি এমনি জিজ্ঞাসা করলাম”
” আরে, আমি মজা করছিলাম।”
দূরে মেন রোডের লাইট দেখা যাচ্ছে।
“আসলে সেদিন তুমি রেনুর কাছে থেকে কার্ডটা নিয়ে রেগে বাড়ি চলে গেলে, ফোন ও করলে না। তাই সাহস করে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। ” সঞ্জীব বলে।
‘কেন, ভয় পেয়েছিলে ঝাড় খাওয়ার?” ডলি জিজ্ঞাসা করে।
“আর নয়তো কি। তোমার থাপ্পড় মারার গল্প তো কম শুনিনি।”
“সে আমি এখনও মেরে থাকি”
“আমি কিন্তু এখন কিছু বলিনি”, গালে হাত দিয়ে কথাটা বলে সঞ্জীব। “আর এমনিতেও এখনো মেন রোড আসে নি। কুকুর কিন্তু সামনেও থাকতে পারে।” দুজনেই হাসতে শুরু করে একসাথে।
দূরে মেন রোড প্রায় এসে গেছে দেখে, আবার কথা শুরু করে ডলি,”আমি রেগে গিয়েছিলাম কারন কার্ডটা তুমি রেনুর হাত দিয়ে পাঠিয়েছিলে। নিজে দেওয়ার সাহস হল না তোমার। আমি তো বাড়ি গিয়েই কার্ডটা পিছনের কচুরিপানায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম।”
“মানে আমি নিজের থেকে দিলে কি তুমি হ্যাঁ করে দিতে?” সঞ্জীব রীতিমত আফসোসের সাথে কথাটা বলে।
“ভেবে দেখতাম অন্তত।” সঞ্জীব এর দিকে না তাকিয়েই কথাটা বলে ডলি।
“ইশ, সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। তা এখন কি ভেবে দেখার আর কোন চান্স আছে?” সঞ্জীব কথাটা বলেই দূরে সরে যায়। বিশ্বাস নেই, মেয়েটা সত্যি একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে পারে।
“একদমই চান্স নেই। মাঝে অনেক জল বয়ে গেছে। তখন বাচ্চা ছিলাম। কিছু হলেও হতে পারত।”
সঞ্জীব বুঝল না কি বলতে চাইল ডলি। এটা কি একরকম অপমান করে দিল। এখন কি ও ডলির চয়েসের থেকে অনেক নিচে? ডলি মনে মনে হাসল। ছেলেটার পিছনে লেগে বেশ মজা আছে। সে আরো বলে, “তবে কার্ডের সাথে যে চকলেটটা ছিল, সেটা খেয়েছিলাম। দেখ, যত রাগই হোক, চকলেট ছাড়া যাবে না। “
কথাটা শুনে সঞ্জীব আর ডলি দুজনেই হাসে। হাসতে হাসতে মেন রোডে চলে আসে দুজনে। উল্টোদিকে ডলির মেস। এদিকটায় অনেক ছাত্র ছাত্রী থাকে, তাই রাত হলেও মোটামুটি মানুষজন আছে রাস্তাঘাটে।
“এবার তাহলে আমি আসি। ধন্যবাদ কুকুরের হাত থেকে আমায় বাঁচানো, আর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। যদিও সারা রাস্তায় আর কোন কুকুর ছিল না। তাই বলতেই হবে ট্রিকটা ভালো ছিল” কথাটা বলে ডলি কড়া চোখে তাকায় সঞ্জীবের দিকে। সঞ্জীব এই শেষ চাটনটা একদমই আশা করে নি। কি খতরনাক মেয়ে মাইরি। সঞ্জীব কিভাবে জানবে যে রাস্তায় আর কোথাও কুকুর থাকবে না। সে তো সাদা মনে কোন কাদা না রেখে সাহায্য করতে চেয়েছিল শুধু।
“উফ, তুমি এত ভয় পাও না। ” কথাটা হেসে বলেই ডলি শক্ত করে ব্যাগটা ধরে। রাস্তা পার করতে হবে তাকে। সঞ্জীবও ডলিকে হাসি ফিরিয়ে দেয়। মেয়েটা এখনও একইরকম সুন্দর আছে। আর তারপর এত মিষ্টি একটা গলার আওয়াজ। সঞ্জীবের ইচ্ছা করছিল আর একটু হেঁটে যেতে। কিন্তু উপায় নেই। ডলি রাস্তার দু দিকে কোন গাড়ি আছে কিনে দেখছে। সঞ্জীব গলির দিকে দু পা পিছিয়ে আসে।
“আচ্ছা সঞ্জীব, তোমার নাম্বারটা এখনো ওটাই আছে? যেটা কার্ডে লেখা ছিল?” ডলি জিজ্ঞাসা করে। ।
“হ্যা কেন?”
” না, ভাবছিলাম কাল ফেরার পথে তোমায় একবার ফোন করে নেব। যদি তুমি একটা ক্যাডবেরি সিল্ক হাতে অপেক্ষা করতে পারো ওই গলির মুখে। মানে যদি তুমি ফ্রী থাকো তো।”
কি, কি বলল মেয়েটা ? সঞ্জীবের নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। সত্যি মেয়েটা খতরনাক। সঞ্জীব কি উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারছিল না। শুধু ঘাড় নেড়ে বোঝাতে পারল যে নাম্বারটা একই আছে। আবার সেই চার বছর আগের রাতটা ফিরে আসছে। সেই কৃষ্ণ বাবুর ব্যাচে ডলি কে প্রথম দেখার রাত। সেদিনের মত আজও আর ঘুম আসবে না সঞ্জীবের।

লেখক – রজত সাহা

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here