January 16, 2021

Marmakutir

এবার হোক কিছু মনের কথা বলা

সম্পর্কের সমীকরণ

Spread the love

শুনশান বালিগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন। শেষ ট্রেনটা প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেড়িয়ে গেছে ঘন্টাখানেক আগে। স্টেশন লাগোয়া বাড়ির আলো নিভে যাচ্ছে একে একে। ঘড়ির কাটা দেড়টা ছুইঁ। বাড়ি থেকে ফোন আসছে বার বার। পকেট থেকে ফোন বেড় করে সুইচ অফ করে আবার পকেটে রেখে হেটে চলেছে রেল লাইনের উপর দিয়ে। কিছু ছবি বার বার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে আবার মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে। নিশব্দে জল গড়িয়ে পড়ছে অর্নবের চোখ থেকে। সে যে চায়নি বিশ্বাস হারাতে, নিজে আঘাত সহ্য করেও বিশ্বাস করে গেছে তার প্রিয় মানুষটাকে। তবুও আজ তার বিশ্বাস ভেঙেছে। আর কোনো অজুহাতেই সে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারবে না তার ভালোবাসার উপর। ধরে রাখতে চাইলেই বুঝি এমনটা হয়? অনেক প্রশ্নের ভিড়ে অর্নব বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সময় জ্ঞানও নেই তার। রাত ক্রমশ বাড়ছে। নিম্নচাপের প্রভাবে বেশ কয়েকদিন ধরেই রাতে বৃষ্টি হচ্ছে বেশ। আজও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, মেঘেদের বুক চিড়ে সশব্দে আকাশের কিছু অংশ আলোয় ভোরে উঠছে কিছু সেকেন্ডের ফারাকে। পিছোল রেললাইনের ধারে পাথরের টুকরোয় হচোট খেয়ে হুর্মুড়িয়ে পরে গেল অর্নব। জীবনের পথেই সে আজ হচোট খেয়েছে। মাথায় আঘাত পেয়েছে, রক্তের রেখা চোখের ধার দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে, মিশছে চোখের জলও। আজ সে মনেও ভীষণ আঘাত পেয়েছে, রং হীন রক্ত ক্ষরণ তার বুকেও হচ্ছে। এই রক্ত ক্ষরণের খোঁজ কেউ রাখে না। গত দুই বছর যার ছোঁয়াতে অর্নবের সব আঘাত নিমিষে হারিয়ে যেত, আজ তারই দেওয়া আঘাতে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে অর্নব।মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সে বসে পরলো রেল লাইনের ধারেই। বৃষ্টির ফোঁটার সাথেই তার চোখের জলও মাটিতে মিশছে। জ্ঞান হারায় অর্নব। 

বেশ কয়েকদিন ধরেই হিয়া , অর্নবের ফোন রিসিভ করছে না। ব্যস্ততার খাতিরে ধরে নিয়েই আজ সে ঠিক করে হিয়া কে না জানিয়েই কলেজে দেখা করতে গিয়ে চমকে দেবে। কলেজের ক্লাস শেষ করে অর্নব বেড়িয়ে পরে হিয়ার কলেজের উদ্দেশে। হিয়া চকোলেট ভালোবাসে সেটা অর্নব জানে, তাই দেখা হওয়ার আগে সে হিয়ার জন্য চকোলেট আর চকোলেট কেক কিনে নেয়। অর্নবের কলেজ থেকে প্রায় ঘন্টা খনিকের রাস্তা। ট্রাফিকের চাপে আরো পনেরো মিনিট লেট হলো পৌছাতে। তখনো হিয়ার কলেজ শেষ হয় নি। গেটের বাইরে মোটামুটি ভীড়। একটু দুরে গাড়ি পার্ক করে দাড়িয়ে থাকে অর্নব। মিনিট দশেকের মধ্যেই কলেজ শেষ হয় হিয়ার। অর্নব গেটের দিকে এগিয়ে আসে। কলেজের স্টুডেন্টরা প্রায় অনেকেই একে একে গেটের বাইরে বেড়িয়ে আসলেও হিয়া কে খুঁজে পায় না অর্নব। প্রায় মিনিট পনেরো সে দাড়িয়ে থাকে গেটের বাইরে। কলেজ ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেলে ওদের ই ক্লাসের একজন কে ডেকে জিজ্ঞেস করে হিয়ার কথা। হিয়ার এক-দুই জন বন্ধুর ব্যপারে সে শুনেছে হিয়ার মুখে। তার থেকেই জানতে পারে যে হিয়া ভিতরেই আছে আকাশ আর রেহানার সাথে। আকাশের নাম শুনে কিছুটা রাগ চেপে বসে অর্নবের মাথায়। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে গেটের এক ধারে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে অর্নব। কিছুক্ষণের মধ্যেই হিয়ার কথা শুনতে পেয়ে গেটের সামনে এগিয়ে আসে। কিন্তু এর পরে আর সে নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। নিজের উপস্থিতি বুঝতে দেবে না ঠিক করে গেটের আড়াল থেকেই দেখে আকাশের হাত ধরে হিয়া এগিয়ে আসছে গেটের দিকে। হিয়ার কাছে বেশ অনেকবার ই সে শুনেছে আকাশের নাম। তাই চিনতে অসুবিধে তেমন হোলোনা অর্নবের। গেটের সামনে এসে আকাশ কে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানায় হিয়া। অর্নব এবারে হিয়াকে ফোন করে। স্পষ্ট অবহেলা দেখতে পায় হিয়ার চোখে। ব্যাগ থেকে ফোন বেড় করেও বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দেয় হিয়া। চোখের কোনে জল চিক চিক করে ওঠে অর্নবের। কিন্তু ছেলেদের নাকি চোখ থেকে জল পরা বারণ! হিয়া বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলে অর্নব ও বেরিয়ে পরে। আজ তার কোচিং আছে। ভেবেছিল হিয়ার সাথেই সময় কাটাবে তাই পড়তে যাবে না। কিন্তু আজ তার চোখেই অবহেলা স্পষ্ট দেখেছে অর্নব। গাড়িতে উঠতেই পাশের সিটে কেক আর চকোলেটে চোখ পরে তার। এখন এগুলো অপ্রয়োজনিয়। কেক আর চকোলেট হাতে  নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে রাগের বশে ডাস্টবিনে ফেলতে গেলে দুটো নিষ্পাপ চোখ তাকে থামিয়ে দেয়। সে ভুল করতে যাচ্ছিল খাবার ফেলে। ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে তার হাতে ধরিয়ে দিল কেক আর চকোলেটটা। এইটুকুতেই বাচ্চা ছেলেটার মুখে চওড়া ফুটে উঠতে দেখে অর্নবের মনেও ক্ষণিকের ভালোলাগা তৈরি হলো। কিন্তু গাড়িতে উঠেই আবার , হিয়ার চোখে কিছু ক্ষণ আগের অবহেলা দেখার পর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারছে না অর্নব। অর্নবের সব হিসেব একে একে মিলতে শুরু করলো। দিনের পর দিন কথা বলা কমে আসা, ফোন রিসিভ না করা, অর্নবের কারণে সব কিছুতেই হিয়ার বিরক্ত অনুভব করা। এতদিন সে ভেবেছিল হয়তো ব্যস্ততার জন্যেই হিয়ার এরূপ আচরণ। কিন্তু আর কতো অজুহাতে সে নিজের বিশ্বাস ধরে রাখতে পারবে! আজ যে সে স্পষ্ট অবহেলা দেখেছে হিয়ার চোখে। কোনো ভাবে আবেগ সামলে কোচিংয়ে চলে যায় হিয়া। পড়ায় মন নেই। এদিকে সেমিস্টার এগিয়ে আসছে। ক্লাসে পড়া না শুনে গল্প করা ছেলেটাও আজ একেবারে চুপ চাপ। অর্নবের স্কুল থেকেই খুব ভালো বন্ধু শর্মিষ্ঠা। সে যদিও শান্ত স্বভাবের খুব। তবে তার কাছে বন্ধুত্ব আগে গুরুত্ব পায়। অর্নব কে চুপ থাকতে দেখে সে অর্নবের পাশে এসে বসে। তবুও অর্নবের থেকে কোনো সাড়া মেলে না। রাত নটা নাগাদ কোচিং শেষ হয়। সবাই বেড়িয়ে গেলে তখন ও বেঞ্চে বসে অর্নব। শর্মিষ্ঠা যাওয়ার আগে অর্নব কে ডেকে দেওয়ায় অর্নব উঠে দাড়ায়। কেমন যেন আবেগী হয়ে পরেছে আজ। শর্মিষ্ঠা অল্প হলেও আঁচ করতে পারে বিষয়টা। অর্নবের কাঁধে হাত রেখে বলে, 

” সময়ের ঘষা লেগে শিলালিপি ও ক্ষয়ে যায়, আর তুই ভাবছিস মনের ক্ষয় হবে না? মন তো আবেগের স্রোতে ভাসমান, কোনো কিছুকে আকড়ে রাখতে পারেনা সে আবেগ ছাড়া। চল এখন তোকে বাড়ি দিয়ে আসি। ” 

শর্মিষ্ঠার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় অর্নব। শর্মিষ্ঠা চলে গেলে কোচিং থেকে বেরিয়ে আসে সে। গাড়ি ছাড়াই হাটতে হাটতে পৌছায় বালিগঞ্জ রেল ওয়ে সেটশনে। রাত প্রায় দশটার কাছাকাছি। প্লাটফর্মে দাড়িয়ে অর্নব। ভেবেছিল একবার কথা বলে সবটা মিটিয়ে নেবে। কারন সে দুরত্ব চায়নি। আর হিয়া কাছে থাকতে চায়নি। তাই হয়তো চার বার ফোন রিসিভ না করে ফোন কেটে দিয়েছে সে। 

” দুরত্বই যদি চাও, তবে দুরত্বই সই।”  মুখে ম্লান হাসি এঁকে লাস্ট ট্রেনটা চলে যেতেই রেল লাইন ধরে হাটতে শুরু করে অর্নব। 

সকাল হতে বৃষ্টির তেজ ও বেশ কিছুটা কমে আসে। চোখ খুলতেই বুঝতে পারে সে রেল লাইনের ধারেই তখন ও। গত রাতে বড়ি ফেরা হয়নি তার। একটা মেয়ের জন্য সে কেনো নিজেকে এতোটা কষ্ট দিচ্ছে ভেবে নিজের প্রতি ঘৃণা অনুভব করে। কিছু লোক তখন তাকে ঘিরে। উঠে বসতে চাইলে মাথায় প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করে অর্নব। কপালে হাত ছোঁয়াতে দেখে তখন ও রক্ত লেগে তার কপালে। কোনো মতে সাহায্য নিয়ে উঠে দাড়ায় অর্নব। একজন মাঝ বয়সি ভদ্রলোক ট্যাক্সি ভাড়া করে দেয় অর্নবের জন্য। অর্নব বাড়ি ফেরার আগে বাড়ির কাছাকাছি ডাক্তারের থেকে মাথায় ব্যান্ডেজ করিয়ে নেয়। বাড়ি ফিরতেই মায়ের কথার কোনো উত্তর না দিয়েই ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল অর্নব। এই প্রথম সে মায়ের কথা গ্রাহ্য না করেই এড়িয়ে গেল। এই ব্যবহারে অর্নবের মা-বাবা দুজনেই দুশ্চিন্তায় পড়েন। বার কয়েক দরজার বাইরে ডাকা ডাকির পরেও কোনো উত্তর না দেওয়ায় হতাশ হয়ে যান তার মা। এদিকে বন্ধ ঘরে প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে ঘুমিয়ে পরেছে অর্নব। শারীরিক আঘাতের চেয়েও মানসিক আঘাত যে আরো অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

স্কুলে হিয়া আর অর্নবের সম্পর্কটা বেশ মধুর ছিল। কারন ওদের সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল প্রিয় বন্ধুত্বের সম্পর্কের দরুণ। আর এই জন্যেই দুজন দুজনকে বোঝার চেষ্টা করতো এবং বুঝতেও পারতো। কিন্তু সম্পর্কে একতরফা কোনো কিছুরই স্থান নেই।  আজকাল আর হিয়া অর্নব কে বোঝার চেষ্টা করেনা। অর্নব বুঝতে চাইলেও নিজেকে দায়ী মনে করে সবসময়। অর্নব বেশ কয়েক মাস ধরেই একটা বাঁধন ছাড়া ভাব অনুভব করেছে। কিন্তু হারানোর ভয়ে কিছু বলতে ও পারেনা। মনের কথা ঠোঁটে এনেও গিলে ফেলতে হয় অর্নব কে। চাপা অভিমান অভিযোগ সব ডায়েরির পাতায় ছোটো ছোটো অক্ষরে হয়েই থেকে যায় তার। আগের মতন আর কিছু নেই ওদের মধ্যে। 

দুপুরের দিকে ঘুম ভাঙে অর্নবের। কোনো রকমে উঠে দরজা খোলে সে। দরজা খোলার আওয়াজেই অর্নবের মা ছুটে যায় তার কাছে। গায়ে হাত দিতেই বুঝতে পারে অর্নবের গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। অর্নবের মা তড়িঘড়ি সুধীর বাবু অর্থাৎ অর্নবের বাবা কে ডাকেন। অর্নবের বাবা এলে খাটে শুইয়ে দেয় তাকে। অর্নব তখন ঘোরের মধ্যে। অচেতন অবস্থায় থার্মোমিটারে প্রায় 103 এর কাছাকাছি। মৃণালিনী দেবী অর্নবের মাথায় জল পট্টি দিয়ে দেন। সুধীর বাবু ডাক্তার ডাকেন। বিকেলে জ্বর একটু কমলে উঠে বসে অর্নব। খাটের পাশে টেবিল থেকে ডায়রিটা নিয়ে বসে সে। পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে মনে মনে হাসে সে কারন তার সব অভিমান অভিযোগের এক্সপায়রি ডেট শেষ হয়ে গেছে। বালিশের নিচ থেকে ফোন বেড় করে নোটিফিকেশন চেক করে। কিন্তু হিয়ার নামের ইনবক্স শূন্য। হতাশ হয়ে পরে সে। একবারের জন্যেও কি হিয়ার মনে পড়েনি অর্নব কে! এতটাই ব্যস্ততা গিলেছে সময়! প্রতিবারের মতই এবারও অভিমান লুকিয়ে রাখে অর্নব। তবে এর পরে আর অর্নব কোনোরকম যোগাযোগ রাখেনি, আর হিয়াও যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেনি। নিজের  ব্যবহার স্বাভাবিক রাখার মিথ্যে অভিনয় ভালোই রপ্ত করে নেয় অর্নব। মাস খানেক কেটে যায় নিমিষেই। ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা ও শেষ হয়ে যায় ওদের। 

ঘড়ির কাটায় রাত প্রায় একটা। পড়ার টেবিলে, ল্যাম্প জ্বালিয়ে বাকি সব আলো নিভিয়ে দেয় অর্নব। টেবিলে রাখা ফটো ফ্রেম টাকে দু হাতে শক্ত করে ধরে সে। হাত কাঁপছে তার, চোখের কোনে মন খারাপ জায়গা করে নিয়েছে। ফটো ফ্রেম রেখে পাশে রাখা ডায়েরি হাতে তুলে নিয়ে অস্থির হয়ে পরে অর্নব। একের পর এক পৃষ্ঠা নিজের হাতে ছিড়ে ফেলতে থাকে পায়ের কাছে রাখা ডাস্টবিনে। তাদের সম্পর্কের ইতি আজই। যদিও অনেক দিন আগেই শেষ হয়ে গেছিলো ওদের সম্পর্কটা। কিন্তু আজ আর ফিরে আসার পথ নেই কোনো। চাইলেও আজ অর্নব তার হিয়া কে ফিরে পাবে না। এখন থেকে হিয়া শুধুই আকাশের। ফটো ফ্রেম থেকে ফটো বেড় করে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় সেই ফটো তে, জলন্ত ফটো টা ফেলে দেয় ডাস্টবিনে। পুড়তে থাকে অর্নবের মন, অভিমান, অভিযোগ। চোখ ও থামতে রাজি নয় তার,অনবরত জল গড়িয়ে গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে। মেঝেতে বসে পড়ল সে। আগুন থেকেই হিয়ার ফটোটা তুলে নিল অর্নব। কোনোরকমে আগুন নিভিয়ে বুকে জড়িয়ে নেয় অর্ধেক পুড়ে যাওয়া হিয়ার ফটোটা। অর্নবের হাতের এক দিক ও পুড়ে গেছে। কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। বুকে হিয়ার ফটো আঁকড়ে চোখের জলে ভিজতে ব্যস্ত সে। 

” বড্ডো বেশি ভালোবাসি বলেই কি আজ হিয়া আমার নেই! ওর ভালোথাকার কারণ হতে গিয়ে ওর বিরক্তির কারণ হয়ে গেলাম!

ওর মনের মতো হয়ে উঠতে কেনো পারলাম না আমি! 

কেনো আমাকে ছেড়ে চলে গেলো ও! তবে কি আমিই ওকে বুঝতে পারিনি !” 

বহু প্রশ্ন-উত্তরের মুখোমুখি যুদ্ধ করছিল অর্ণব। অর্ণব মেনে নিতে পারছিল না হিয়ার তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া। সবটাই তার কাছে একটা দুঃস্বপ্নের মত কিন্তু এটাই যে বাস্তব!  সেটা বোঝার মত বোধশক্তিও আজ সে হারিয়েছে। খাটের পায়াতেই শারীর এলিয়ে দিয়ে বসে থাকে সারা রাত। 

সকাল হতে জানলা দিয়ে রোদ এসে তার মুখে পড়েছে। এক রকম বিরক্ত হয়ে উঠে বসে অর্নব। গত বিকেলের কথা আবার মনে পরে যায় তার। 

গতকাল হিয়ার ফোন পেয়ে অর্নব ভেবেছিল হয়ত হিয়া নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। কিন্তু অর্নবের এই ধারনা ভুল প্রমাণিত হয়। হিয়া অর্নব কে ফোন করে দেখা করার কথা জানায়। 

বিকেল পাঁচটা, মেঘলা আকাশ তবে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা নেই। ঘড়ি ধরে একেবারে সময় মতো হাজির অর্নব। গঙ্গার ধারে হিয়া কে অনেক দিন পরে দেখতে পেয়ে অর্নবের মন ভীষণ রকম ভালো হয়ে যায়। দুর থেকে একবার ডাকার পর ছুটে যায় সে হিয়ার কাছে। ভিজে চোখ নিয়ে সে দাড়ায় হিয়ার সামনে। 

– হিয়া! 

( অর্নবের হাতে একটা বিয়ের কার্ড ধরিয়ে দেয় হিয়া। হিয়ার ও কিছুটা মুখ ভার। চোখে যেন কিসের দন্দ্ব দেখতে পেল অর্নব।) 

– অর্নব , নেক্সট উইকে আমার আর আকাশের বিয়ে। 

( হিয়ার মুখ থেকে এই কথা শুনে এক পা পিছিয়ে গেল অর্নব। এক মুহূর্তেই যেন গোটা আকাশ ভেঙে পরেছে তার মাথায়।  বিষাদের ঘন কালো মেঘ নিমিষেই ঘনিয়ে এসেছে তার হৃদয় আকাশে। এক ভাবে চেয়ে হিয়ার দিকে। ঠোঁট কাঁপছে তবুও রা-শব্দ টুকু করার ক্ষমতা হারিয়েছে অর্নব।) 

অর্নব! আমি জানি তোকে এতদিন পরে ডেকে এই কথা বলবো তুই ভাবিস নি। আমিও যে ভাবিনি আমাদের মধ্যে কবে এতো দুরত্ব এলো। আজ আর কিছু করার নেই অর্নব। আমার বাবা-মা ও তোকে মেনে নেবে না। আর আমি ও আকাশ কে ভালোবেসে ফেলেছি। ওর সাথে ভালো থাকি আমি। 

( হিয়ার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অর্নব বলে,) 

– সেদিন কলেজের বাইরেই তোর চোখে বিরক্ত দেখেছিলাম আমার নামে। তাই আর কথা বলার সাহস হয় নি। মিথ্যে অজুহাতে মন কে ভুল বুঝিয়েছি। তুই তো আজকাল আমার সব কিছুতেই বিরক্ত হতিস। আমিই পারিনি ভালোবাসতে হয়তো কিংবা বেশি ভালোবেসেছিলাম। 

( দুজন দুজনকে শেষ বারের মতো দেখে মেঘলা বিকেলে। অর্নব বুকের ভেতর চাপা অভিমান নিয়েও কোনো কথা বলে না। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে উঠে হিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,) 

– পারলে আসিস।

– ভালো থাকিস হিয়া। এতো বছর শুধু বিরক্তিই দিতে পারলাম তোকে। ব্যর্থ হলাম ভালো রাখতে তোকে। কিছুই দিতে পারিনি আমি। তাই আজ তোকে হারিয়ে ফেলাই ছিল আমার প্রাপ্য। ভুলে যাস আমায়। যদিও মনে রাখার মতো তোর মনে জায়গা করতে পারিনি আমি। 

– আসছি। 

– শোন্ না। শপিং এ যাবি যখন ডাকিস। বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম। আজ আর নেই তাও শেষ বারের জন্য কিছু করতে দে। 

– হুমম। 

গত বিকেলে হিয়ার বিয়ের কথা শুনে আর মিথ্যে অজুহাতেও মন কে শান্ত করতে পারছে না অর্নব। 

অর্নবের কথা অনুযায়ি হিয়ার সাথে শপিং এ যায় অর্নব। শাড়ি পছন্দ করে দিতে চেয়েছিলো অর্নব। তবে নিজের করে পেতে চেয়েছিলো। সেটা আর কখনো সম্ভব না ভেবে পরোক্ষে ইচ্ছেটা পুরণ করে নিল সে। বিয়ের আংটিটাও অর্নব পছন্দ করে দিল। অর্নব ও মনের কোনো প্রতিক্রিয়া বুঝতে দেয় নি। মিথ্যে অভিনয়ে বেশ রপ্ত করে নিয়েছিল নিজেকে। হিয়া অপ্রস্তুতিতে পড়লেও মানিয়ে নিয়েছিল সেই পরিবেশে। সবাই এগিয়ে গেলে অর্নবের হাত ধরে আটকায় হিয়া। 

– অর্নব! 

– বল ? 

– কেন করছিস এরকম ? 

– কি করলাম ?

– কি দরকার ছিল এখানে আসার ? 

– কেন ! তোর বিয়ে বলে কথা। এই টুকু দায়িত্ব নেব না?

– আমি কেন বলছি তুই ভালো করেই বুঝতে পারছিস অর্নব। 

– তুই বেশি ভাবছিস। এখন শুধু আকাশের কথাই ভাব। 

– তোর কষ্ট হচ্ছে না ? 

– যার অনুভুতি নেই। সে কষ্ট পায় না। 

বেকার না বকে। চল। ওরা এগিয়ে গেছে। জুয়েলারি ও তো কিনতে হবে। চল চল। 

( হিয়ার হাত ধরতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিল অর্নব। হিয়া কিছুতেই অর্নবের চোখে চোখ রাখতে পারছে না।) 

শপিং থেকে বাড়ি ফিরে প্রায় তিন দিন পেরিয়েছে অর্নব কারোর সাথে কথা বলেনি। খাওয়া-দাওয়াতেও চূড়ান্ত অনিয়ম। রাতে খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। 

অর্ধেক পুড়ে যাওয়া ডায়েরির পাতা গুলো ড্রয়ার থেকে বেড় করে টেবিলে রাখে অর্নব। হিয়ার ফটোটা তুলে নিয়ে তাকিয়ে থাকে একভাবে। ঘরের সব আলো নেভানো। শুধু টেবিল ল্যম্পের আলোয় হিয়ার ছবিতেই যেন হারিয়েছে সে।রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘন্টা ওদের কাটানো সময়ের কল রেকর্ডিং চালিয়ে ফটোতে তাকিয়ে ভিজে চোখে। মুখে ম্লান হাসি। বুকের ভিতরটা মাঝে মাঝে মোচড় দিয়ে উঠছে। দৃষ্টি অস্পষ্ট। কালই হিয়ার বিয়ে। সকালেই তার যাওয়ার কথা। মনে পরতেই হাতের সামনের সব কিছু এক সাথে ছুড়ে ফেলে দেয় অর্নব। টেবিলে রাখা কাঁচের গ্লাসটাও ছিটকে মাটিতে পরে পুরো মেঝে কাঁচে ভরে যায়। গ্লাস ভাঙার আওয়াজ পেয়ে দরজার বাইরে থেকে মায়ের ডাকার শব্দ তার কানে পৌছাচ্ছে না। তার কানে কেবল হিয়ার দেওয়া সব প্রতিশ্রুতির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। চেয়ার থেকে উঠে খাটে যেতেই পায়ের নিচে কাঁচ বিঁধে গেল অর্নবের। টলোমলো পায়ে খাটে এসে বসে সে। কাঁচের টুকরো বেড় করে শুয়ে পরে অর্নব। বিছানার চাদর রক্তে ভিজে যাচ্ছে তবুও সে যেন অনুভুতি হীন। চোখের পলক এক করতে পারে না। ফোনের স্ক্রিনে হিয়াকে দেখে নীরবে বালিশ ভেজে আবেগে। পুরোনো কল রেকর্ডিং কানে হেড ফোন গুঁজে শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরে অর্নব। 

আজ হিয়ার বাড়ি মেতে উঠেছে আলোর খেলায়। বাড়ির প্রতিটা কোনে আজ আলো। আনন্দের আমেজ মাখা পরিবেশে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠাণের জন্য ব্যস্ত হিয়া। বন্ধুরা ঘিরে রেখেছে তাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পরে গায়ে হলুদের জন্য। হিয়া সেজেছে হলুদ শাড়ি তে। দুর থেকে দাড়িয়ে দেখে অর্নব। হিয়ার বন্ধুর চোখে পড়ায় তাকে টেনে আনে হিয়ার সামনে। 

হিয়ার গালে আলতো আঙুলে হলুদ ছুইঁয়ে

” খুব সুন্দর লাগছে তোকে।” ধীর ভাবে বলে অর্নব। 

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সরে আসে সে। আড়াল থেকেই দেখে হিয়া কে। চোখের কোনে জল আসলেই সঙ্গে সঙ্গে মুছে নেয় অর্নব। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসে। এগিয়ে আসে সময় সারা জিবনের মত হিয়া আর অর্নবের দুরত্বের। 

গোধূলি লগ্নে হিয়া আর আকাশের চার হাত এক হওয়ার সময়। সময় ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। হিয়া ঘরে বন্ধুদের সাথে বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। দরজার বাইরে থেকে সবার চোখের আড়ালে হিয়া কে দেখে অর্নব। একদিন এই সাজেই সে দেখতে চেয়েছিলো হিয়াকে। কিন্তু আজকের হিয়ার এই সাজ আকাশের জন্য। অর্নব কিছুতেই আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে ছুটে বেড়িয়ে আসে বাইরে। আকাশ এসে যাওয়ায় সেখানেও ভীড় জমে যায়। সকলের খুশির মাঝে নিজেকে বেমানান লাগছে ভেবে সরে আসে অর্নব। বাড়ির ছাদে উঠে এক কোনে বসে পরে। বেশ কিছু ক্ষণ পর নিচ থেকে শুনতে পায় হিয়াকে বিয়ের মন্ডপে নিয়ে যাওয়ার কথা। শেষ বারের মতন দেখার জন্য চোখ মুছে, মিথ্যে হাসি ঠোঁটে এঁকে নিচে নেমে আসে অর্নব। 

জজ্ঞের আগুনে পুড়ে যায় অর্নবের ভালোবাসা, অভিমান, অভিযোগ। হিয়ার জীবনে শেষ হয় অর্নব নামের অধ্যায় আর শুরু হয় আকাশের নামের নতুন অধ্যায়। অর্নব এখনো মেনে নিতে পারছে না যে হিয়া আজ অন্য কারোর। আজ থেকে হিয়ার মন খারাপেও পাশে থাকতে পারবে না অর্নব, বুকে জড়িয়ে ভালোবাসি বলতে পারবে না সে। রাস্তার ক্রসিং এ এবার হিয়ার হাতে আকাশের হাত থাকবে। কিছুতেই অর্নব মানতে রাজি নয়, তবুও মিথ্যে অভিনয়ে সব আঘাত সহ্য করে চলেছে। অর্নবের সব স্মৃতি মুছে হিয়ার সিথিতে সিন্দুর উঠলো আকাশের নামে। লজ্জা বস্ত্রে হিয়ার মুখ ঢেকে দিলে বিয়ে বাড়ি বেরিয়ে আসে অর্নব। বাড়ি ফিরে এসে ঘরের দরজা দিয়ে খাটের পাশে মেঝেতে বসে পরে। রাত থেকে ভীষণ জ্বর অর্নবের। দুই দিন পেড়িয়ে যায় তারপর। শারীরিক ভাবে সুস্থ হলেও মানসিক ভাবে ভেঙে পরেছে অর্নব। কলকাতায় আর সে থাকতে চায় না। চেনা মানুষের ভিড়ে থাকতে চায় না আর সে। স্টুডেন্ট হিসেবে বেশ ভালো ছিল অর্নব।তাই এক মাসের মধ্যেই ব্যাঙ্গালোরে একটা চাকরি জোগাড় করে চলে যায় সে। 

হিয়ার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সেই অধ্যায়ের মাঝে ছেড়া পাতা হয়ে থাকতে পারবে না অর্নব। তাই সব কিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখে সে। রোজের ব্যস্ততার শেষে আজ ও সে হিয়া কেই চায় তবুও কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেনি অর্নব। রাত জেগে ফোনের গ্যালারিতে চোখ রাখে আর ফোনের স্ক্রিন ভিজে ওঠে। অর্নবের হৃদয় আকাশে ঘন মেঘেদের স্থায়ীত্ব ক্রমশ বেড়ে চলে। হিয়ার বিয়ের প্রায় এক বছর পেড়িয়ে যায়। যদিও সেই হিসেব রাখেনি অর্নব। 

মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে অবশেষে কলকাতায় ফিরতে রাজি হয়েছে অর্নব। দিন দশেকের জন্য। ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসে  অর্নব। 

প্রায় এক বছর পরে ফিরেছে অর্নব। শহরটা এক ই আছে শুধু হাত ধরার মানুষটা আর নেই পাশে। অর্নবের মনে আঘাত এখনো শুকোয়নি। তবে এখন আর সে আবেগী নেই। এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে ক্যাব বুক করে বাড়ি ফেরে সে। বাড়ি ফিরতেই ছেলেকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন মৃণালিনী দেবী। সুধীর বাবু ও চশমার আড়ালে চোখ মোছে। 

– বাবু! আয়। কতো দিন পরে এলি রে! একটুও মায়ের কথা মনে পড়েনা বল? 

– তোমাকে তো রোজই ফোন করি মা। তুমি আর বাবা ছাড়া কেউ তো নেই আমার। 

– দেখতে ইচ্ছে করে না বল! 

– অফিসে চাপ মা খুব। ছুটি পাওয়া যায় না। 

– ছুটি পাওয়া যায় না! নাকি নিজেই আসতে চাস না। 

– আহা! মৃণালিনী ! ছেলেটা সবে এলো। ওকে ফ্রেশ হতে দাও। 

বাবু ! তুই যা বাবা! ফ্রেশ হয়ে নে। 

– হ্যাঁ বাবা। 

ঘরে এসে ব্যাগ রাখতে গিয়ে অর্ধেক পুড়ে যাওয়াটা চোখে পরে অর্নবের। এগিয়ে এসে ফটোটা তুলে নিয়ে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার রেখে দিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। 

লাঞ্চ সেড়ে একটু ঘুমিয়ে নেয় অর্নব। মায়ের কথায় বিকেলে শপিং এ বেড়োবে ঠিক করে অর্নব। 

সন্ধ্যের দিকে অর্নব আর মৃণালিনী দেবী বাড়ির কাছাকাছি একটা শপিং মলে যায়। অনেক দিন পর কলকাতায় এসেছে অর্নব তাই ঘুরে দেখতে আজ ভালোই লাগছে তার। মা কে নিজে পছন্দ করে শাড়ি কিনে দেয় অর্নব। 

– বাবু ! 

– বলো?

– আমি একটু ওয়াশ রুমে যাচ্ছি। তুই দেখ তোর কোন শার্টটা ভালো লাগছে।

– হ্যাঁ ঠিকাছে। 

মৃণালিনী দেবী চলে গেলে ঘুরে দেখতে থাকে অর্নব। একটা সাদা শার্টএ চোখ পরলে সেটার দিকে এগিয়ে গিয়ে হ্যঙার থেকে নামায় অর্নব। কিন্তু খুব একটা পছন্দ না হওয়ায় আবার তুলে রেখে অন্য শার্ট দেখতে থাকে সে। হটাৎই কেউ একজন একটা ক্রিম কালারের শার্ট এগিয়ে দেয়। অর্নব প্রথমে খেয়াল না করলেও শার্টটা নেওয়ার পর তার দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। হিয়া! চোখের নিচে কালি জমেছে। চোখে যেন কেমন বিষাদের ছোঁয়া। সেই চেনা ডাকনামেই ডাকল অর্নব কে। 

– রনো , ক্রিম কালারই তো খুঁজছিলি ! 

– তুই ? 

– 34 size। রোগা হয়ে গেছিস। 32 তেই হয়ে যাবে। 

– আমি শার্ট চাই নি। আর এই রঙ আমার পছন্দও নয়। 

– আমি অন্য কালারের শার্ট দিলে তো এই কালারই চাই তিস অর্নব। 

– কখন কি চাইতাম আমি জানতে চেয়েছি? 

– কেমন আছিস তুই ?

– ভালো। 

– সত্যি ?

– হ্যাঁ। কেন ভালো না থাকার কথা ছিল ?

– না। এমনি বললাম। 

– হুম। 

– আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করলি না তো!

– তুই তো নিজেই ভালো থাকবি বলেই, আর আগে ভালো ছিলি না। এখন খুব ভালো আছিস সেটা আর হলফ করে না বললেও চলবে। 

( শার্টটা ছুড়ে রাখে অর্নব।) 

– এই ভাবে কেন কথা বলছিস অর্নব ! 

– কেনো আর Taken for granted করতে পারবি না বলে কষ্ট হচ্ছে ? 

– অর্নব ! 

– Shut up 

– কেনো করছিস এরকম ?

– আমি করেছি ? না তুই ! কেনো কথা বলতে এসেছিস ! সিমপ্যথী দেখাতে! দিনের পর দিন ইগনোর করেছিস। আমার কোনো ইচ্ছের কোনো গুরুত্ব দিস নি। আর আমি সম্পর্কটা শেষ হওয়ার ভয়ে সব মেনে নিয়েছি। অভিমান হলে তোকে বলতে পারিনি, তোর বিরক্তির কারন হয়ে গেছিলাম আমি। তাই না! বুঝতে চেয়েছিস এক বার ও ! আজ কেনো বলছি আমি। আজ তো আমি কেউ নই তোর। কোনোদিন ছিলাম ও না। 

– অর্নব। সিন ক্রিয়েট করিস না। এরকম কেনো করছিস।

– চলে যা তুই আমার সামনে থেকে। 

– আমি চলে যাচ্ছি। প্লিজ এরম করিস না। 

– Please 

– তুই ভালো নেই অর্নব। আর সেটা আমারই জন্য। 

– Get lost 

হিয়ার চোখ ছল ছল করে ওঠে। হিয়া চলে গেলে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরে অর্নবের। মৃণালিনী দেবী পাশে এসে দাড়ায়। 

– ওর উপর রাগ দেখাতে গিয়ে যখন নিজেই কষ্ট পচ্ছিস। কি দরকার ছিল !

– এই জন্যেই তো আসতে চাইনি মা। 

– এড়িয়ে চলা খুব কঠিণ বাবু। 

– চলো। 

যাওয়ার সময় হিয়ার পছন্দ করা শার্টটাই তুলে নিল অর্নব।

বাড়ি ফিরে একবারে ডিনার সেড়ে ঘরে আসে অর্নব। হিয়ার বিয়ের পরে পুরোনো ফোনটা সুইচ অফ রেখে নতুন ফোন কিনে ব্যাঙ্গালোর চলে যায়। শুধু যাওয়ার আগে হিয়ার ফটো গুলো নতুন ফোনে ট্রান্সফার করে নিয়েছিল অর্নব। ঘরে এসে আলমারি থেকে ফোনটা বেড় করে প্রায় ঘন্টা দুয়েক চার্জে বসানোর পর অন হয়। ফোনটা অন হতেই বেশ কয়েকটা নোটিফিকেসন দেখতে পেল হিয়া র নামের। দুটো মেসেজ আর প্রায় আটটা কি দশটা মিসড কল। ঘর পুরো অন্ধকার অর্নবের। ওয়াটস্যাপ এ হিয়ার ইনবক্সে মেসেজ পড়ে অর্নব। 

” অর্নব আমি জানি তুই আর কোনোদিন আমার জীবনে ফিরে আসবি না। সেই পথ আমিই বন্ধ করে দিয়েছি। সেদিন আমি সব থেকে বড়ো ভুল করেছিলাম অর্নব যেদিন তোকে ঈগনোর করে আকাশ কে বেছে নিয়েছিলাম। বুঝিনি যে আকাশের ভালোলাগা ছিল, ভালোবাসা নয়। সাময়িক ভালোলাগা বেছে নিতে গিয়ে সারা জীবনের দুঃখ কে বেছে নিলাম আমি। তোকে ছেড়ে থাকা যে কতো কঠিণ আজ তোকে হারানোর পর বুঝতে পেরেছি। ভেবেছিলাম আর আমার কোনো খবর তোর কাছে পৌছাতে দেবো না। কিন্তু আমার মন খারাপে সবসময় তোকে পাশে পেয়েছি। কোনোদিনও আমাকে বিচার করিস নি। শুধু বিশ্বাস করেছিলি। আমি তোর সেই বিশ্বাস রাখতে পরিনি অর্নব। আমাকে ক্ষমা করিস। আজ ও আমার মনের সবটা জুড়ে তুই আছিস। ভাবিস না আঘাত পেয়েছি বলে বলছি। হ্যাঁ এটা সত্যি ও আমাকে আঘাত না করলে তোর না থাকা টা এতো বেশি করে অনুভব করতাম না। কিন্তু বিয়ের প্রথম প্রথম ও আকাশ যখন আমায় ছুঁত তোকে ভীষণ মনে পরত অর্নব। তোকে জড়িয়ে ধরলে তোর নিশ্বাস আমার ঘাড় ছুঁত। আজ ভীষণ মনে পড়ে। তোকে হারিয়ে তোর গুরুত্ব বুঝেছি আমি। আমি ভালো নেই অর্নব। জানি তুই ও ভালো নেই। রনো আজও তোকে ভালোবাসি। কলকাতায় ফিরলে একবার দেখা করিস। শুধু একবার তোকে ছুঁতে চাই যদি কিছু মনে না করিস। আমার নতুন নাম্বারটা পাঠালাম। মনে পরলে ফোন করিস। অপেক্ষায় রইলাম।” 

ওয়াটস্যাপ এ হিয়ার ইনবক্সে মেসেজ পড়ার পর অর্নব একাধারে আবেগী হয়ে পরে অপরদিকে রাগ চেপে বসে তার। তবে হিয়ার উপরে নয়, আকাশের উপরে। ডেটটা দেখে বুঝতে পারলো বিয়ের প্রায় সাত মাস পর। 

আজকের সন্ধ্য এ শপিং মলে হিয়ার সাথে খারাপ ব্যবহারের কথা মনে পরতে নিজের উপরই রাগ হলো অর্নবের। 

অর্নব নিজের নম্বর থেকে হিয়ার নতুন নম্বরে ফোন করে। রাত তখন বেশ গভীর। এতো রাতে হিয়া কে ফোন করবে কিনা সেই নিয়েও বার কয়েক ভাবার পর অবশেষে ফোন করে হিয়া কে। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন রিসিভ করে হিয়া। অর্নব খানিকটা অবাক হয় কারণ এটা তার নতুন নম্বর। ফোনের ওপার থেকে চেনা গলায় কথা ভেসে এলো অর্নবের কানে। চোখ বুজে ফেলল অর্নব। চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরল তার।

– হ্যালো! 

( অর্নব কোনো উত্তর দেয় না।)

অর্নব? 

( অর্নব অবাক হয়ে যায়। )

– জানলি কি করে ?

– মনে হয়েছিল। তাই সাহস করে বললাম।

– আসলে তখন 

– জানি রনো। তোর দোষ না। তখন ভেবেছিলাম তুই আমার পাঠানো মেসেজ টা পড়েছিস। বাড়ি ফিরে দেখলাম তখনও দেখিস নি। 

– রনো! 

( হিয়ার মুখে ডাক নামটা শুনে ম্লান হাসি ফুঁটে ওঠে অর্নবের।)

– হ্যাঁ মানে। 

– আমি এই ফোনটা এখানে রেখে ব্যাঙ্গালোর চলে গেছিলাম। আজ এসে দেখলাম। 

– হুমম।

– রাগ করেছিস হিয়া?

– না। তবে বুঝেছি রে কতো অভিমান চেপে রেখেছিলি তুই। 

– কেমন আছিস হিয়া? জানি ভালো নেই তুই। 

– তুই ও তো ভালো নেই রনো। 

– এতো রাতে ফোন করছি। আকাশ !

– ওর আমার থেকে যা পাওয়ার পেয়ে গেছে। এখন ও অন্য ঘরে ব্যস্ত অন্য কারোর সাথে। 

– মানে? 

– ওর তো শুধু আমাকে রাতে প্রয়োজন হয়। এখন হয়তো অন্য কারোর সাথে কথা বলছে। 

– না মানে আমি কিছু বুঝতে পারছি না। 

– অফিসের অনেক উঁচু পোস্টে আছে আকাশ। তাই ওর সঙ্গীর অভাব নেই। বিয়ের পাঁচ মাসের পর থেকেই বুঝে গেছিলাম ওর কাছে আমি সাময়িক ভালোলাগা ছিলাম। আর আমিও ওর ব্যবহারে।

– আমার কাছে হয়তো তুই ভালো ছিলি না। তাই সেই জায়গাটা আকাশ করে নিয়েছিল। 

– আমি জানি না রনো। কিন্তু তুই তো কখনো আমাকে কষ্ট দিস নি। 

– আমি তোকে ভালো রাখতেই চেয়েছিলাম হিয়া। কিন্তু আমি হেরে গেলাম। 

– কি করে কি হলো জানি না রে। কিছুদিনের ভালোলাগা র জন্য আমি আমাদের বেস্টফ্রেন্ড এর সম্পর্কেও ইতি টেনে দিলাম। যে আমার সব কথা শুনেও আমার উপর বিরক্ত হয় নি আমি তার উপরেই বিরক্তি দেখিয়েছি।

– সম্পর্ক হারানোর ভয়ে তোকে কোনো দিন আমার অভিমান জানাতে পারিনি। আর যেদিন থেকে বলেছিলাম তুই আর আমার কাছে ভালো থাকতে পারিসনি। কিন্তু কি করবো বল! আমি যে তোকে অন্য কারোর সাথে দেখতে রাজি ছিলাম না। তোকে আকাশের কথা বললেও তুই বলতি তোরা বন্ধু। 

– আমরা তখন বন্ধুই ছিলাম রনো। তারপরে হটাৎ জানি না রে। 

– আমাদের ভুল হয়েছে হিয়া। তাই সম্পর্ক টা আজ আর নেই। 

– আমি ভালো নেই এই সম্পর্কে। তোর উপর বিরক্ত হলেও কখনো তো আমি কষ্ট পাইনি রে। 

– তাহলে তুই কিসের জন্য পরে আছিস ?

– কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। 

– আমি ও নেই ।তাই বলছিস তো?

– তোকে এতদিন অনেক খুঁজেছি রনো। 

– তুই যদি আবার চলে যেতে চাস ! 

– আমি আর তোর জীবনে ফিরবো না রনো। তুই সত্যিই ভালো থাকবি না আমার সাথে। আমি ভালো রাখতে পারি না। 

– আমি তো এখন ও ভালো নেই। যদি তোর সাথে থেকে খারাপ থাকতে হয়। তাই থাকবো। 

– রনো! 

– ভালোবাসি তোকে হিয়া। 

( হিয়ার ও চোখ ভিজে ওঠে। অর্নবের বুকে জড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করছে তার ভালোবাসার কথা।) 

– আমিও ভালোবাসি তোকে রনো। 

– দেখা করবি কাল ?

– হ্যাঁ। 

– আকাশ ? 

– তুই তো আছিস। 

– হুমম। সব সময় থাকবো হিয়া। 

– জানি রনো। 

– কোথায় যাব?

– যেখানে তোকে একা রেখে চলে এসেছিলাম সেখানেই অপেক্ষা করিস। 

– বেশ। 

– হুমম। 

– ঘুমাবি না ? 

– আজ একটু কথা বলি তোর সাথে ? জীবনটা নীরবতায় ডুবে গেছে রে।

– আমি আছি তো। 

আজ চোখের জলে বালিশ ভিজ্লেও এই জলে ভালোলাগা আছে। মন খারাপ নেই। প্রায় এক বছর পরে অর্নব হিয়ার গলার স্বর শুনতে পেয়েছে। বুকের ভিতর থেকে বিষাদের মেঘটা কিছুটা কমে এসেছে। সেই মেঘের স্থায়িত্ব ও আর বেশি দিন নেই। 

পরের দিন সকাল থেকেই অর্নবের মুখে হারিয়ে যাওয়া হাসি ফিরে আসতে দেখে মৃণালিনী দেবীও খুশি হলেন। বিকেলে সময়ের আগেই অর্নব পৌছে যায় গঙার ধারে। সিঁড়ি তে বসে অপেক্ষা করে অর্নব। হিয়ার পছন্দ করে দেয়া শার্টটা পরেছে সে। কিছু ক্ষণের মধ্যেই হিয়া এসে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডাকে অর্নব কে। অর্নব পেছনে ফিরে উঠে দাড়ায়। অর্নব এগিয়ে যেতেই হিয়া অর্নবের কলার ধরে টেনে জড়িয়ে ধরে অর্নব কে। অর্নব ও তার বাহু বন্ধনে জড়িয়ে নেয় হিয়া কে। বেশ অনেকটা সময় দুজন দুজনের আলিঙ্গনে জমানো অভিমান মুছে ফেলে। দুজনে বসে গঙ্গার ধারে সিড়িতেই। অর্নবের কাঁধে মাথা রাখে হিয়া। সন্ধ্যে নামছে আকাশে। কমলাভ আভায় ধেকেছে আকাশ। সূর্যের শেষ আলো হিয়ার মুখের শোভা শত গুনে বাড়িয়ে তুলেছে। হিয়ার হাতে হাত রাখে অর্নব। 

– শার্টটা তাহলে সত্যিই! 

– তোর পছন্দ অস্বীকার করি কিভাবে !

– হুমম।

– আবার আগের মতো ভালোবাসবি আমায় ?

– কাছে এসেই দেখ। ভালোবাসা আজ ও একই আছে রনো। 

– কোনো দিন তো কাছে আসতে দিস ই নি। ( অভিমানের সুরে বলে অর্নব)

– আর বাঁধা দেবো না কখনো। 

– তার আগে 

– কি? 

– তুই ফিরে আসবি আমার কাছে? 

– আমি তো ফিরেই এসেছি রনো। 

– এভাবে না। এখনো আইনত আকাশ তোর হাসব্যেন্ড। 

– তাহলে?

– ডিভোর্স দিবি ওকে। 

– ও যদি রাজি না হয় ! 

– সে ব্যাবস্থা আমি করবো। 

– বেশ। 

– আজ উকিলের সাথে কথা বলে ডাইরেক্ট তোর বাড়ি চলে যাবো। কাল রবিবার। বাড়িতেই থাকবে নিশ্চই। 

– হুমম। 

– তুই সত্যি ফিরতে চাস আমার কাছে? 

– হ্যাঁ রনো। 

সেদিন ই রাতে চেনা উকিলের সাথে কথা বলে অর্নব। পরের দিন বিকেলে উকিল নিয়ে হাজির হয় অর্নব আকাশের বাড়িতে। আকাশ দরজা খোলে।

– একি অর্নব তুমি ? 

– হ্যাঁ কেন ! আসব ভাবনি?

– না। হটাৎ এতদিন পর। আর সাথে উকিল !

– ভিতরে আসি! 

– হ্যাঁ। আসো। 

– বসছি। তুমিও বসো। কথা আছে। 

– হ্যাঁ। 

– আর হিয়া কে ডাকো। 

– কেনো? 

– বলেছি তাই। 

হিয়াকে ডাকে আকাশ। হিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এলে,

– হিয়া! বস। 

– আচ্ছা তবে কথায় আসি আকাশ?

– হ্যাঁ। বলো। 

– তোমার আর হিয়ার ডিভোর্স চাই। 

– কি ?

– হ্যাঁ। 

– ও তার মানে তোমরা মাঝে মাঝে দেখা করতে ! এই জন্যেই হিয়া বাড়ি থেকে মায়ের কাছে যাবে বলে অজুহাত দিত?

( বিদ্রুপের হাসি হেসে ওঠে অর্নব।) 

– আমার সাথে ? ও কি তাহলে ব্যাঙ্গালোরে দেখা করতে যেতো? 

– মানে ?

– মানে আমি দু-দিন আগেই কলকাতায় ফিরেছি। আর গত পরশুই আমার ওর সাথে দেখা হয়েছে তাও অ্যাক্সিডেন্টলি। 

– আমি ডিভোর্স দেবো না। 

– কেনো ? অন্য দের সাথে সম্পর্ক রাখতে অসুবিধে হবে ?

– What do you mean?

– গলা নামিয়ে কথা বলো আকাশ। আমি আগেই হিয়া কে বলেছিলাম। ও শোনে নি। আজ নিশ্চই বুঝতে পারছে। ল্যাপটপ টা এখানে নিয়ে আসলে না সব ঠিক হয়ে যাবে। 

( চুপ করে থাকে আকাশ।)

– হিয়া তোমার থেকে ডিভোর্স চায়। সেটা মিউচুয়াল হলেই ভালো হয়। খুব বেশি দিন সময় লাগবে না। ( Advocate Roy)

– আমি ডিভোর্স দেবো না। ( আকাশ)

– তাহলে কেস টা আমি সাজিয়ে নেব। আর তোমরা এখন সেপারেশনে থাকবে যতদিন ডিভোর্স চলবে। যদি হিয়া চায়। ( Advocate Roy)

– আমি চাই sir। ( হিয়া) 

– okay ( Advocate Roy)

উকিলের সাথে কথা হয়ে ওরা ঠিক করে হিয়া আর আকাশ সেপারেশনে থাকবে। আকাশের অমত থাকলেও হিয়ার ইচ্ছেটাই প্রাধান্য পেল। হিয়া আর অর্নব এক সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিনের পর থেকে হিয়া অর্নবের বাড়িতেই থাকে। মৃণালিনী দেবী আর সুধীর বাবুও হিয়া কে মেনে নেয়। 

একটা মাস পেড়িয়ে গেছে ওরা এখন এক সাথেই থাকে। ডিনার সেড়ে দুজনে ঘরে চলে যায়। এখন যদিও দুজনের ঘর আলাদা। ডিভোর্স টা মিটে গেলেই ওদের চার হাত এক করে দেবে মৃণালিনী দেবী। 

রাত বেশ গভীর হয়েছে। প্রায় দেড় টার কাছাকাছি। হিয়ার ফোন পেয়ে উঠে বসে অর্নব। 

– হ্যালো! কি রে?

– ঘুমিয়ে পড়েছিলি ?

– আমি ঘুমিয়ে পরলে তোর সাথে রাত জাগবে কে ?

– বারান্দায় আসবি একবার! 

– আসছি দাড়া। 

– হুমম। 

হিয়ার কথায় বারান্দায় যায় অর্নব। রেলিং ধরে দাড়িয়ে হিয়া। নিশব্দে পেছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে হিয়া কে। হিয়া চমকে উঠতেই আঙ্গুল দিয়ে থামিয়ে দেয় অর্নব। ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে বলে,

– কি রে! ডাকলি যে!

– এমনি। একা থাকতে ইচ্ছে করছিলো না। 

– একা! আমি আছি তো। 

– ওই জন্যেই তো ডাকলাম। 

– অর্নব ! 

– বল।

অর্নবের দিকে ফিরে জড়িয়ে ধরে হিয়া। হিয়ার কপাল থেকে চুল সরিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ায় অর্নব। দুহাত দিয়ে হিয়ার গাল ধরে চোখে চোখ রাখে অর্নব। হিয়ার ঠোঁটের দিকে ধীরে ধীরে ঠোঁট আনতেই চোখ বুজে ফেলে হিয়া। হিয়ার ঠোঁটের মাঝে আঙ্গুল রাখতেই হিয়া কেঁপে ওঠে, অর্নবের শার্ট মুঠো বন্দি হয় হিয়ার। হিয়ার ঠোঁটদুটো অধিকার করে অর্নবের ঠোঁট। হিয়াও অর্নবের সাথেই ঠোঁটের মাঝে প্রেম খোঁজে। অনেকটা সময় দুজন দুজনের ঠোঁটে থাকায় দুজনেরই নিশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। অর্নব একটু সরতে চাইলেও হিয়া জড়িয়ে ধরে অর্নব কে।

” চলে যাস না প্লিজ। ”  বলে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে তাকে। অর্নব হিয়া কে তার ঘরে নিয়ে আসে। হিয়া লজ্জা পেয়ে খাটের ধার ঘেষে বসলে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে অর্নব। 

– কি রে! কাছে আসতে দিবি না?

– কাছেই তো আছি রনো।

হিয়ার কাঁধে হাত দিতেই হিয়া হাত চেপে ধরে অর্নবের। অর্নব কিছুটা আনদাজ করে, হিয়ার অনুমতি নিয়ে কাঁধের পাশের কুর্তি নামিয়ে দেয়। কালশিটে দাগ এখনো স্পষ্ট। অর্নবের চোখ ভিজে ওঠে। ধীরে ধীরে হিয়ার কাঁধে অর্নব ঠোঁট ছোঁয়ায়। অর্নবের হাত শক্ত করে ধরে রাখে হিয়া। অর্নবের ঠোঁট হিয়ার ঘাড় ছুইয়ে ঠোঁটের কাছে এসে থামতেই অর্নবের ঠোঁট অধিকার করে নেয় হিয়া। 

– I love you ornob 

– I love you hiya 

অর্নবের চোখের কোণে জল চিক চিক করতে দেখে অর্নবের কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়ে দেয় হিয়া। অর্নব কে বুকে জড়িয়ে রাখে সারা রাত। 

প্রায় মাস দুয়েক কেস চলার পর মিউচুয়াল ডিভোর্সে রাজি হয় আকাশ। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা ও চায় হিয়ার থেকে। কথা দেয় যে সে আর কোনো দিন ওদের মাঝে আসবে না। 

হিয়ার অর্নব কে ছেড়ে যাওয়ার প্রায় দেড় বছর পরও এবার দুজনের চার হাত এক হওয়ার পালা। সম্পর্কে চিড় ধরলেও ভালোবাসায় ধরেনি। তাই আজ আবার ওদের এক হওয়ার দিন। অর্নব আর হিয়ার আজ বিয়ে। অগ্নি কে সাক্ষী রেখে পুরোনো মান অভিমান সব যজ্ঞের আগুনে পুড়িয়ে নতুন করে পথ চলা আবার শুরু। আর এবারের সম্পর্কে দুজনের একটাই প্রতিজ্ঞা ” ভালো লাগা, খারাপ লাগা সবটাই দুজনে মিটিয়ে নেবে, কোনো অভিমান, অভিযোগ চেপে রাখবে না আর হিয়ার দায়িত্ব অর্নবের, অর্নবের দায়িত্ব হিয়ার।”

Written By – Sushmita Saha