শালকুঠি রহস্য

Spread the love

 852 total views,  1 views today

অফিসের জরুরি তলবের সাড়া দিতে গিয়ে এক রোমাঞ্চকর ঘটনার সাক্ষী থাকলাম আমি আর তিতির। বেশ কয়েকদিন এই জায়গার নামে বিভিন্ন কানাঘুসো শোনা যাচ্ছিল। এই গ্রামের অদ্ভুত সব ঘটনার ট্রেন্ডীং নিউস চোখ ধাঁধিয়েছিল গোটা পশ্চিমবঙ্গের। সংবাদ মাধ্যমে চাকরির দৌলতে এই খবরের গোপনীয়তা সবার সামনে তুলে ধরার জন্য নিয়োগ করা হয় আমায় আর তিতির কে। অতএব মায়ের চিন্তার আঁচলের বাইরে আমায় যেতে হয় সেই শালকুঠি গ্রামে। তবে শেষমেস স্বস্তি এটাই যে সত্য উদ্ধার করতে আমরা পেরেছি।  সেই যাত্রা আর সেই শিহরিত প্রত্যেকটা মূহুর্তের সাক্ষী করতে আপনাদের শোনাব আজ সেই কাহিনী। তবে আমার লেখা সেই অভিজ্ঞতা কতোটা আপনাদের শিহরিত করতে পারবে তা জানি না। কারন সেই সব অভিজ্ঞতা র অনুভুতি ভাষায় ব্যক্ত করার ক্ষমতা আমার লেখনী তে নেই। যাই হোক যাত্রা শুরু করা যাক ।

টানা আট ঘন্টা ট্রেনের সফর সেড়ে শেষে পৌছালাম শালকুঠি । ট্রেন ঢোকার কথা ছিল সন্ধ্যে সাড়ে আট টায়,দুই ঘন্টা ট্রেন লেট। একেই শীত কাল তার উপর ঘন্টা দুয়েক রেললাইনেই কাটাতে হয়েছে আমাদের। তাই শেষমেস রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ট্রেন পৌছল আমাদের গন্তব্যে। একেবারে অজ গাঁ, শহরের এক টুকরো ছোঁয়া পায়নি এই গ্রামের মাটি। তাই আট টা বাজতেই সব আলো নিভে যায় এখানে। আলো বলতে শহরের মতো সাদা-হলুদ বা নিয়নের আলো নয়, এখানে শুধু পিদিম নাহলে কুপি ই ভরসা। কেবল স্টেশনের উপরে একটা হলুদ আলো মিটমিট করে জ্বলছে। সেই আলো তেই যতটুকু দৃশ্যমান ততটুকুতেই দেখতে পেলাম স্টেশন থেকে নেমে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে গ্রামের দিকে। সেই রাস্তায় কোনো আলো নেই। একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। জনমানব শূন্য। আমি আর তিতির ছাড়া আমাদের সাথে কেউই আর নামেনি ট্রেন থেকে। সব থেকে যেটা আশ্চর্যের সেটা হলো এই শালকুঠি স্টেশনে কোনো স্টেশন মাস্টারের দেখা মিলল না। স্টেশন টা ট্রেন থেকেও বেশ কিছুটা নিচু। মাটির টিবির উপরে কোনো রকমে ইট সাজানো প্ল্যাটফর্ম। পাশে ট্রেন লাইন। যতোটুকু শুনেছি সন্ধ্যে নামলেই এদিক টা আর কেউ পা মারায় না। সেই কারন জানতেই তো আমাদের আসা। ট্রেন থেকে নেমেছি প্রায় আধঘন্টা পেড়িয়েছে। ট্রেন থেকে নামার পর থেকে আমায় চুপ থাকতে দেখে তিতির একটু ভয়ার্ত কণ্ঠ এ বলে,
– ঋজু ! শোন না!
– হুম বল।
– এতো রাতে না এলেই ভালো হতো রে।
– ভয় পাচ্ছিস ?
– না সেটা না। কিন্তু এতো রাতে কোথায় যাব?
–  বুঝতে পারছি। কিন্তু কি করার আর ! এসেই পড়েছি যখন।
– হুম! দূরেও তো কিছু দেখা যাচ্ছে না।
– স্টেশন মাস্টারের ও তো দেখা নেই। এই ভাবে কোনো কিছু না বলে স্যার আমাদের এখানে পাঠিয়ে দিলেন। ( একটু রাগের সাথেই বললাম)
– রেগে যাস না।
– আর রাগ করে কি হবে! তিতির , তুই এই প্লাটফর্ম এ থাকতে পারবি ?
– না পারলেও থাকতে হবে। চল রাস্তার দিকটায় গিয়ে বসি।
– চল।
– ঋজু ! খাবি না কিছু ?
– কি খাবো এখানে ?
– আমার কাছে কেক আছে।
– না না তুই খেয়ে নে।
– চুপ কর। তুই হাফ, আমি হাফ।
– Okay okay

প্লাটফর্ম এর শেষের দিকে রাস্তা শুরু, সেখানেই বসে রাত টা কাটিয়ে দেবো ঠিক করলাম। তিতিরের কাছে কেক ছিল সেই কেক দিয়েই কোনোরকমে রাতের খাবার সারলাম। একেই অন্ধকার তার উপরে শীত যেন জাঁকিয়ে বসেছে। মশার উৎপাত ও নেহাত কম নয়। অফিস থেকে সোজা বেড়িয়ে পড়েছিলাম। তাই বড্ডো ক্লান্ত ছিলাম দুজনেই। শীত এর প্রকোপ আর মশার উৎপাত থাকা সত্বেও আমাদের ক্লান্ততার কাছে হার মানল। তবে তিতির কে ঠান্ডায় জড়োসরো হতে দেখে ব্যাগ থেকে চাদর বেড় করে দুজনে সেই চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে আর ঘুম ভাঙেনি। সকালে তিতিরের আগে ঘুম ভাঙে। আমাদের এই ভাবে এক চাদরে দেখে একটু লজ্জাই পেয়েছিল বোধহয়। ওর ডাকেই আমার ও ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙা চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে দাড়ালাম। গ্রাম টা যে এতো সুন্দর হবে সেটা কল্পনাতেও আসেনি। যেন দক্ষ হাতে একবারে নিপূণভাবে আঁকা। মেঘ গুলো ভেসে যাচ্চে নিজের খেয়ালে, রোদ হাসছে। আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক। মন্ত্র মুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিলাম আমরা। এই গ্রামের সৌন্দর্যই যেনো আমাদের গ্রাস করে ফেলেছিল। কিন্তু এই গ্রামেই নাকি অশুভ ছায়া ! বিশ্বাস করা সম্ভব হচ্ছিল না আমাদের পক্ষে। আমাদের মুগ্ধতা কাটলো স্টেশন মাস্টারের ডাকে। পেছন থেকে গম্ভীর কৌতূহলী কন্ঠে কেউ বলল,

– কারা আপনারা ? কোথা থেকে এসেছেন ?
– আমি ঋজু আর ও তিতির। আমরা কলকাতা থেকে এসেছি।
– সে কি ? আজ সকালে তো এখনো কোনো ট্রেন আসেনি।
– না না আমরা কাল রাতের ট্রেনে এসেছি।
– কি ? কি বলছেন টা কি আপনারা ?
– হ্যাঁ ! সাড়ে আটটা তেই নামার কথা ছিল কিন্তু দু ঘন্টা ট্রেন লেট হওয়ায় সাড়ে দশটা নাগাদ নামলাম।
– আপনারা ঠিক আছেন তো ?
– হ্যাঁ। কেনো ?

স্টেশন মাস্টারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম লক্ষ করলাম।

– এই স্টেশন চত্ত্বরে সন্ধ্যে নামলে কেউ আর এদিকে পা পর্যন্ত মারায় না। আর আপনারা সাড়া রাত কাটিয়ে দিলেন!
– কিন্তু কেনো এদিক টায় কেউ আসে না সেটা কি জানতে পারি?
– সব কথা এখানে বলা যাবে না। ওরা ওরা শুনে নেবে।
– কারা ?
– ওরা ! আমাদের দেখছে।
– আরে ধূর মশাই। কি বলছেন ? কারা দেখছে।
– ধীরে কথা বলুন।

স্টেশন মাস্টারের কথায় তিতির যে বেশ ভয় পেয়ে গেছিলো তা বুঝেছিলাম আমার শার্ট ওর মুঠোয় শক্ত করে ধরার ভঙ্গি দেখে। তিতির কে সামলে নিয়ে স্টেশন মাস্টার কে বললাম,

– আচ্ছা আপনার বেকার কথা অনেক শুনেছি। এবার আমাদের থাকার একটা ব্যাবস্থা করে দিন দয়া করে।
– এখান থেকে চলে জান আপনারা যদি বাঁচতে চান।
– আপনাকে যত টুকু বলা হচ্ছে ততো টুকু করলেই খুশি হবো।
– আপনাদের ভালো কথা বলছি। আপনারা চলে যান।

একটু রেগেই গেছিলাম বটে, রাত থেকে আধ পেটা থেকে, শীতে কাঁপুনিতে ক্লান্ত শরীরে এই সব কথা ঠিক হজম করতে পারছিলাম না।

-আমাদের থাকার ব্যাবস্থা টা কি করতে পারবেন?
– শুনলেন না তবে আমার কথা ! বেশ। পরে পস্তাবেন।
– হুম। ঠিকাছে ঠিকাছে।
– আসুন আমার সাথে।
– চলুন। তিতির চল। যতো সব উটকো বিপদ।

স্টেশন মাস্টারের পথ অনুসরন করে এগিয়ে চললাম। প্লাটফর্ম থেকে নেমে যে রাস্তা গ্রামের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তা দিয়েই নিয়ে গেলেন আমাদের। দারুন সুন্দর গ্রাম। রাস্তার দুই ধারে খেত জমি। মাঝে মাঝে বড়ো গাছ। কৃষকদের বিশ্রামের জন্যই যেন তারা ছায়া প্রদান করছে। এতোটা এলাম বেশ মসৃন রাস্তা দিয়েই। এবার রাস্তা শেষ হয়ে জমির আল ধরে চলতে হলো বেশ খানিকটা পথ। হেটে প্রায় আধঘন্টা মতো সময় লাগলো পৌছাতে। গ্রামে একটাই পাকা বাড়ি। রাজেন্দ্র নাথ সান্যালের। এই গ্রামের মধ্যে বেশ অবস্থাপণ্ন ঘর তার একারই। গ্রামের সবাই তাকে স্রদ্ধা আর সন্মানের চোখেই দেখেন। উনার বাড়িতে গিয়েই উঠলাম আমরা। স্টেশন মাস্টারের অনুরোধে একটা ঘর আমাদের জন্য খুলিয়ে দিলেন রাজেন্দ্র বাবু। না হলেও প্রায় এক বিঘের উপরে শুধু তার বাড়ি, বাকি চাষের জমি তো আছেই। অতিথি আপ্যায়নেই আমাদের স্বগতম জানালেন রাজেন্দ্র বাবু। তিতির এর মুখে হাসি দেখে বেশ বুঝলাম ওর মনের ভয় টা কিছুটা হলেও কমেছে। ঘরে গিয়ে চেয়ারে ব্যাগ রেখে খাটে শরীর এলিয়ে দিলাম। একটা পরম শান্তির আবেশে চোখ বুঁজে এলো। মনে হয় মিনিট দশেকের জন্য ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। তিতির বাইরের বাথরুমে ফ্রেশ হতে গেছিলো, কখন নিশব্দে ঘরে এসেছে তাও টের পাইনি। তবে তিতির এর চুলের জলের ছাটেই আমার নিদ্রা ভঙ্গ হলো। চোখ খুলেই দেখি সাদা একটা কুর্তিতে তিতির। লাল,হলুদের কারুকার্য করা। সম্মহিতের মতো তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। চোখ সরত না ওর থেকে যদি না কলকাতা থেকে স্যার এর ফোন আসতো আর সেই ফোনের আওয়াজেই ওর চোখে চোখ পড়ত। আমার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে এক গাল হাসি নিয়ে বলে ,

– এই। ফোন টা ধর।
– হুম। হুম।

আমিও আমতা আমতা করে ফোন রিসিভ করলাম। কিন্তু ফোনে কিছুক্ষণ কথা বলার পরই ,আমাদের এই গ্রামে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য মনে পরতেই আমার হাসি বিলীন হয়ে গেল এক মুহুর্তে। কাল রাতেও স্যার ফোন করেছিলেন কিন্তু নেটওয়ার্ক এর প্রবলেম এর জন্য কথা বলতে পারেননি সেই কথা ও জানিয়ে দিলেন। আর এটাও বললেন আমাদের এখানে আসার কারন আর নিজেদের আসল পরিচয় যেন না দিই। স্যার এর সব কথার উত্তরে সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখে উঠে বসলাম। তিতির পাশে এসে বসল,

– কি রে ? কি হলো ?
– আমাদের এখানে আসার কারণ মনে করিয়ে দিলেন।
– হুম। এই গ্রামের সৌন্দর্য দেখে আমরা তো ভুলতেই বসেছিলাম।
– তিতির তোর কি মনে হয়? ঘটনা গুলো সত্যি ? মানে গ্রামের মানুষের হটাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়া। এটা কি সত্যি?
– এখনই কিছু বোঝা যাচ্ছে না রে। দেখি বেরোবো একটু পর।
– গ্রামের লোকজনের সাথে কথা বলবি ?
– হ্যাঁ। সেটাই ভাবছি। কিন্তু কিভাবে বলবো!
– আচ্ছা রাজেন্দ্র বাবু কে বললে হয় না ? উনি তো শিক্ষিত।
– উনি ব্যাপারটা চেঁপে যাবে বলেই আমার ধারনা।
– হুম। আচ্ছা এখন যা তুই ফ্রেশ হয়ে আয়।
– হুম যাচ্ছি।

আমি ফ্রেশ হতে চলে গেলে  তিতির ব্যাগ থেকে আমার টাওয়াল বেড় করে খাটের উপরে রেখে বারান্দায় গেল। ফ্রেশ হয়ে আমি আর তিতির রাজেন্দ্র বাবুর কথায় নীচে চলে গেলাম। উঠোনে রোদের মধ্যে আরাম কেদারায় বসে রাজেন্দ্র বাবু। আমাদের দেখে উঠে দাড়িয়ে বেশ খোশ মেজাজে বসতে বললেন।

– আরে আসো আসো। বোসো তোমরা।
– ধন্যবাদ জেঠু।
– আচ্ছা এবার বলো। তোমরা কলকাতা শহর ছেড়ে হটাৎ এইখানে কি কারণে?
– ( তিতির কিছু একটা বলতে যাবে আমি হাত চেপে ধরে কিছু না বলার ইঙ্গিত করলাম) আসলে জেঠু শহরের বন্দী জীবন থেকে একটু মুক্তির আশায় আসা। এই আর কি। ( তিতির ও মাথা নেড়ে আমার কথায় সম্মতি জানালো)
– ও আচ্ছা আচ্ছা। তোমাদের যত দিন ইচ্ছে এখানে থাকো। ঘোরো। খাওয়া দাওয়া করো। শুধু ,,,,,
(কথাটা শেষ না করেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে খানিকটা হুমকির সুরেই বললেন ,) এই গ্রামের কোনো গুজবে কান দেবেন না।
– গুজব? কেমন ?
– এখানে আসার আগে কিছুই শোনেন নি ?
– না তো।
– সেরম কিছু না। গ্রামের অনেকে বলে যে তাদের বাড়ির লোক নাকি হটাৎ ই উধাও হয়ে যাচ্ছে। রাতে নাকি নিশিতে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আর ফিরছে না। আবার অনেকে এও বলছেন যে স্টেশন চত্ত্বরেই নাকি তেনাদের আড্ডা।
– ও। আচ্ছা এই ব্যাপার! স্টেশন মাস্টারের মুখেও শুনলাম। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আমরা এসবে বিশ্বাসী নই।
– তোমরা শহরে মানুষ তাই তোমাদের এসব বিশ্বাস না হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাকে তো এই গ্রামেই থাকতে হয় তাই এই নিয়েই দিন কাটে।
– হুম।
– আচ্ছা তোমরা যাও ঘুরে এসো গ্রাম টা।
– জেঠু বলছি কিছু খাওয়ার ব্যাবস্থা হবে? বড্ডো খিদে পেয়েছে। কাল রাত থেকে আমাদের কিছু খাওয়া হয় নি।
– হ্যাঁ হ্যাঁ! অবশ্যই। আহা ! লজ্জা পাচ্ছ কেনো ? নিজের বাড়ি মনে করেই এখানে যে কদিন আছো থাকো। কোনো অসুবিধে হলেই আমাকে জানাবে।
– আচ্ছা।
– আমি তোমাদের ঘরে খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।
– ধন্যবাদ জেঠু। আমরা তাহলে ঘরে যাই।
– হ্যাঁ। এসো।

আমরা ঘরে গেলে রাজেন্দ্র বাবুর বাড়ির পরিচারিকা আমাদের জন্য খাওয়ার ঘরে নিয়ে এলেন। ফুলকো লুচি আর আলুর দম। সাথে চার রকমের মিষ্টি। আমরা দুজনেই পেটুক তাই খাওয়া নিয়ে নো কম্প্রোমাইস। আমি দশ টা আর তিতির আট টা লুচি অনায়াসেই পেটে পুড়ে নিলাম। সকালের জল খাবারে লুচি পেয়ে দুজনেই বেশ তৃপ্তি অনুভব করলাম। জল খাবার সেড়ে গ্রাম টা ঘুরে আসার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন সময় দরজায় কার যেন কড়া নাড়ার শব্দ কানে এলো। আমি আর তিতির দুজন দুজনের দিকে বিস্ময় দৃষ্টি এনে দরজা খুলতে গেলাম। তিতির ও আমার পেছনে ছিল। দরজা খোলা মাত্র একজন অনুমতি না নিয়েই ঘরে ঢুকে পরল। পরনে ছেড়া ফতুয়া, ধুলো জড়ানো ধুতি, উস্ক শুষ্ক এলো মেলো চুল। অবাক হয়ে তিতির প্রশ্ন করলো,

– আপনি কে ? আমাদের ঘরে কেনো ?
লোক টা হো হো করে হেসে উঠলো।
-তোরা চলে যা এখান থেকে। এখানে যাদের বিশ্বাস করবে তারাই ছুরি বসাবে পিঠে। চলে যা। চলে যা।

লোকটার কথা শেষ হতেই রাজেন্দ্র বাবু আর সাথে দুই জন লোক হাতে লাঠি নিয়ে ঘরে হাজির। রাজেন্দ্র বাবুর আদেশে দুই জন লাঠি হাতে লোক ঘরে এসে লোকটাকে জোর করে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। যাবার সময় বলে গেল
” এরা কেউ ভালো না। তোরা চলে যা। চলে যা।”
আমরা অবাক চোখে দর্শকের ভূমিকায় থেকে গেলাম।
রাজেন্দ্র বাবু আমাদের কাছে এসে নিচু গলায় বললেন,

– গ্রামের সবাই আপনাদের এইভাবেই হয়ত বলবে। ক্ষমা করবেন। এই লোকটা পাগল তাই এভাবে ঘরে ঢুকে পরেছে।
– না না ঠিকাছে।
( আমি একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম)
আচ্ছা সত্যিই কি সব টাই গুজব ?
– তা ছাড়া আর কি বা হবে? আপনারা এই নিয়ে বেশি মাথা ঘমাবেন না।
– হুম।

রাজেন্দ্র বাবু চলে গেলে তিতির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে আমার পাশে এসে বসল।

– ঋজু? কি ভাবছিস ?
– হুম। কিছু না।
– আর বেড়বী এখন?
– নাহ। দুপুরের খাবার সেড়েই বেরোবো।
– হুম আমিও তাই ভাবছিলাম।
– বুঝলি তিতির! ব্যাপার টা অতটাও সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না।
– হুম তা তো বটেই। এরা কেউই সহজে মুখ খুলবে না। তবে
– তবে?
– তবে আমার এই রাজেন্দ্র বাবু কে ঠিক সুবিধার ঠেকছে না।
– কেনো ?
– দেখ উনিই নিজেই আমাদের গুজবের কথা গুলো বললেন আবার নিজেই চাইছেন না অন্য কেউ বলুক আমাদের।
– বিষয় টা আমার ও যে অদ্ভুত লাগেনি তা নয়। তবে উনার কি স্বার্থ!
– সেটা তো এই রহস্যের সমাধানের শেষেই জানা যাবে।
– হুম।

সিগারেটে টান দিতে দিতে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম। বেলা গড়িয়ে দুপুর হলো। দুপুরের খাওয়ার সময় হতে একজন এসে আমাদের ডেকে বলে গেলেন, নিচে খাবার ঘরে রাজেন্দ্র বাবু অপেক্ষা করছেন। আমরা খাবার ঘরে গেলাম। রাজেন্দ্র বাবু আপ্যায়ন করে আমাদের বসতে বললেন। খাবারের রকম ফের দেখে চক্ষু চড়ক গাছ। দুই থেকে তিন রকম মাছ, সবই নাকি পুকুরের। আবার তেল কষকষে মাংস। মাছের সর্ষে। ডাল,আলু ভাঁজা , বেগুন ভাঁজা, পটল ভাঁজা তো আছেই। সাথে মিষ্টি দই, রসগোল্লা। বুঝতেই পারলাম না প্রতিদিনের দুপুরের আহাঢ় নাকি বিয়ে বাড়ির পেট পুজো। তিতির আমার থেকেও বেশি পেটুক তাই ও বেশ খুশি হয়েছিল। দুজনেই প্রয়োজনের থেকে বেশি খেয়ে নিয়েছিলাম। দুপুরের খাবার সেড়ে রাজেন্দ্র বাবু কে বলে বেলা তিনটে নাগাদ বেড়োলাম গ্রাম ঘুরে দেখতে। উনি মানা করলেন না শুধু একটু গম্ভীর ভাবেই বললেন ” যা বলেছি মনে আছে নিশ্চই। যাও তবে বেশি দেরী করো না। এই গ্রামে সন্ধ্যে সাতটার পরে আর কেউ বাড়ির বাইরে থাকে না। আর স্টেশন চত্ত্বরে যেও না।” আমরা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। জমির আল ধরে আমরা হেটে চলেছি। এই জমি পেরোলেই রাজেন্দ্র বাবুর সীমানা শেষ। তারপরে গ্রামের জন বসতি। মাটির দেওয়ালে আঁকা সুন্দর সুন্দর আল্পনা। আমাদের দেখে গ্রামের বাচ্চা রা পিছূ নিয়েছে। কেউ কেউ পুকুর ঘাটে স্নান করছে, বাসন মাজছে। ঠিক যেমন আমরা গ্রামের দৃশ্য আঁকার সময় কল্পনা করি, ঠিক তেমন ভাবেই যেন এই গ্রাম ও কেউ এঁকেছে। প্রাণ দিয়েছে সেই আঁকায়। মাটির রাস্তা তবে বেশ পরিস্কার। মাঝে মাঝে রাস্তার উপরেই বিছানো রয়েছে ধান।

– কি রে তিতির ! কেমন লাগছে ?
– দারুন রে। শহরের যান্ত্রিকতায় যন্ত্র মানব হয়ে যাচ্ছিলাম যেন। এখানের বাতাসে যেন প্রাণ আছে। ভালো থাকা আছে।

তিতিরের কথা কেউ মনে হয় শুনতে পেয়েছিল। একজন বয়স্ক লোক আমাদের সামনে এসে দাড়ায়। চোখ মুখে অসহায়তার ছাপ। ভয়ার্ত কন্ঠে আমাদের বললেন,

– এখানে কেউ ভালো নেই মা। এই গ্রামের বাতাসে বিষ আছে।
– আপনি এরকম কেনো বলছেন।
– এই গ্রাম অনেক কে হারিয়েছে। তাদের খোঁজ পাওয়া যায় নি।
– আপনারা খুঁজেছেন?
– হ্যাঁ। আমার ছেলে। একদিন রাতে হটাৎ উধাও হয়ে গেল।
– কিভাবে?
– ও ঘুমোচ্ছিল। আমরা পাশের ঘরে ছিলাম। দরজা খোলার আওয়াজে ঘুম ভাঙলে দেখি পাশের ঘরে আমার ছেলে নেই। রাতে খুঁজলাম। সকালে ও। কোথাও পাইনি। সবাই বলল নিশি তে ডেকে নিয়ে গেছে।

বয়স্ক লোকটার কথায় আমাদের হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। আরো কয়েক জন আমাদের ঘিরে একই রকম কাছের মানুষ হারানোর কথা বলতে লাগলো। ভীড়ের মধ্যে থেকে ভেসে আসছিল ” নিশিতে আমার ছেলেকেও ডেকে নিয়ে চলে গেছে”  আবার ” ওরা আমার স্বামী কে মেরে ফেলেছে” কেউ কেউ আবার বলল ” রাতে আর আমার মেয়ে বাড়ি ফেরেনি”। প্রত্যেকটা শব্দ যেন তীক্ষ্ম ছুরির মতো শরীরে বিঁধছিল। তিতির ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছিল আমার পেছনে। মানুষ গুলোর মুখের ভাব যেন কেমন বদলে যাচ্ছিল। ভীড় তখনো বেড়ে চলেছে, শোক গুলো যেন অভিযোগের মতো শোনাচ্ছিলো আমাদের। ভীড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা কিছুটা দুরে। তিতির তখনো ভয়ে গুটিয়ে। কাঁপতে কাঁপতে বলল,

– ঋজু! ঋজু! প্লিজ এখান থেকে ফিরে যাই। প্লিজ ঋজু।
– তিতির ভয় পচ্ছিস কেনো? এরা কি বলল আর তুই বিশ্বাস করে নিলি?
– কেনো তুই ওদের চোখে ভয় দেখিস নি ? বল ! তোর মনে হয় নি একবার ও যে ঘটনা গুলো সত্যি হতেও পারে।
– হ্যাঁ মনে হয়েছে। আর ঘটনা গুলো সত্যিও।
– তারপরেও তুই এখানে থাকবি?
– হ্যাঁ। আমাকে জানতেই হবে এইসবের পেছনের কারন।
– আর তোর কিছু হয়ে গেলে ! আমার কি হবে ?

তিতিরের চোখে আমার জন্য ভয় দেখতে পেলাম। ওর কথায় কিছুটা চুপ হয়ে গেছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কি উত্তর দেবো। কারন এই রহস্য সমাধান করতে হলে তো নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলতেই হবে। তিতির কে জড়িয়ে ধরে আশ্বাস দিয়ে বললাম।

– তুই থাকলে আমার কিছু হতে পারে ?
– আমার খুব ভয় করছে ঋজু।
– ভয় পেতে হবে না। আমার কিছু হবে না। এখন চল। ছয় টা বাজতে যায়।
– হুম।

সেদিনের মতো বাড়ি ফিরে এলাম। ঘরে এসে হাত মুখ ধুঁয়ে চা এর কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলাম দুজনে। তিতিরের মন থেকে এখনো ভয় কমেনি। শীতও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছিল। তিতির কে শান্ত দেখে ওর পাশে গিয়ে বসলাম। গায়ের চাদরটা ওর গায়েও জড়িয়ে দিলাম।

– কি রে এখনো ভয় পচ্ছিস?
– ভালো লাগছে না।
– কেনো ?
– ( তিতির আরো কিছুটা কাছে এসে আমার বুকে মাথা রাখল) তোকে হারিয়ে ফেলব না তো ঋজু?
– এই ! তুই এতো ভাবিস কবে থেকে আমার জন্য !
– ভাবতাম। অনেক আগে থেকে। যেদিন থেকে তুই অফিসে প্রথম এলি সেদিন থেকে।
– তিতির !
– ঋজু I love you

আমার চোখ স্থির হয়ে গেল ওর চোখে, মুখ থেকে একটা কথাও বেরোল না আমার। চোখ ভিজে এলো শুধু জড়িয়ে নিলাম ওকে। অনেকক্ষণ ওকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম। ওর নিশ্বাসে ওর মনের চঞ্চলতা আন্দাজ করছিলাম। কানের কাছে ঠোঁট এনে বললাম,

– তিতির! আগে বলিস নি কেনো যে আমায় ভালোবাসিস?
– ভয় করতো।
– আর ভয় নেই?
– এখন তোকে হারানোর ভয় বেশি ঋজু।
– হারাবি না। love you titir

প্রথম বার ভালোবাসার অনুভুতি অনুভব করেছিলাম সেই সন্ধ্যে তে। একটা সুন্দর ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবে খুব বেশি ক্ষণ সেই পরিবেশ উপভোগ করতে পারলাম না। দরজার কড়া নাড়ার আওয়াজে আমাদের সেই সুন্দর মুহুর্ত থেকে কিছু ক্ষণের জন্য ছুটি নিতেই হলো। রাজেন্দ্র বাবুর বড়ো জামাই। বেশ মজার লোক। নিজে থেকেই পরিচয় করতে ছুটে এসেছেন।

– আসতে পারি?
– হ্যাঁ এসেই যখন পড়েছেন আসুন।
– হ্যাঁ! কিছু বললেন।
– না না । বসুন বসুন।
– হুম। বসবো বটে। এই বোসলুম। আজ্ঞে বলছি আপনাদের কোনো অসুবিধে নেই তো?
– না। বলুন।
– আপনারা কোত্থেকে এইছেন?
– কলকাতা।
– কলকেতা ! বাব্বা ,শহরের বাবু আপনারা।
– না না তেমন কিছু না।
– কিছু না বললেই হলো ! কত্ত বড়ো বড়ো বাড়ি, হুশ করে চড়ে বেড়াছে টিনের বাক্স।
– টিনের বাক্স!
– ওই যে যাতে করে আপনারা যাতায়াত করেন।
– ও আচ্ছা। ওটা টিনের বাক্স না। ওটা গাড়ি বা বাস।
– সে অতো কিছু বুঝি না ভায়া।
– আচ্ছা আচ্ছা।
– আপনারা কদ্দিনের জন্য এইছেন!
– এই তিনদিন বড়োজোর ।
– বেশ বেশ। আচ্ছা একটু এদিকে শুনুণ।
– ( আঙ্গুলের ইশারায় ঘাড় নামাতে বললেন) বলুন।
– এই গাঁ য়ে ভূতের উত্পাত এর কথা শুনেছেন?
– হ্যাঁ ওই আর কি।
– ( ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ এনে বললেন) এখানে নিশি ডাকে। রাতে কেউ ডাকলে বেড়োবেন না। বুঝলেন।
– হুম। আচ্ছা প্রতি রাতেই শোনা যায় ?
– তা ঠিক জানি না। কিন্তু রাতে কেউ ডাকলে যাবেন না। বুঝেছেন। আজ আসি।
– হুম। আসুন।

রাজেন্দ্র বাবুর বড়ো জামাই চলে গেলে ঋজু আবার জড়িয়ে ধরে তিতির কে।

– কি রে ! তিতির। আবার মুখ ভার কেন ?
– উনি কি বলে গেলেন !
– ধূর ছাড় তো। তুই থাকতে আমাকে থোড়াই না কোনো ভুত ডাকবে।
– সব সময় ইয়ার্কি ভালো লাগে না।
– আচ্ছা ভিতু তো তুই। আরে আমার কিছু হবে না।
– হুম।

রাতের খাবারের জন্য ডাক পরল। আবার মহা ভোজের আয়োজন। রাতের খাবার সেড়ে ঘরে এলাম। বারান্দায় আমি আর তিতির দাড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। চিন্তার ভাঁজ কপালের রেখায় স্পষ্ট হতেই সিগারেটে টান দিলাম। তিতির আমার হাতে সিগারেট দেখে একটু রেগেই গেল। আগে বহুবার না করা সত্বেও আমি সিগারেটের সাথে বন্ধুত্ব শেষ করতে পারিনি। কিন্তু আজ পারতেই হলো।

– কি রে তুই আবার সিগারেট খাচ্ছিস ?
– আরে একটু টেনশন হচ্ছিল তাই। আর খাবো না আজকেই লাস্ট।
– এই কথা টা দু-বছর ধরেই শুনে আসছি। আমার কথা শুনতে ইচ্ছে করে না বল!
– এরম করে কেনো বলছিস। বললাম তো আর খাবো না।

তিতির আমার হাত থেকে সিগারেট টা নিজের হাতে নিয়ে রেলিং এ চেপে, আগুন নিভিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে আমার দিকে এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কাছে ঠোঁট এনে বলল ,

– আজ থেকে আর সিগারেটে ঠোঁট ছোঁয়াবি না। ঠোঁট ছোঁয়াতে হলে আমি আছি তো।
– হুম। বুঝেছি।

তিতিরের ঠোঁট ছুঁল আমার ঠোঁট। আমার কাঁধে ওর নরম হাতের স্পর্শে ওকে জড়িয়ে নিলাম। অনেকটা সময় ওর ঠোঁটের উষ্ণতায় হারিয়ে ছিলাম।
হটাৎ বাইরের একটা জটলার আওয়াজ আমাদের কানে এলো। নিচে তাকিয়ে দেখলাম কয়েক জন লোক ছোটা ছুটি করছে। আমরা তড়িঘড়ি বাইরে বেরোতে যাবো বলে নিচে গেলাম। কিন্তু আমাদের বাইরে যেতে না করলেন রাজেন্দ্র বাবু। অনেক বার বলা স্বত্তেও উনি রাজি হলেন না। অগত্যা পুরো বিষয়টা বারান্দা থেকে মাপার চেষ্টা করলাম। খুব একটা বেশি লাভ হলো না শুধু এইটুকু বুঝলাম আবার কারোর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ঘরে এসে খাটে শুয়ে পড়লাম। তিতির ঘুমিয়ে পড়লেও আমার চোখে ঘুম এলো না। কোনো অঙ্ক মেলাতে পারছিলাম না। একটা দিন পেড়িয়ে গেল কোনো সূত্রই পেলাম না। হাতে ছিল আর মাত্র দুটো দিন। ভাবতে ভাবতেই চোখ জুড়িয়ে আসছিল এমন সময় আমাদের ঘরের দরজার বাইরে কাদের যেন কথা শুনতে পেলাম। নিশব্দে উঠে দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। স্পষ্ট না হলেও কথা গুলো শোনার চেষ্টা করলাম। রাতের জটলা নিয়েই কথা হচ্ছিল। গ্রামের বছর চব্বিশের একটা ছেলেকে নাকি নিশিতে ডেকে নিয়ে গেছে। কথাটা শোনার পর আর ঘরে থাকতে পারলাম না। স্পাই ক্যামেরা বুক পকেটের বোতামে লাগিয়ে তিতির কে কিছু না জানিয়েই বেড়িয়ে পড়লাম স্টেশনের দিকে। দেখলেও কেউ যেন চিনতে না পারে তাই গায়ে শাল জড়িয়ে নিলাম। ঘড়ির কাটায় রাত তখন বেশ গভীর। শুনশান রাস্তা। ফোনের আলোয় যতো টুকু দেখা যাচ্ছিল সেই ভরসায় এগিয়ে চলছিলাম। কয়েক জন কে দেখলাম আমার মতই চাদর মুড়ি দিয়ে স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। আমিও সেই পথ অনুসরন করলাম। ওদের পিছূ পিছূ চললাম। গা ছম ছমে পরিবেশ। একেবারে জনমানব শূন্য পথ। ঝি ঝি পোকার ডাকে রাত মেতে উঠেছে। জোনাকি রা স্বত্স্ফুর্ত চলা ফেরায় মনে হচ্ছিল আকাশের তারা যেন নেমে এসেছে মাটিতে। মাঝে সাঝে একটা দুটো শেয়াল ও ডেকে উঠছে। চাঁদ পুর্ণ রূপে আকাশে বিরাজমান। মেঘেদের সাথে লুকোচুরিতে মত্ত। কানের পাশ দিয়ে শো শো করে বাতাস বয়ে চলেছে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। শীতের তোয়াক্কা না করেই স্টেশনের দিকে পা চালিয়ে চললাম। গ্রাম থেকে প্রায় আধ ঘণ্টার রাস্তা। একেই রাত তাই চিনতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল। পয়তাল্লিশ মিনিট পরে পৌছালাম স্টেশনে। আশেপাশে আর কাউকে দেখতে পারলাম না। মিনিট খানেক বাদে কয়েক জন বেশ ভারী চেহারার লোককে স্টেশনের পেছনের জঙ্গলের দিকে যেতে দেখলাম। আমিও সেই পথেই গেলাম। বেশ কিছুটা গভীরে যেতেই আমি তো হতবাক। একি ! এই জঙ্গলের মাঝে এরম পাঁকা বাড়ি। যদিও এক তলা। কেমন যেন আষ্টে গন্ধ নাকে এলো। গন্ধটা এতটাই তীব্র যেন মনে হয় সদ্য পাঁঠা বলি হয়েছে। চুপচাপ গাছের পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম। কয়েকজন বাইরে দাড়িয়ে। কি নিয়ে যেন আলোচনা করছে। আর কয়েক জনকে দেখলাম একটা বস্তায় কি যেন ভরছে। বেশ ভারীই ঠেকল ওদের মুখের ভঙ্গি দেখে। অন্ধকারে দৃষ্টি স্পষ্ট হতে একজন কে ওদের মধ্যে বেশ চেনা চেনা লাগলো। আরেকটু স্পষ্ট হতেই চিনে ফেললাম, সুধীর বাবু রাজেন্দ্র বাবুর বড়ো জামাই। মনে প্রশ্ন এলো ” এই রাতে উনি এখানে কি করছেন! আর সবচেয়ে আশ্চর্যের যে যিনি আমাদের সামনে বোকা বোকা কথা বলছিল তার চোখে এখন এরকম তিক্ষনো দৃষ্টি!”  স্পাই ক্যামেরায় সব ভিডিয়ো হচ্ছিল। আরো কিছুটা এগিয়ে যাব ওদের কথা শোনার জন্য কিন্তু সেই মুহূর্তেই আমার ফোনে তিতিরের কল এলো। সচরাচর আমার ফোন সাইলেন্ট থাকে না আজ সৌভাগ্যবশত সাইলেন্ট ছিল। নইলে ধরা পরে যেতে হতো, এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। মনে হয় ওর ঘুম ভেঙে আমায় দেখতে না পেয়ে ভয় পেয়ে গেছে। ওকে মেসেজে জানিয়ে দিলাম যে আমি ঠিকআছি। তবে ধরা পড়লে কতোটা ঠিক থাকতাম সেই নিয়ে কোনোও সন্দেহ নেই। তিতির কে সামলে নিয়ে আবার আড়ালে থেকে ওদের নজরে রাখলাম। এর পরে যা দেখলাম, কনকনে এই শীতেও কপাল ঘামতে শুরু করেছে। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। স্পষ্ট দেখলাম, কয়েকটা নিথর দেহ মাটিতে রাখা। তাদের কে বস্তায় পোড়া হচ্ছে একে একে। প্রায় সব অঙ্ক মিলে যেতে থাকলো। বেশ বুঝতে পারলাম আমাদের সমাজেই মানুষ রুপী কিছু অশুভ ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের বিষাক্ত নিশ্বাসেই বাতাসেও বিষ মিশছে। ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে এরা এক এক জন বিশ্বাসঘাতক। এবারে পুরো গুজবের কাহিনী আমার কাছে স্পষ্ট। আর না দাড়িয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। ঘরে ঢোকা মাত্রই তিতির ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বেশ বুঝতে পারলাম এতো ক্ষণ কেঁদে ভাসাচ্চিল ও। ওকে জড়িয়ে ধরে সামলে নিলাম।

– আর কাঁদিশ না! আমি এসে গেছি তো। দেখ আমার কিছু হয় নি।
– যদি হয়ে যেতো ! আমাকে না বলে কেনো গেলি তুই।তোকে না দেখে খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম।
– তাই ! কি ভাবলি আমাকে নিশিতে ডেকে নিয়ে গেছে?
– বাজে কথা বলিস না।
– বলে গেলে তুই আমাকে যেতে দিতিস?
– হ্যাঁ আমিও যেতাম।
– সেই।
– কেনো ? আমিও তো তোর সাথেই এসেছি।
– আমি যা  দেখলাম, তুই গেলে অজ্ঞান হয়ে জেতিস।
– মানে ?
– দেখাচ্ছি।

বলে ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বেড় করে ক্যামেরা র সাথে কানেক্ট করে ভিডিয়ো টা দেখালাম। ওর কথা বন্ধ হয়ে গেল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম লক্ষ্য করলাম। ওর ঠোঁট কাঁপছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,

– কি রে চিনতে পারলি ?
– রাজেন্দ্র বাবুর বড়ো জামাই?
– হ্যাঁ।
– তোকে দেখেনি তো কেউ ?
– না তবে ফোন সাইলেন্ট না থাকলে তুই বিয়ের আগেই বিধবা হয়ে জেতিস।
– ঋজু ! ভালো লগেনা ইয়ার্কি। তোর একা যাওয়া মোটেই উচিত হয় নি।
– আরে কিছুত হয়নি। প্রায় সব অঙ্কই মিলে গেছে। বুঝেচিস ?
– হুম। এসব নিশি ডাক , অশুভ ছায়া কিছুই না। সবটাই গ্রামের মানুষের শিক্ষার অভাবের সুযোগ।
– এই জন্যেই সুধীর বাবু আমাদের রাতে বেরোতে না করেছিলেন।
– আচ্ছা রাজেন্দ্র বাবু ও কি তাহলে এসবের সাথে ?
– এখনই বোঝা যাচ্ছে না। তবে যেই প্রমান পেয়েছি এই যথেষ্ট। আমি আজই স্যার কে পাঠিয়ে দেবো।
– হুম। কিন্তু আমার একটা ব্যাপার এখনো ভাবাচ্ছে।
– কি ?
– মানুষ খুঁন করে ওদের লাভ টা কি?
– কাল সকালে একবার যাব ভাবছি।
– আমিও যাব।
– বেশ যাস। এখন ঘুমা। রাত হয়েছে।
– হুম।

স্যার কে ভিডিয়ো ক্লিপ পাঠিয়ে দুজনে ঘুমিয়ে পড়লাম।  রাতের কথা মতো সকালের জল খাবার সেড়েই বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের ব্যবহার স্বাভাবিকই ছিল। তাই কেউ কোনো রকম সন্দেহ করেনি। দিনের আলোয় কাজ টা অতটা সহজ হবে বলে মনে হয়নি তবে কাজ টা অনেকটা সহজেই হলো। দিনের বেলা একজন কি দুজন ছাড়া এই দিকে কেউ আসে না। সেই সুযোগেই ওদের চোখের ধুলো দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ঢোকা মাত্রই দমবন্ধ হওয়া ভারী একটা গন্ধ নাকে এলো। বুক পকেটে রাখা স্পাই ক্যামেরা অন করে নিসব্দে ঘরের এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলাম। ঘরের কোনে একটা বস্তা দেখে সন্দেহ হলো তিতিরের। কাছে গিয়ে বস্তাটা খুললাম। বস্তার ভিতরে একটা মৃত দেহ। রক্ত লেগে আছে দেওয়ালে। এখনো বেশ তাজা রক্ত। রক্তাক্ত শরীরটা দেখে তিতিরের শরীর খারাপ করছিলো। ওখানেই একটা চেয়ারে ওকে বসিয়ে আমি মৃত দেহটা ভালো করে দেখতে থাকলাম। পরিস্কার একটা কাটা দাগ বুক থেকে পেট পর্যন্ত। ঠিক ময়নাতদন্তের সময় যেমনটা করা হয়ে থাকে। কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম যে এখানে অঙ্গ পাঁচারের মতো ভয়ানক কাজ হয়। কারোর পায়ের শব্দে আমরা জানলা দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। খুব বেশি দেরী না করে অফিসে স্যার কে ফোন করে সবটা জানালাম । এও বুঝতে পারলাম আমরাও খুব একটা সেফ নই এখানে। দুপুরের আগেই রাজেন্দ্র বাবুর বাড়ি ফিরে এলাম। বিকেলের মধ্যেই স্যার চলে এলেন এখানে। আমাকে ফোন করতে আমি আর তিতির সব গুছিয়ে বাড়ি থেকে লুকিয়ে বেড়িয়ে এলাম স্টেশনে। স্যার কে দেখে স্বাস্তির নিশ্বাস ফেললাম। স্যার এর সাথে পুলিশ ও ছিল। কালকের পাঠানো ভিডিয়ো টা স্যার পুলিশে পাঠিয়েছিলেন। ইন্সপেকটর রাকেশ সিনহা র কথায় আমরা ওদের কে সেই জায়গায় নিয়ে গেলাম। পুলিশে পুরো চত্বর ঘিরে ফেলল। সবাই কে স্যারেন্ডার করার হুসিয়ারি দিল পুলিশ। গুলি ও চলল। শেষে সুধীর বাবু সমেত যারা জড়িত সবাই কে অ্যারেস্ট করা হলো। সুধীর বাবু একাই নন। স্টেশন মাস্টার ও জড়িত ছিল এই পাঁচার চক্রে। জানা গেল জামাই কে আড়াল করতে চেয়েছিলেন রাজেন্দ্র বাবু। তবে উনি জড়িত নন এই চক্রে।ডেড বডিটাকে ফরেন্সিকে পাঠানো হলো ময়নাতদন্ত এর জন্য। আমারা দুজনে নিরাপদে ফিরে আসি কলকাতায়। শালকুঠি গ্রাম থেকেও অশুভ ছায়া সরে গেলো। কলকাতায় এসে জানতে পারি আমাদের আন্দাজটাই সঠিক। কিডনি পাঁচার চক্র চলত শালকুঠি গ্রামে। এই কার্যোদ্ধারের জন্য আমাদের প্রমোশন ও হয়। আমাদের প্রেমটাও এগিয়ে চলে, মাস দুয়েকের মধ্যে আমরা বিয়েও করে নিই।

আমার গল্প এখানেই শেষ। তবে কতোটা শিহরিত করতে পেরেছি আপনাদের তা জানি না। কিন্তু সেই গ্রামের কথা এখন ভাবলে একই রকম শিহরণ বয়ে যায় শরীরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *