দুর্গা পুজোর দশ দিন

Spread the love

 432 total views,  1 views today

দুর্গাপুজোর দশ দিন
ঠাকুর দালানের এক কোণে বসে রেডিও টা চালিয়ে দিল নন্দিতা। তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় চারটে বাজে। তার বাড়ির সকলে তখন নিঃশব্দে ঘুমাচ্ছে।শরতের গাঢ় নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আড়াল থেকে মিঠে রোদ্দুর যেন সমগ্র পৃথিবীকে জাগিয়ে তুলছিল। সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর পৃথিবীতে মায়ের আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছে ।
আঠেরোর গণ্ডি পেরোতে না পেরোতেই নন্দিতাকে পাত্রস্থ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে এই বনেদি বাড়ি এবং চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে সে লতায় পাতায় জড়িয়ে গিয়েছে। এই পরিবারে এটা তার পঁয়ত্রিশ তম শারদ উৎসব। এই পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কত মুহূর্তকে যে স্মৃতি করে রেখে দিয়েছে নিজের মনের চোরা কুঠুরিতে তার কোন ঠিক নেই। যৌবনকালে যখন তার ছেলেমেয়েরা সবাই ছোট ছিল তখন মায়ের আগমন বার্তা শুধুমাত্র বীরেন বাবুর কন্ঠে মহিষাসুরমর্দিনীর দ্বারা ছড়িয়ে পড়তো না, ছড়িয়ে পড়তো চৌধুরী পরিবারের জমকালো পুজোর ঢাকের শব্দে, বাড়িতে মেয়ে বউদের পায়ের নূপুরের শব্দে, প্রত্যেকটা মানুষের উচ্ছ্বাস, আনন্দ এবং অট্টহাসির মধ্যে দিয়ে। একটা সময় ছিল যখন মহালয়া আসবার অপেক্ষায় বাড়ির সকলে উত্তেজিত হয়ে পড়তো। বাড়ির ছেলেমেয়েরা মহালয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে পড়াশুনা তুলে দিত আর সারাদিন কানের কাছে গুনগুন করে যেত, “আয়রে ছুটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে!” এছাড়া ছিল মায়ের মূর্তি কিনতে যাবার আলাদাই মজা। ছোটদের সে কী বায়না কুমোরটুলিতে মূর্তি দেখতে যাবে বলে! তাদের সামলানো খুব কঠিন হত। নন্দিতা এইসব ভাবছে এমন সময় তার মেয়ে আনন্দিনী সিঁড়ি থেকে নেমে এসে বলে, “ও মা এত জোরে রেডিও চালিয়েছো কেন? তুমি জানো না আমি কত রাত অবধি পড়াশোনা করি?”
আনন্দিনী কলকাতার এক মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে। পড়াশুনা ছাড়াও সে খেলাধুলো, নাচ-গান, কবিতা আবৃত্তি সবেতেই সমান পারদর্শী ছিল। তার হাতের কাজও অসামান্য। নন্দিতা চেয়েছিল মেয়ে গান-বাজনা নিয়ে জীবনে এগোক। এমনকি ছোটবেলায় নিজেও আনন্দিনী রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে খুব ভালোবাসত কিন্তু বড় হয়ে আশে পাশের বন্ধুদের দেখে সে ভাবলো যে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে কোট প্যান্ট পড়ে অফিসে যাওয়া রবীন্দ্র সংগীত গাওয়ার থেকে অনেক বেশি সম্মানের। তাই নিজের স্বপ্ন ভঙ্গ করে মায়ের আশা ব্যর্থ করে সে শেষমেশ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হল।
এতক্ষন নন্দিতা আনমনে বসে পুরনো স্মৃতিচারণে মগ্ন ছিল। মেয়ের কথা শুনে সে একটু নড়েচড়ে বসল। মেয়েকে সে বলল, “আজ মহালয়া, কাল থেকেই পুজো শুরু। মহিষাসুরমর্দিনী না শুনলে কি আর মনে হয় যে মায়ের আগমন ঘটেছে?’’
“মা এসব ছাড়ো তো এবার! আমাদের বাড়িতে এখনো মূর্তি এনে পুজো করা হয় সব নিয়ম মেনে। পুজোর সময় বাড়িতে কত লোকজন আসে, এমনিতেই ঘুম হয় না! এরপর আর কী চাও? এতই যদি মহিষাসুরমর্দিনী শোনার ইচ্ছে হয়ে তাহলে ইউটিউবে হেডফোন ব্যবহার করে শোনো না।’’
কথা শেষ করে আনন্দিনী আবার নিজের ঘরে চলে গেল। মেয়ের কথা নন্দিতা বড় একটা গায়ে মাখলো না। ছেলে মেয়েরা এখন বড় হয়েছে তাদের নিজস্ব মতামত হয়েছে সুতরাং এখন তাকে একটু আধটু কথা তো শুনতেই হবে। তার বারংবার ইচ্ছে করে পুরনো সেই যৌবনের দিনগুলোতে ফিরে যেতে। এখন সে চৌধুরী পরিবারের মাথা হয়েছে, বনেদি বাড়ির গিন্নি হয়েছে, ছেলে মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তার কোনো কিছুর অভাব নেই ——– একজন সাধারন স্ত্রীলোক এর চেয়ে বেশি আর কী চায়? কিন্তু তবুও নন্দিতার মনে হয় যখন এর কোন কিছুই ছিল না তখন জীবন যেন এই সবকিছুর বদলে বেঁচে থাকার সকল লাবণ্য এনে দিয়েছিল আর এখন যখন তার সব হয়েছে জীবন যেন তাকে কেবল টিকিয়ে রেখেছে, বাঁচিয়ে নয়। তার মনে পড়ে ছোটবেলায় আনন্দিনী বাড়িতে সবচেয়ে উত্তেজিত থাকতো। যাতে ভোরবেলায় উঠে মহালয়া শুনতে দেরি না হয়ে যায় সে আগের দিন রাতে তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমোতে চলে যেত এবং বাড়িতে প্রায় যতগুলো ঘড়ি থাকত সবেতে অ্যালার্ম লাগিয়ে রেখে দিত মাথার কাছে।

চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো বহু পুরনো। নন্দিতার স্বামীর ঠাকুরদার আমল থেকে এই পুজো হয়। নন্দিতা চিরকাল দেখে এসেছে যে তার শাশুড়িমা সকল নিয়ম মেনে এই পুজো করেছেন। যাওয়ার আগে তিনি নন্দিতাকে বলে গিয়েছিলেন, “বৌমা চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোতে যেন কোনো ত্রুটি না হয়। এই পুজোর সঙ্গে আমাদের বাড়ির মান-সম্মান জড়িয়ে। চিরকাল যেমন এই বাড়ির ঠাকুরদালানে ছোট-বড় প্রচুর মানুষ ভিড় করতো পুজো দেখার জন্য ঠিক তেমনভাবেই এর পরেও যেন একই ভাবে সবাই এই বাড়ির পুজো দেখতে আসে।’’ হয়তো নন্দিতার উপর সকল দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন বলেই এখনও সবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যথাযথভাবে দুর্গাপুজোর ব্যবস্থা করে। এ বিষয়ে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই। শুধু তার স্বামী, রনজয় বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে কুমোরটুলি থেকে মূর্তি এনে দিত। এবছর সেটাও সম্ভব হয়নি কারণ মহালয়ার দুদিন আগেই রনজয় বন্ধুদের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণে চলে গিয়েছিল। নন্দিতা যখন ব্যাপারটাতে তীব্র অসন্তোষ দেখিয়ে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিল তখন রনজয় রেগে গিয়ে উত্তর দেয়, “যদি নিজের সব দায়িত্ব সামলাতে না পারো তাহলে অন্যের ভরসায় সব দায়িত্ব নাও কেন? তোমায় তো হাজার বার বলেছি এই বাড়ির পুজো বন্ধ করে দাও। অফিসের বন্ধুদের সঙ্গে এতটুকু মেলামেশা রাখা দরকার। আর তাছাড়া এত বছর ধরে তো বাড়ির পুজোতেই আটকা পড়ে রইলাম, এবার না হয় একটু বিদেশ ভ্রমণ করে এলাম।”
স্বামীর কথা শুনে নন্দিতা আর কিছু বলল না। সে পাশের বাড়ির শিবুকে অনুরোধ করলো একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। শিবু ছেলেটা বড় ভালো। নন্দিতার ছোট ছেলে ভাস্করের বয়সী। ভাস্কর যতদিন কলকাতায় ছিল ততদিন তাদের বাড়িতে দিনরাত আনাগোনা ছিল তার কিন্তু ভাস্কর চাকরি নিয়ে নয়াদিল্লিতে চলে যাবার পরও শিবু মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করে তার খবর নিয়ে যেত। নন্দিতার দুই ছেলে ভাস্কর আর স্বস্তিক। তারা কেউই কলকাতায় থাকে না। বড় ছেলে স্বস্তিক চাকরি নিয়ে চলে গেছে মুম্বাই আর ছোট ছেলে ভাস্কর নয়াদিল্লিতে থাকে। দুজনে প্রতি বছর দুর্গাপুজোয় বাড়ি আসে তাই দুর্গাপুজো নন্দিতার কাছে শুধুমাত্র একটা উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি। কেবল নন্দিতা নয় সকলেই ভাস্কর আর সস্তিকের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকতো। ভাস্করের আসার কথা পঞ্চমীর দিন বিকেলে আর স্বস্তিকার আসার কথা ষষ্ঠীর সকালে। নন্দিতার প্রথমা থেকে চতুর্থী কেটে গেল ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে। বাজার দোকান রান্নাবান্না সবিই তাকে একা সামলাতে হয়। অবশ্য সন্ধ্যা থেকে তার আর কোন কাজ থাকে না। সন্ধেবেলায় তার মেয়ে, আনন্দিনী কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে শপিংমলে চলে যেত পুজোর কেনাকাটা করতে। শুধু দুর্গাপুজো নয়ে, এরপর কালীপুজো, ভাইফোঁটা, বড়দিন আরো কত কি উৎসব! সব কেনাকাটা সে সেরে রাখে এই পুজোর ছুটিতে। তৃতীয়ার দিন রাতে কেনাকাটা শেষ করে আনন্দিনী সবকিছু খুলে খুলে মাকে দেখাতে থাকে। সবকিছু দেখার পর নন্দিতা বলে, “জিন্স, টপ, কানের দুল, সাজগোজের সব জিনিস খুব সুন্দর হয়েছে। তোকে খুব মানাবে। কিন্তু অষ্টমীর শাড়ি কোথায়?”
শাড়ি সামলানোর অনেক সমস্যা। আমি এতেই ঠিক আছি। দুর্গা মা কি বলে গেছেন যে শাড়ি না পড়লে অষ্টমীর পুজো দেওয়া যাবে না? ওইসব তোমাদের সময় অবধি ঠিক ছিল। এখন আর এসব মানার কোন মানে হয়না।”
কথা শেষ করে আনন্দিনী ঘরে চলে গেল। নন্দিতাও ঘরে গেল। কী মনে হল শাড়ির আঁচল থেকে চাবির গোছা খুলে নিয়ে আলমারিটা খুলে ফেলল। আলমারি খুলে হাতড়াতে শুরু করলো। যখন সে পুরো আলমারিটা ঘেঁটে ফেলল তখন শেষমেশ খুঁজে পেল তার শ্বশুরমশাইয়ের তাকে অষ্টমীতে উপহার দেওয়া শেষ শাড়ি। আনন্দিনী পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার দাদু পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। প্রত্যেক বছর দুর্গাপুজোয় তিনি বাড়ির সকলের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে আসতেন। বাড়ির বউ মেয়েদের জন্য তিনি দুটো করে শাড়ি নিয়ে আসতেন, একটা অষ্টমীতে পরে অঞ্জলি দেবার জন্য আর অন্যটা দশমীতে মাকে বরণ করার জন্য। যতই বড় বড় শপিং মলে গিয়ে কেনাকাটা করা হোক না কেন শ্বশুরমশাইয়ের কাছ থেকে উপহার পাওয়ার জন্য সে যতটা উত্তেজিত থাকতো ততটা উত্তেজনা সে আর কখনো অনুভব করতে পারেনি। হয়তো এত বছরে তার প্রচুর দামী দামী শাড়ি হয়েছে কিন্তু সেই শাড়িগুলোর কোনোটাতেই ছিলনা গুরুজনের আশীর্বাদ স্নেহ-ভালোবাসা।
এরম ভাবে নানা স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে পঞ্চমী এসে গেল। পঞ্চমীর দিন মায়ের মুখ থেকে পর্দা সরানোর পালা। বাড়িতে প্রচুর কাজ। তাছাড়া পঞ্চমীর দিন বিকেলেই তো ভাস্করের আসার কথা তাই তার ঘরটা পরিষ্কার করতে হবে। সকাল বেলা আটটা নাগাদ নন্দিতা কাজে ব্যস্ত এমন সময় টেলিফোনটা বেজে উঠল। সে নিচ থেকে বাড়ির কাজের লোক, হরিষকে হাঁক দিয়ে বলল, “এই হরিষ দেখ তো কার ফোন।” হরিষ যখন কিছুতেই শুনতে পেল না নন্দিতা নিজেই উঠে ফোনটা ধরলো। ফোনটা ধরেই নন্দিতা বুঝলো ভাস্করের গলা। ভাস্কর ফোনের ওপার থেকে বলল, “মা শোনো না আমি এই বছর আসতে পারছিনা। দেখো তুমি দুঃখ পেয়ো না, আমি আগে থেকেই জানতাম যে এবছর আমি দু দিনের বেশি ছুটি পাবো না। খুব কাজের চাপ কিন্তু তোমায় কিছু বলিনি তুমি কষ্ট পাবে বলে। শুধু শুধু দু দিনের জন্য কলকাতা গিয়ে আবার ফিরে আসাটা বড্ড বেশি ধকল হয়ে যাবে না? তার চেয়ে বরং এই দুইদিন বাড়িতে বসে ভালোমন্দ খেয়ে ঘুমিয়ে আরাম করে কাটাবো ভাবছি। তাছাড়া বাড়ির পুজোয় তো কিছু নতুনত্ব নেই যে দেখতে যেতে হবে। তাই এই বছরটা নাই বা গেলাম।”
নন্দিতা ছেলের কথা শুনে ভীষণ কষ্ট পেয়ে শুধু বলল, “ আচ্ছা ঠিক আছে, ভালো থাকিস।” বলে ফোনটা রেখে দিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মায়ের আঁচল ধরা ছেলে যখন বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে যায় তখন মায়ের জীবনে তার অভাবটা কিছুতেই পূরণ করা যায়না। ভাস্কর আসবে না শুনে নন্দিতার এবার ভয় হতে শুরু করল পরের দিন অর্থাৎ ষষ্ঠীতে তো স্বস্তিকের আসার কথা, সে আসবে তো?
পরের দিন ভোরে সস্তিক বাড়ি পৌঁছে গেল। বড় ছেলে বাড়ি ফিরে আসতে নন্দিতা অসম্ভব খুশি হল। বাড়ির সবাই মায়ের আরাধনায় মত্ত, শুধু বাড়ির সবাই বললে ভুল হবে, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই চৌধুরি বাড়িতে জড়ো হয়েছিল। সন্ধেবেলায় আনন্দিনী আর সস্তিক তাদের সব বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে। হাসি, গান, আড্ডায় আসর একেবারে জমে ওঠে। নন্দিতা কেবল নিজের ঘর থেকে দালানটার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে। এই সময় নন্দিতার তার বড়ো জা সাবিত্রীর কথা খুব মনে পড়ে। বনেদি বাড়ির বউ হবার পর নন্দিতার বাড়ি থেকে বিশেষ বেরোনো চলতো না। সুতরাং বিয়ের পরে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল তার বড়ো জা সাবিত্রী। সব কাজ তারা মিলেমিশে করতো, নিজেদের সব আনন্দ ভাগ করে নিত। বছর কয়েক হল, তার ভাসুরের সঙ্গে তার স্বামীর একটা গোল বেঁধেছে। এখন দুই ভাইয়ের মধ্যে আর কোন সম্পর্ক নেই। এমনকি তারা এক বাড়িতেও থাকে না আর। সেই বিচ্ছেদের পর থেকে নন্দিতার সাবিত্রীর সঙ্গে কথা হয়নি কখনো। পুজোর সময় সাবিত্রীর কথা খুব মনে পড়তো নন্দিতার—— কিভাবে তারা একসঙ্গে মায়ের পুজোর জোগাড় করতো, আলপনা দিত, ভোগ রাঁধতো, আরো কত কী।
পরেরদিন আনন্দিনী, সস্তিক ও তাদের বন্ধুরা ঠিক করে কলকাতার বিভিন্ন প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে থিমের পুজো দেখবে। সন্ধেবেলায় তারা যখন সবাই বেড়িয়ে যায়, বাড়ির কাজের লোক, হরিষ নন্দিতাকে বলে, “মা জননী তুমি গেলে না?”
নন্দিতা হেসে উত্তর দিল, “আমি চলে গেলে মায়ের কাছে কে থাকবে?” নন্দিতার মনে হয় কোথাও যেন থিমের পুজো দেখতে গিয়ে সেলফি তুলতে তুলতে মানুষ দুর্গাপ্রতিমার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভুলে গেছে, ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ ভুলে গেছে আর সবচেয়ে বড় কথা সে নিজের আনন্দটা সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় তুলে ধরতে গিয়ে নিজে প্রাণ খুলে হাসতে ভুলে গেছে। ডাকের সাজের ঠাকুর দেখা, মা বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়া, নাগরদোলায় চড়া, জিলিপি খাওয়া—–এসবের মজাই আলাদা। এসব কথা চিন্তা করতে করতে নন্দিতার হঠাৎ খেয়াল হল যে আনন্দিনী আর স্বস্তিকের বাড়ি ফিরতে নিশ্চই রাত হবে। রাতে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে পড়বে আর খুব খিদে পাবে। তাই ওদের জন্য রান্না বসাতে হবে। অনেকদিন পর সস্তিক বাড়ি ফিরে এসেছে তাই সে ঠিক করল ছেলের পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করবে। অল্প সময়ের মধ্যে সে রান্নাও করে ফেলল অনেক কিছু যেমন ভাত, মাংস, চিংড়ি মাছের মালাইকারি, মাছের কালিয়া, আরো কত কি। এমনকি হরিষকে দিয়ে রসগোল্লাও আনিয়ে রাখলো।
আনন্দিনী আর স্বস্তিক যখন বাড়ি ফিরল তখন রাত এগারোটা বাজে। তারা হাত পা ধুয়ে আসতে নন্দিতা তাদের বলল, “তোদের জন্য কত কি বানিয়ে রেখেছি। চিংড়ির মালাইকারি, মাছের কালিয়া, মাংস। তোরা খেতে বসলে নিজেই দেখতে পাবি। তোরা বস, আমি এখনি সব আনছি। সস্তিক মাকে থামিয়ে বলল, “আরে দাঁড়াও, আমার কথাটা শুনে যাও। আমি আর বোন দু’জনই ‘চাউ চাউ’ রেস্তোরাঁ থেকে খেয়ে এসেছি। কলকাতায় এসে ‘চাউ চাউতে’ খাবো না হতে পারে? আমাদের পেটে আর এতটুকুও জায়গা নেই। তুমি বরং সব তুলে রেখে দাও। কাল খেয়ে নেব। এরপর এত কিছু রান্না করার আগে জিজ্ঞেস করে নেবে, কেমন?”
কথা শেষ করে আনন্দিনী আর সস্তিক নিজেদের ঘরে ঘুমোতে চলে যায়। নন্দিতা ওখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হরিষ তাকে বলে, “ চলো মা জননী, খাবারগুলো তুলে রাখি। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী?” তারপর সে বিড়বিড় করে নিজের মনে বলে, “বাবু আসবেন বলে মানুষটা সকাল থেকে ঘর গোছাচ্ছে, এটা সরাচ্ছে, ওটা রাখছে, পাঁচ পদ রান্না করছে। আর ছেলের ছিড়ি দেখো!”
পুজোর বাকি দিনগুলো হুড়মুড় করে কেটে গেল। আর শেষমেশ দশমীর দিন মাকে ভাসান দেওয়ার সময় হয়ে গেল। নন্দিতা গঙ্গার ঘাটে বিসর্জন দিতে গেল। যেই ঘাটে মাকে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতি বছর সেই ঘাটটা নিরিবিলি, খুব একটা কেউ যায় না। সবাই মাকে ভাসান দিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও, নন্দিতা গেল না। সূর্য তখন অস্তগামী। পাখিরা তাদের গুঞ্জন থামিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। গঙ্গার কল কল সুর যেন তাল মিলিয়েছিল দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের মৃদু আওয়াজের সাথে। প্রত্যেক বছরই মায়ের বিদায়টা মেনে নিতে নন্দিতার ভীষণ কষ্ট হয়। গঙ্গার ধারের শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে লাল আবার ছেটানো আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নন্দিতা আবেগপ্রবল হয়ে পড়ল। বুকের মধ্যে এতদিন ধরে যা যা কষ্ট জমে ছিল সব যেন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়তে থাকল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল সে বড় একা, তার হাত ধরে হাঁটবার মতো কেউ নেই। তার একাকিত্বের জন্য সে নিজেকেই দোষী বলে মনে করল। হয়তো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি বলে সবাই তার হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে। এই যুগে বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত হল তোমাকে ‘স্মার্ট’ হতে হবে এবং প্রয়োজনে নিজের ভেতরের মানুষটাকে ঢেকে ফেলতে হবে আধুনিক উন্নত মানুষের আবরণে। নন্দিতা হয়তো এই আস্তরণ তৈরি করতে পারেনি বলেই সারা জীবন সংসারের জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে দেওয়া সত্বেও সে আজ বাড়ির সবার অবহেলার পাত্র। তার এক এক সময় মনে হয় তার জীবনটাই বৃথা, জীবনে বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই। সে গভীর চিন্তায় মগ্ন আছে এমন সময় দেখতে পায় একটা ছোট মেয়ে ওই বছর দশেকের হবে, মুখ মলিন, পরনে ছেঁড়া কাপড় আর মাথায় এক ঝুড়ি মাটির পুতুল। তার মধ্যে থেকে একটা পুতুল সে নন্দিতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মা জী একটা নিন না, খুব কম দাম, দশ টাকা।”
নন্দিতা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো, “তোমার নাম কী? এই মাটির পুতুলগুলো তুমি তৈরি করো?”
মেয়েটি উত্তর দিল, “আমার নাম দুর্গা। এগুলো আমি আর আমার দিদি একসাথে তৈরি করি।”
নন্দিতা এবার জিজ্ঞেস করল মেয়েটিকে, “তুমি স্কুলে যাও? কোথায় থাকো তুমি?”
মেয়েটি উত্তর দিল, “আমি কাছেই একটা বস্তিতে থাকি। আমার বাবা অনেকদিন আগেই কঠিন রোগে মারা গেছেন। মা বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে। আমরা চার ভাই বোন। মার একার আয়েতে সংসার চলে না। তাই আমি আর দিদি পুতুল বিক্রি করি। স্কুলে যাওয়ার পয়সা আমাদের নেই।”
নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, “আমি যদি তোদের পড়়াশোনা করাই, জামা-কাপড় কিনে দিই, খাবার দিই তাহলে তুই আর তোর দিদি আমাদের বাড়ি আসবি?”
দুর্গার মলিন মুখে হাসি ফুটে উঠল, সে উত্তেজিত হয়ে বলল, “তুমি আমাদের পড়াশোনা শেখাবে? আমাদের পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছে কিন্তু কোনদিন সুযোগ পাইনি। কিন্তু তোমার বাড়ি তো আমি চিনিনা!”
নন্দিতা দুর্গাকে প্রশ্ন করে, “আমি যদি ঠিকানা দিয়ে দিই তাহলে তুই কারুর সাহায্যে আমার বাড়িতে আসতে পারবি না?”
দুর্গা হেসে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ দিদিমণি পারবো। তাহলে কাল সকাল দশটা নাগাদ যাবো তোমার বাড়ি।”
দুর্গার মুখে দিদিমণি ডাক শুনে নন্দিতার বুকের রক্ত ছলকে উঠল। সে ছোট থেকে শিক্ষিকা হতে চেয়েছিল কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল আর তারপর সংসার করতে করতে সারা জীবনটা কেটে যায়। পরের দিন সকালে নন্দিতা দুর্গা ও তার দিদির জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। ঠিক দশটা নাগাদ কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে, সে ছুটে গিয়ে দরজা খোলে। দরজা খুলে দেখে সেখানে শুধু দুর্গা নয়, তার মত আরো কয়েকজন ছোট ছোট শিশু দাঁড়িয়ে আছে।
দুর্গা নন্দিতাকে প্রণাম জানিয়ে বলে, “এরা হল আমার বন্ধু। এদেরও পড়াশোনা শেখার খুব ইচ্ছে কিন্তু আমার মতই সুযোগের অভাবে কোনদিনও পড়াশোনা শিখতে পারেনি।” নন্দিতা সবাইকে স্নেহ করে ভেতরে নিয়ে গেল।
সেদিন থেকে শুরু হল দুর্গা এবং তার বন্ধুদের স্বপ্ন পূরণের যাত্রা এবং বাচ্চাদের স্বপ্ন পূরণ হতে দেখে নন্দিতারও যেন সকল স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেল। নন্দিতার জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হল; নতুন করে জীবনের মানে খুঁজে পেল সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *