ভুলে যেও আমাকে

Spread the love

 1,664 total views,  1 views today

রাত তখন দেড়টা ছুইঁ ছুইঁ, পড়ার টেবিলের উপর ডায়েরির পাতায় কি যেন পড়তে ব্যস্ত ঐশী। অন্ধকার ঘর,একটুকরো ল্যাম্পের আলোয় কতো কি লিখে চলেছে তার কলম। মাঝে মাঝে কলমের নীল রেখা ছড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা নোনতা জলে। বার কয়েক তার পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠছে তারপর ! আবার নিস্তব্ধতা। নিকোটিনের ধোঁয়ায় দম বন্ধ অবস্থা তবুও তার ধেয়ান যেন শুধু ওই ডায়েরির পাতার ভাঁজে একটা ফটোয়। টেবিলের পাশে রাখা একটা ফোটোফ্রেম। ভীষণ প্রিয় তার, কিন্তু আজ সেই ফোটোফ্রেমটা ফাঁকা। বার সাতেক ফোনটা বেজেছে, কিন্তু সে খেয়াল করেনি। আবার ফোনটা বেজে উঠে, নিস্তব্ধতা কাটায় বন্ধ ঘরের। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তার খুব চেনা সেই নামটা ” রাজন্যা”।
এক মনে তাকিয়ে থাকে ফোনের স্ক্রিনে বেশ কিছুটা সময়,শেষে রিসিভ করে ।প্রত্যেকটা রাত সে অপেক্ষায় থাকতো রাজন্যার ফোন কলের কিন্তু আজ সে চাইছিল না , আজকের রাতটা আগের রাত গুলোর থেকে অনেকটা আলাদা। রিসিভ করার আগে তার মনে পরে, বাড়ি পৌছে তার ফোন করার কথা ছিলো রাজন্যা কে। কিন্তু সে বলবে কি ভাবে যে সে রাত দশটায় না ফিরে রাত এক টা নাগাদ ফিরেছে। সারাদিনের পর আজ খুব ক্লান্ত ঐশী, সকালে বেরিয়েছে রাজন্যার সাথে বিয়ের

বেনারসি পছন্দে আর ইনভিটিশনে। শারীরিক ভাবে ক্লান্ততা যখন তাঁকে গ্রাস করছে ততই মানসিক দুর্বলতা পেয়ে বসেছে তাঁকে আজ রাতে। ফোনটা রিসিভ করেও দুজনে কোনো কথা বললো না মিনিট দশেক।ফোনের ওপার থেকে তার খুব প্রিয়, খুব চেনা শব্দ ভেসে আসে ঐশির কানে।

  • বাড়ি ফিরে ফোন করলি না?

উত্তর অজানা ঐশীর, জানেনা সে কি বলবে। অথচ কিছুদিন আগেও তাদের কথা শেষ হতো না সারা রাতেও। শেষের কয়েকটা বছর এমনকি দুজনেরই উচ্চমাধ্যমিক তখনো তারা রাত কাটিয়েছে একসাথে ফোন কলে।প্রতিটা রাত ঐশী অপেক্ষা করতো রাজন্যার ফোন আসার।কিন্তু আজ ? তাদের দুজনের কথা যেন ফুরিয়েছে। তাদের ছ-টা বছরের সম্পর্কের মতই ফিকে হয়ে গিয়েছে বর্তমান। আজকের পর তো সে রাজন্যার প্রাক্তন ! কিন্তু হয়তো রাজন্যা কোনোদিনই ঐশীর প্রাক্তন হবে না। দুজনেই চুপ, স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে সেকেন্ডের কাটার টিক-টিক-টিক, আর কিছু ঘন্টা মাত্র। ভোর হতেই রাজন্যার বাড়িতে হৈ হৈ রবে মেতে উঠবে সবাই, তারপর গায়ে হলুদ এর তত্ব আনতে যাওয়ার ব্যস্ততা।

অভিকের গায়ে ছোঁয়ানো হলুদে স্নান করবে রাজন্যা। তারপর মন্ডপে যাওয়ার প্রোস্তুতি ও শুরু হয়ে যাবে, সঙ্গীত, মেহেন্দি আরো কতো অনুষ্ঠান হবে রাজন্যকে ঘিরে। খুব ব্যস্ততায় থাকবে সে কাল। এটাই শেষ রাত তার ঐশীর সাথে। আর কোনোদিন হয়তো ঐশীর ফোনে তার প্রিয় চেনা নামটা ভেসে উঠবে না। আজ ই শেষ রাত তাদের সম্পর্কের, তাদের ছ বছরের ভালোবাসার। কিন্তু আজ ঐশীর কাছে কোনো উত্তর নেই। আবার ও ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে ।

  • কিছু বললি না ঐশী ?

খুব শান্ত স্বরে ঐশী উত্তর দেয়

  • হুম ! কি ?
  • বাড়ি ফিরে !
  • তোর চিন্তা না করলেও হবে।
  • আজকের পর তো আর

কথা শেষ করতে পারছে না সে। ফোনের এপার থেকে বুঝতে পারে ,রাজন্যার চোখ ভিজে উঠেছে। ঐশীরও গাল ভিজে নোনতা জলে। কিন্তূ এই মন খারাপের কোনো পথ নেই, অসহ্য এক রকম চাপ ঘিরে রেখেছে ঐশী কে। ফোনের ওপারের নিস্তব্ধতা ঐশী কে মনে করিয়ে দিচ্ছে তাদের ফেলে আসা দিন গুলো। আজ তাদের কিছু করার নেই, আজ সব শেষ তাদের , সবটাই মেনে নিতে বাধ্য তারা আজ। ঐশী তো জানত, এই দিন টার আশঙ্কা তারা আগে থেকেই করেছে। কতো কলমই না জেনেছে তাদের মন খারাপের গল্প। আজ তাদের আলাদা হওয়ার পালা, শেষটা খুব কঠিন হলেও বাস্তব অস্বীকার

করবে কি ভাবে ! ফোনের এপার থেকে উত্তর আসে।

  • আভিক কে নিয়ে ভাব।
  • ঐশী প্লিজ!
  • কাল তোর সারাদিন খুব ব্যস্ততায় কাটবে। আজ ঘুমিয়ে পর।
  • ইচ্ছে করছে না বল আর কথা বলতে !
  • না ! ইচ্ছে করছে না ।
  • বুঝেছি রে।
  • কি ?
  • কিছুটা অজানা থাক।
  • আজকের পর থেকে সবটাই অজানা ।
  • আজ ই কি তবে শেষ?
  • হ্যাঁ ! মেয়াদ ফুরিয়েছে আমাদের সম্পর্কের।
  • আর ভালোবাসা ?
  • ভালোবাসি না আর।
  • এতো সহজে বলতে পারলি ঐশী ?
  • ঘুমিয়ে পর । কাল তোর জীবনের সব থেকে বিশেষ দিন।
  • শেষ বারেও বলবি না একবার ?
  • কি ?
  • ভালোবাসিস না আমায় ?
  • ভালো থাকিস।

সেই রাতের শেষ কথা ছিল ঐশীর “ভালো থাকিস”। কতোটা ভালো থাকবে রাজন্যা! সত্যিই কি পারবে সে ঐশী কে ছেড়ে থাকতে? হয়ত বা হ্যাঁ কিংবা না। হয়ত নতুন জীবনের ব্যস্ততায় আস্তে আস্তে মুছে যাবে তার মন থেকে ঐশীর স্মৃতি গুলো। আবার হয়তো সারাদিনের মিথ্যে নাটকে ক্লান্ত হয়ে প্রতি রাতে চোখ রাখবে তাদের পুরোনো মেসেজে। সেই সময়ই বা পাবে কিভাবে ! প্রতি রাত তো সে ব্যস্ত হবে নতুনের আদরে, নতুনের শরীরে।
আর ঐশী ? প্রতিদিনের মিথ্যে নাটক করে ক্লান্ত খুব যখন, চোখ রাখবে সে ফোনের স্ক্রিনে, গ্যালারী ভর্তি ফোটোরা ডিলিট অপশনের

অপশনের হাতছানি দিয়ে ডাকবে তখন। মনে ভীড় জমাবে ক্লাস 12 থেকে কাটানো ছোটো মুহুর্তেরা। আটকে রাখা যাবে না আর বসন্তের বৃষ্টি, ফোনের স্ক্রিন ভিজবে মিথ্যে হাসির প্রতিফলনে, ফোন করবে না ভেবেও কল লিস্টে ভুলে ডায়াল হয়ে যাবে বার বার। হয়তো মন বলবে “ভালো থাকিস খুব, যোগ্য ছিলাম না আমি তোর”। নিকোটিনে ঠোঁট পুড়বে যতো ঘুমের ওষুধে ঘুম আসবে চোখে। শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলে ঘুমিয়ে সকাল হবে আবার শুরু ভালো থাকার মিথ্যে নাটক। নিজেই যখন নিজেকে জিজ্ঞেস করবে “কিন্তু কতো দিন এই ভাবে ? কাকে আকড়ে ধরবে সে !” প্রশ্নের উত্তরে সে বলবে ” মৃত্যু কে, হেরে যাওয়া কে আকড়ে ধরবে।” সত্যিই তো! সে হেরে গেছে , তাদের ভালোবাসা হেরে গেছে।

ভবিষ্যত ছেড়ে বর্তমানে আসা যাক। আজ রাজন্যার বিয়ে। সমাজিক পরিচয়ে ঐশী রাজন্যার বেস্টফ্রেন্ড। তাই রাজন্যার বিয়েতে ঐশীর আজ উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। আজ তাঁকে মিথ্যে নাটকে মুখ বুজে মেনে নিতে হবে,যে আজকের পর রাজন্যা অন্য কারোর।আজ তাঁকে রাজন্যার হাত ছেড়ে দিতে হবে সারা জীবনের মত। আর কোনোদিনও তারা আঙ্গুলের ফাঁকে দুজন দুজনকে খুঁজে পাবে না, পাশে পাবে না।

বিয়ের সন্ধ্যে

  • রাজন্যা ! আসবো ?
  • ঐশী !

সময় যেন থমকে গেছে। নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করছে দুজন কে।ঘরের বাইরের কোনো আওয়াজ পৌছাচ্ছেনা তাদের কানে।শেষ বারের মত খুব কাছ থেকে দেখে রাজন্যা কে। তাঁকে এই ভাবেই সে দেখতে চেয়েছিল। তবে এই সাজ অন্য কারোর জন্য হবে সেটা সে চায় নি।

  • আয় ।
  • খুব সুন্দর লাগছে আজ তোকে।
  • অভিনয়টা আর করতে পারছি না ঐশী।
  • আজ তোর বিশেষ দিন ।
    রিং টা রেখে দিস । আগে থেকে তোর জন্যই কিনেছিলাম।

পকেট থেকে একটা রিং আর গোল্ড চেইন বের করে এগিয়ে যায় রাজন্যার দিকে। অনেক গয়নার মাঝে হয়ত এই চেইন টা কারোর চোখে পরবে না রাজন্যার ছাড়া।

  • ঐশী !
  • বল !
  • শেষ বারের জন্য একবার ও বুকে টেনে নিবি না আমায় ?
  • থাক না !
  • প্লিজ ঐশী ! একবার বুকে জড়িয়ে বল ভালোবাসিস আমায়।

মন্ডপ থেকে ডাক আসে কনে নিয়ে যেতে হবে। ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসে কয়েকজন। এবার বিয়ের পিরি তে বসার পালা।
সবাইকে ঘর থেকে যেতে বলে ঐশী, সে নিজে নিয়ে যাবে তাঁকে।)

  • আপনারা যান আমি নিয়ে আসছি ।( ঐশী)
  • ঐশী! প্লিজ !

সবাই বেড়িয়ে গেলে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে আসে ঐশী। শেষ বারের মতো আকড়ে ধরে তার ভালোবাসা কে। বুকে জড়িয়ে নেয় শেষ বারের মতো। অনেক কথা ছিল বাকি, কিছুই বলা হলো না তার।

অনেক পথ চলা বাকি ছিল তাদের একসাথে, চলা হলো না , মাঝ পথেই হাত ছেড়ে দিতে হলো। অনেক প্রতিশ্রুতি হারিয়ে গেলো এক মুহুর্তে, আর কোনো দিন ও এই চেনা বুকে তার মাথা রাখা হবে না। আর অভিমানের শেষে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসি বলা হবে না তাদের। অনেক কিছুই না পাওয়া থেকে গেল তাদের ভালোবাসায়।
অগ্নিসাক্ষী তে মুছে গেলো ঐশীর নাম রাজন্যার জীবন থেকে। পিছনে সরে অসতে আসতে কোন অন্ধকারে যেন হারিয়ে গেল ঐশী।

“যদি আমাকে ভালোবাসো
তবে কিছুটা পাশে এসো
না, কিছু মনে করো না
যদি চাও, ফেলে দিও

যা পেয়েছি না চাইতেই
চেয়ো না ক্ষতিপূরণ
যা দিয়েছি না চাইতেই
দিয়ো না তার দাম

ভুলে যেও আমাকে
কী আমার নাম? কে ছিলাম?
ভুলে যেও আমাকে
কী আমার নাম? কে ছিলাম?”

হেরে গেল তাদের ভালোবাসা, ভেঙে গেল তাদের সম্পর্ক, মুছে গেল এতো দিনের স্মৃতি। হয়তো সব ভালোবাসা পরিনতি পায় না। এভাবেই শেষ হয়ে যায় সব কিছু ।

3 Replies to “ভুলে যেও আমাকে

  1. Awesome …just speechless…I think sob story shudu akta Chala ar akta may Kay niya lakha holae jay sata love story hobay or akta valo story hobay tanoy..

  2. মনের খবর মন ই রাখে ।বাইরের মানুষ আনন্দ টা বুঝতে পারলেও মনের গহীনে যে দুঃখ থেকে যায়,সেটা বোঝার সাধ্য মন ছাড়া আর কারো নেই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *